যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অজনপ্রিয় যুদ্ধগুলোর উদাহরণ হিসেবে ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা উঠে আসে। এসব যুদ্ধে দ্রুত আস্থা হারিয়েছিলেন মার্কিনিরা। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও ইরান যুদ্ধ খুব অল্প সময়ের মধ্যে আস্থা হারিয়েছে। বিশ্লেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উল্লেখ করছেন। তারা বলছেন, অজনপ্রিয় হলেও আগের যুদ্ধগুলোর মতো এটি এখনও আমেরিকানদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়নি।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৮ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন, ইরান যুদ্ধ ‘সার্থক নয়’। মাত্র ২৮ শতাংশ বলেছেন, যুদ্ধটি ‘যথার্থ’। এ ক্ষেত্রে সমর্থন ও বিরোধিতার ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ পয়েন্টে, যা ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজের জরিপ অনুযায়ী ইরাক বা আফগানিস্তান যুদ্ধের তুলনায় বেশি নেতিবাচক।
আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ১২ বছর পর ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো ৬৭ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন, ‘যুদ্ধটি সার্থক ছিল না।’ ইরাক যুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ সময়ে (২০০৭ সাল) ৬৬ শতাংশ মানুষ একই মত দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধের মতো এত কম জনসমর্থনে ইরাক যুদ্ধ কখনোই নামেনি।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয়, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক মত গড়ে উঠতে আমেরিকানদের অনেক সময় লেগেছিল। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে প্রায় আট বছর এবং ইরাকের ক্ষেত্রে প্রায় এক বছর পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুদ্ধটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলতে শুরু করেন। ইরাক যুদ্ধে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের সেই অবস্থানে পৌঁছাতে চার বছর সময় লেগেছিল।
গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসির আরেকটি জরিপে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরুর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ৬১ শতাংশ মার্কিনি ইরান যুদ্ধকে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেন। ইরাক কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধেও শেষ পর্যন্ত এমন মূল্যায়ন দেখা যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও প্রভাব বাড়িয়েছে। তবে জনমত জরিপে তাঁর উল্টো চিত্র উঠে এসেছে। গত মাসে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৫ শতাংশ বলেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দুর্বল করেছে। ইরাক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর দুই বছর পর এক জরিপে ৪১ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে।
ইরান যুদ্ধের প্রতি সামগ্রিক জনসমর্থনও যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পর সিএনএনের জরিপে মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ ইরানে সামরিক হামলার পক্ষে ছিলেন। আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযান শুরুর ক্ষেত্রে এটি ইতিহাসের সর্বনিম্ন প্রাথমিক জনসমর্থন।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা গ্যালাপের তথ্য বলছে, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব সামরিক অভিযানই শুরুতে অন্তত ৫০ শতাংশ জনসমর্থন পেয়েছিল। ব্যতিক্রম ছিল ২০১১ সালে লিবিয়ায় ওবামা প্রশাসনের সামরিক অভিযান। সেখানে সমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রায় সব জরিপেই সমর্থনের হার এর চেয়েও কম ছিল। যুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন মাসের মাথায় সমর্থন নেমে আসে ৩৪ শতাংশে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বড় আকারে স্থলবাহিনী মোতায়েন করেনি। আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় মার্কিন সেনাদের প্রাণহানিও অনেক কম। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধনীতি পরিবর্তনের চাপ আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় কম হতে পারে। ফলে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধ হয়তো বড় ইস্যু হয়ে উঠবে না। তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। ফলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে জনসমর্থন দ্রুত কমলেও, ইরান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।