যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকেই বিশ্বকাপে নিয়মিত উপস্থিত দেখতে পাবেন বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু টুর্নামেন্টের অর্ধেক পথ পেরিয়ে গেলেও তিনি এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচেও উপস্থিত হননি।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচের মধ্যে দুটি জিতে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে।
তাহলে কি ট্রাম্পের এই অনুপস্থিতি বিস্ময়কর? কেন তিনি দূরে থাকছেন? ফাইনালের আগে কি তাকে মাঠে দেখা যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে বিবিসি স্পোর্ট।
‘আমার প্রিয় আমেরিকান নাগরিক এবং বিশ্বের মানুষ, বিশ্বকাপের আয়োজক হতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত। এই টুর্নামেন্ট আমাদের দেশের কল্পনাশক্তিকে যেমন জাগিয়ে তুলেছে, তেমনি গত কয়েক বছরে ফুটবলও করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ থেকে যারা এখানে এসেছেন এবং আগামী ৩০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলো উপভোগ করবেন—সবাইকে স্বাগত জানাই।’
১৯৯৪ সালের ১৭ জুন শিকাগোর সোলজার ফিল্ডে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে এসব কথা বলেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন।
সেদিনটি এখন ক্লিনটনের বক্তব্যের চেয়ে ম্যাচ শুরুর আগে ডায়ানা রসের 'পেনাল্টি কিক' মিস করার ঘটনাটির জন্য বেশি স্মরণীয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্লিনটনের সেই উপস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
কারণ, ৩২ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। অথচ টুর্নামেন্টের মাঝপথে এসেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কোনো ম্যাচে দেখা যায়নি।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প টিকিট বিক্রির সাফল্যের জন্য ফিফার প্রশংসা করে এটিকে ‘তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ’ বলে উল্লেখ করেন। এতে অনেকের ধারণা আরও জোরালো হয় যে, তিনি টুর্নামেন্টজুড়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি রাখবেন।
এর আগেও প্রস্তুতি পর্বে বিশ্বকাপকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি গত বছরের শুরুতে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই এক সমাবেশে বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেখানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর হাত থেকে তিনি সংস্থার প্রথম 'শান্তি পুরস্কার' গ্রহণ করেন।
গত কয়েক বছরে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ইনফান্তিনোকে হোয়াইট হাউস এবং ট্রাম্পের ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো বাসভবনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বড় ক্রীড়া আয়োজনে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন। সুপার বোল, গত গ্রীষ্মের ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং বেথপেজে অনুষ্ঠিত রাইডার কাপ গল্ফের উদ্বোধনী দিনেও তাকে দেখা গেছে।
তবে ১২ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সত্ত্বেও প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তার পরিবর্তে ওয়াশিংটন থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
তখন ধারণা করা হয়, দুই দিন পর হোয়াইট হাউসের লনে অনুষ্ঠিত আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউএফসি) ইভেন্টকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি তার ৮০তম জন্মদিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয়।
তাহলে কি এটি সত্যিই বিস্ময়কর?
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিজ দেশের উদ্বোধনী ম্যাচে উপস্থিত থাকা সাধারণ রীতি। চার বছর আগে কাতারের প্রথম ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং ২০১৮ সালে মস্কোতে রাশিয়ার উদ্বোধনী ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন।
রাজনৈতিক কৌশলী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মিডিয়া পরিচালক ফেদেরিকো দে জেসুসের মতে, ‘এটি ট্রাম্পের চরিত্রের বাইরে নয়।’
বিবিসি স্পোর্টকে তিনি বলেন, ‘ইউএফসি এমন একটি খেলা, যার সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া তিনি সাধারণত বড় ক্রীড়া আসরের ফাইনাল বা সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোতেই উপস্থিত হন। তাই বিশ্বকাপের ফাইনালেও তাকে দেখা যেতে পারে।’
প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী দুটি ম্যাচ— অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিয়াটলে এবং তুরস্কের বিপক্ষে লস অ্যাঞ্জেলেসে— কোনোটিতেই ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন না।
দে জেসুসের মতে, প্রেসিডেন্ট ওবামা হলে বিষয়টি ভিন্নভাবে সামলাতেন। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে একজন উদার আয়োজক ও কূটনীতিকের ভূমিকা পালন করতেন।
তবে তিনি এটিও বলেন, ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প গত মাসে নিজের বড় ছেলের বিয়েতেও যাননি; কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন সরকারি দায়িত্ব।
এছাড়া নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এনবিএ ফাইনালে দর্শকদের বিদ্রুপের মুখে পড়ার পর ট্রাম্প হয়তো কিছুটা সতর্ক হয়ে গেছেন বলেও মনে করেন দে জেসুস। বিশেষ করে বিশ্বকাপে আন্তর্জাতিক দর্শকের উপস্থিতি বেশি থাকায় সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
তার প্রশাসনের অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্কের কারণে কর্মকর্তারাও হয়তো সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলের মতো ডেমোক্র্যাট-প্রধান শহরগুলোতে।
ফাইনালের আগে কি মাঠে দেখা যাবে ট্রাম্পকে?
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিশ্চিত করেছেন, ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ট্রাম্প উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা রয়েছে এবং তিনিই বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, তাকে এ দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফাইনালের আগেই ট্রাম্প কোনো ম্যাচে উপস্থিত হতে পারেন।
তিনি টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমার বস, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে একটি বিষয় বলতে পারি— আমি তাকে প্রায় ৩০ বছর ধরে চিনি। তিনি নাটকীয় মুহূর্ত উপভোগ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি মানুষকে অনিশ্চয়তায় রাখতে পছন্দ করেন। তাই চোখ রাখুন, কিছু চমক দেখা যেতে পারে।’
ন্যায্যভাবে বলতে গেলে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচের সময় তিনি ১৫ থেকে ১৭ জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তির আলোচনা করছিলেন, যা ১৮ জুন ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ভ্যাঙ্কুভারে কাতারের বিপক্ষে দেশের ম্যাচে উপস্থিত থাকলেও, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম জানিয়েছেন, টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি কোনো ম্যাচেই উপস্থিত থাকবেন না।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের দাবি, তিনি মাঠে না গেলেও বিশ্বকাপ থেকে বিচ্ছিন্ন নন। উদ্বোধনী ম্যাচের আগের দিন তিনি যুক্তরাষ্ট্র দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
ফিফাও জানিয়েছে, বিশ্বকাপ আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য তারা কৃতজ্ঞ। প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ম্যাচগুলোতে উপস্থিত থেকেছেন। বৃহস্পতিবার তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিত্ব করেন সেকেন্ড লেডি উষা ভ্যান্স।
সব মিলিয়ে, যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ফাইনালে উপস্থিত হন এবং তার উপস্থিতি ম্যাচের চেয়ে বড় আলোচনার বিষয় না হয়ে ওঠে, তবে সেটিই হবে আয়োজকদের জন্য সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি।
তবে বড় মঞ্চ এবং ব্যাপক প্রচারের সুযোগ তিনি সাধারণত হাতছাড়া করেন না। তাই ফাইনালের আগেই বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে তাকে দেখা গেলে সেটি মোটেও অপ্রত্যাশিত হবে না।
সূত্র: যুগান্তর