ইরান যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিশ্বের বহু দেশ এখন বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত ঝুঁকছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাপক আলোচনায় উঠে এসেছে একটি ধাতুর নাম, আর তা হলো- লিথিয়াম।
বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তির মূল উপাদান হিসেবে লিথিয়ামকে এখন বলা হচ্ছে ‘সাদা সোনা’ বা ‘আশ্চর্য ধাতু’।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লিথিয়াম শুধু একটি খনিজ নয়, বরং এটি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
লিথিয়াম কী ও কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
লিথিয়াম হলো একটি চকচকে রূপালি রঙের হালকা ধাতু, যার ঘনত্ব অত্যন্ত কম ও শক্তি সংরক্ষণের ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি আধুনিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মূল উপাদান, যা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ই-রিডার থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বৃহৎ বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তির গুরুত্ব এতটাই যে, ২০১৯ সালে এই প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য জন বি. গুডএনাফ, এম. স্ট্যানলি হুইটিংহ্যাম এবং আকিরা ইয়োশিনো যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।
এই ব্যাটারি প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫০ ওয়াট-আওয়ার পর্যন্ত শক্তি সংরক্ষণ করতে পারে, যা স্মার্ট ডিভাইস ও ইলেকট্রিক গাড়িকে বাস্তবতায় পরিণত করেছে।
বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ: কারা নিয়ন্ত্রণ করছে লিথিয়াম?
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, চিলি, চীন ও আর্জেন্টিনা বিশ্বের প্রধান লিথিয়াম উৎপাদক দেশ। বিশেষ করে, দক্ষিণ আমেরিকার ‘লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল’- চিলি, আর্জেন্টিনা ও বলিভিয়া এই ধাতুর বৃহৎ মজুতকেন্দ্র।
এই অঞ্চলে লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ জল থেকে লিথিয়াম উত্তোলন করা হয়, যা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধিত হয়। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় কঠিন শিলা থেকে লিথিয়াম খনন করা হয়।
ইউরোপেও জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড ও সার্বিয়ার মতো দেশে লিথিয়ামের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ইউরোপ এখনো চিলি, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
লিথিয়াম কেন এখন বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু?
একটি বিষয় পরিষ্কার যে, আধুনিক বৈদ্যুতিক অর্থনীতির ভিত্তি এখন বিদ্যুৎভিত্তিক ব্যাটারি সিস্টেম, আর সেই ব্যাটারির প্রাণ হলো লিথিয়াম।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও চাহিদার বিস্ফোরণ
২০২১ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতে ২৭১ বিলিয়ন বা ২৭ হাজার ১০০ ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে ব্যাটারি খাতেও বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে লিথিয়ামের চাহিদা প্রায় পাঁচ গুণ বাড়তে পারে। এর প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ।
লিথিয়ামের সবচেয়ে বড় চাহিদা রয়েছে ইভি খাতেই। এছাড়া ব্যাটারি স্টোরেজ, কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস ও শিল্পখাতেও এই ধাতুর চাহিদা বাড়ছে, তবে তুলনামূলক কম।
পরিসংখ্যানগতভাবে এটি বোঝায় যে বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, আর লিথিয়াম সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হয়ে উঠছে।
এদিকে, বিশ্বজুড়ে গাড়ি শিল্প দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বৈদ্যুতিক শক্তির দিকে যাচ্ছে। টেসলা, বিওয়াইডি, এক্সপেং ও অন্যান্য কোম্পানি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইভিতে বিনিয়োগ অন্য যে কোনো নবায়নযোগ্য খাতের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে।
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিয়মিত উৎপাদন। কিন্তু লিথিয়াম ব্যাটারির ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই ও এগুলো অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে গ্রিডে সরবরাহ করে। ফলে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে।
স্মার্টফোন, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস, সবকিছুতেই ব্যাটারির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে লিথিয়ামের চাহিদা বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
লিথিয়াম কি বিশ্ব অর্থনীতির নতুন কেন্দ্র? কেন এটিকে ভবিষ্যতের ‘চাবিকাঠি’ বলা হচ্ছে?
ইরান যুদ্ধের পর তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে লিথিয়াম একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দুই দশকে লিথিয়াম বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি মূল উপাদানে পরিণত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রতিযোগিতায়’ নেমেছে।
কেউ কেউ একে বলছেন- বিংশ শতাব্দী যেমন ছিল তেলের যুগ, তেমনি একবিংশ শতাব্দী হতে পারে লিথিয়ামের যুগ।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করেন, লিথিয়াম ছাড়া পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়। কারণ- এটি জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমায়, বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থাকে বাস্তবায়নযোগ্য করে, নবায়নযোগ্য শক্তিকে কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করে ও দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে।
আছে চ্যালেঞ্জও
লিথিয়াম নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি কিছু গুরুতর উদ্বেগও রয়েছে। ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-
লবণাক্ত অঞ্চল থেকে লিথিয়াম উত্তোলনে প্রচুর পানি লাগে। এক টন লিথিয়াম উৎপাদনে প্রায় ৭০ হাজার লিটার পানি লাগতে পারে। এর ফলে চিলি ও আর্জেন্টিনায় পানি সংকট আরও বাড়ছে।
আবার এই ধাতুর খনন প্রক্রিয়া জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর। ফলে এর উৎপাদনে কার্বনের ব্যাপক নিঃসরণ ঘটে।
আবার লিথিয়াম দিয়ে তৈরি ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার এখনো সীমিত। তাছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ব্যাটারি সুরক্ষা সমস্যা ও আগুন লাগার ঝুঁকি রয়েছে।
সূত্র: ব্লুমবার্গ, ইউরোনিউজ, রয়টার্স