নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ফ্রান্সের হাইস্কুলগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারে জাতীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো, শ্রেণিকক্ষে বিঘ্ন কমানো এবং বিরতির সময় সহপাঠীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের শুরুতে ফ্রান্সের পার্লামেন্টে শিশু ও কিশোরদের প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ে ফরাসি আইনপ্রণেতারা নতুন আইন অনুমোদন করেন। ২১ জুলাই পার্লামেন্টে পাশ হওয়া আইনে ১৫ বছরের কম বয়সিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়। আইনটি পাশের পর সরকার জানায়, নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
এরপর ২৪ আগস্ট সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আবারও স্পষ্ট করা হয়। সরকারের মুখপাত্র মওদ ব্রেজোঁ জানান, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে। ফলে ১ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তনের দিন হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে স্কুল পর্যায়ে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে। এবার সেই বিধিনিষেধ হাইস্কুল পর্যন্ত বিস্তৃত করা হচ্ছে। সরকারের যুক্তি, শিক্ষার্থীরা দিনের বড় একটি সময় ফোনের পর্দায় ব্যস্ত থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমতে পারে। একই সঙ্গে বিরতির সময় সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলা, খেলাধুলা কিংবা সরাসরি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগও কমে যায়।
নতুন নিয়মের মাধ্যমে স্কুলের সময়টুকুকে আরও মনোযোগী ও সামাজিক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে এটি প্রযুক্তিবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং শিক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পদ্ধতি সব হাইস্কুলে এক হবে না। নতুন আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিধিমালায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করবে। কোথায় ফোন রাখা হবে, কখন ব্যবহার করা যাবে এবং নিয়ম ভাঙলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় স্কুলভেদে নির্ধারিত হতে পারে।
কোনো কোনো স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যাগের মধ্যে বন্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ফোন রাখার জন্য বিশেষ বাক্স, পকেট বা লকার ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড় স্কুলগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা তৈরি করা সহজ নয়। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও বড় ক্যাম্পাসের কারণে ফোন সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং নিরাপদে ফেরত দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হচ্ছে।
এখানেই নতুন আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। ২৭ আগস্টের প্রতিবেদনে ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মন্ড জানায়, অনেক হাইস্কুল ১ সেপ্টেম্বরের আগে নতুন নিয়ম পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হতে পারেনি। কারণ অভ্যন্তরীণ বিধিমালা পরিবর্তনের জন্য স্কুল পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। গ্রীষ্মের ছুটির সময়ে আইনটি চূড়ান্ত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রস্তুতির সময়ও কম ছিল।
কিছু স্কুল অবশ্য আগেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। প্যারিসের বুফোঁ হাইস্কুল এবং বেজিয়েরের জ্যাঁ মুলাঁ হাইস্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও স্কুলের নির্দিষ্ট অংশে ফোন ব্যবহারের সুযোগ রাখার কথাও বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগের ধরন প্রতিষ্ঠানভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায় বিশেষ পরিস্থিতির জন্য ব্যতিক্রমও থাকবে। চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন বা নির্দিষ্ট শিক্ষাগত পরিস্থিতিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ রাখা যেতে পারে। ফলে নিয়মটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
নিয়ম ভাঙলে শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন সাময়িকভাবে জব্দ করা হতে পারে। কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিধিমালার ওপর নির্ভর করবে। উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং স্কুলে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের ওপর একটি স্পষ্ট সীমা তৈরি করা।
তবে ফ্রান্সের এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই সময়ে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা সময়সূচি, বাড়ির কাজ, স্কুলের নোটিশ ও বিভিন্ন শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। অনেক স্কুলে খাবারের ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য দৈনন্দিন সেবাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। ফলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষার প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা কীভাবে সচল রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্য এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ফোনের ব্যবহার কমলে ক্লাস চলাকালে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হতে পারে। বিরতির সময় শিক্ষার্থীরা ফোনের পর্দায় ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলা, খেলাধুলা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার বেশি সুযোগ পাবে। সরকারের প্রত্যাশা, এতে স্কুলের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশের জন্যও ফ্রান্সের এই উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে আলোচনার বিষয় হতে পারে। বাংলাদেশেও স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোনের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও দেখা ও অনলাইন বিনোদনে তরুণদের সময় ব্যয়ের বিষয়টি অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই বাস্তবতায় ফ্রান্সের মতো একটি প্রযুক্তিনির্ভর দেশ কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করছে, তা শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
১ সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সের হাইস্কুলে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর এখন মূল বিষয় হবে এর বাস্তব ফলাফল। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কতটা বাড়ে, স্কুলের পরিবেশে কী পরিবর্তন আসে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সহজে মানিয়ে নিতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য।