মহসিন কবির: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর পর দেশটির সঙ্গে নেপথ্যে পরোক্ষভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলতে শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরান অবশ্য আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা’ হিসেবে দেখছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আরজিসির দাবি, শত্রুপক্ষের যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা তাদের নজর এড়িয়ে যায়নি। যেকোনো নতুন আগ্রাসনের নির্দেশদাতা, বাস্তবায়নকারী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আঘাত হানা হবে বলে ইরান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় চিন্তিত ট্রাম্প নানা অজুহাতে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে থাকেন। সর্বশেষ যুদ্ধের ২৪তম দিন সোমবার তিনি হঠাৎ করে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’র দাবি করে ৫ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর যে কোনো ধরনের হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। এমন কোনো আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে ইরান।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও পালটা হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে। তবে ইরান আলোচনার একটি উদ্যোগের কথা স্বীকার করেছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরুর বিষয়টি সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এ আলোচনা কবে কোথায় হতে পারে তা নিয়েও কথাবার্তা চলছে। ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে দেশে-বিদেশে নানামুখী চাপে আছেন ট্রাম্প।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে জনমত জরিপে ট্রাম্পের সমর্থন কমছে। তেমননি ন্যাটো, ইইউসহ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো তার ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে সমর্থন দেয়নি। এমন চতুর্মুখী চাপে তিনি পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে একতরফা হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেন। ওদিকে নিজেকে বাঁচাতে ইরান যুদ্ধের দায় এবার প্রকাশ্যেই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়েছেন ট্রাম্প। এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। খবর বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, আলজাজিরার।
ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের দুটি গ্যাস স্থাপনা এবং একটি পাইপলাইন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি থেকে ৫ দিনের বিরতি ঘোষণা করেছিলেন। ইরানের ফারস নিউজ বলেছে, ইহুদিবাদী ও মার্কিন শত্রুদের চলমান হামলার অংশ হিসাবে ইসফাহানের কাভেহ স্ট্রিটের গ্যাস প্রশাসন ভবন এবং গ্যাস প্রেশার রেগুলেশন স্টেশন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় এসব স্থাপনা ‘আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে বলে ফারস নিউজ জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খোররামশাহর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস পাইপলাইনেও হামলা চালানো হয়েছে। ইরাক সীমান্তবর্তী ওই শহরের গভর্নর বলেছেন, খোররামশাহর গ্যাস পাইপলাইন প্রসেসিং স্টেশনের বাইরের এলাকায় একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। তবে অবকাঠামো স্বাভাবিকভাবে সচল রয়েছে এবং গ্যাস সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীও ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ‘উৎপাদনকেন্দ্র’ লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালানোর দাবি করেছে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। সোমবার রাতে ইসরাইলি বিমানবাহিনী ৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।
আইডিএফ বলছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে তিন হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে ইসরাইল। ইরানের ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন স্থাপনা ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার জবাবে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও স্থাপনা লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। সোমবার এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির আলোচনা খুব ভালোভাবেই চলছে।
এর আগেই তিনি তেহরানের সঙ্গে আলোচনা এবং ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার বিষয়ে ৫ দিনের বিরতির ঘোষণা দেন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দেওয়া হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে বলে তেহরানকে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই নিজের অবস্থান আকস্মিকভাবে পরিবর্তন করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের আলোচনার দাবি তেহরানের প্রত্যাখ্যান : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ও ঐকমত্য হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। এমন খবরকে ‘মিথ্যা কথা’ বলে উল্লেখ করেছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এমন মন্তব্য করেন। দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এক বিবৃতিতে একই দাবি করে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, ইরানের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কথা হয়েছে। ইরানই প্রথমে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছিল।
এ বিষয়ে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছেও একই দাবি করেন। ফ্লোরিডার একটি বিমানবন্দরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বেশ জোরালো আলোচনা হয়েছে এবং দুপক্ষ ‘প্রধান প্রধান বিষয়ে একমত’ হতে পেরেছে। রোববার হওয়া আলোচনা সোমবারও অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্প বলেন, ‘দেখা যাক, এগুলো (জোরালো আলোচনা) কোন দিকে নিয়ে যায়। আমি বলব, আমাদের মধ্যে প্রধান প্রধান বিষয়ে ঐকমত্যের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এমনকি প্রায় সব বিষয়ে আমরা একমত হতে পেরেছি।’
ট্রাম্পের এমন দাবির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতে মিথ্যা খবর ব্যবহার করা হচ্ছে।’ দ্বিতীয় একটি পোস্টে গালিবাফ লেখেন, ইরান ‘আগ্রাসনকারীদের পূর্ণাঙ্গ ও অনুশোচনামূলক শাস্তি’ দাবি করে। এ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের কর্মকর্তারা ‘দৃঢ়ভাবে তাদের সর্বোচ্চ নেতা ও জনগণের পাশে রয়েছেন।’
গালিবাফের পোস্টের আগে এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার খবরটি অস্বীকার করেন। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি এবং যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে তেহরানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাগাইয়ের বরাতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অনুরোধ নিয়ে কিছু বন্ধু দেশের কাছ থেকে বার্তা পাওয়া গেছে।
পূর্ণাঙ্গ বিজয় পর্যন্ত লড়াই চালানোর ঘোষণা ইরানের : ট্রাম্পের যুদ্ধ বিরতির ঘোষণার মধ্যেও হামলার প্রেক্ষিতে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয় না আসা পর্যন্ত’ লড়াই চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। মঙ্গলবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডের একজন মুখপাত্র এই ঘোষণা দিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর খাতাম-আল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কর্মকর্তা আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদির এ ঘোষণা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ইরানের অখণ্ডতা রক্ষায় দেশের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গর্বিত, বিজয়ী এবং অবিচল। পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই পথচলা অব্যাহত থাকবে।’ ইরানি এই জেনারেল ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যে কোনো আলোচনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করতেই ইরানি সামরিক বাহিনীর অবস্থানের বিষয়ে তিনি ধারণা দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে অচল করে দেওয়ার হুমকি আইআরজিসির : মার্কিন সামরিক বাহিনী যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অচল’ করে দেবে তেহরান। একই সঙ্গে আরব উপসাগরে থাকা মার্কিন সব জাহাজকে ‘ডুবিয়ে’ দেবে ইরানের সামরিক বাহিনী।
মঙ্গলবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী এক্সপেডিয়েন্সি ডিসসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মহসেন রেজায়ি ওই হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকাকে বাঁচানোর চূড়ান্ত সময় ঘনিয়ে আসছে’ এবং এই জলাভূমি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্ধারের খুব বেশি সময় বাকি নেই।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় প্রস্তুত পাকিস্তান : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতা করতে এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত পাকিস্তান। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আগ্রহের কথা জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আলজাজিরাকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো চাইলে ইসলামাবাদ সব সময়ই আলোচনার আয়োজন করতে ইচ্ছুক। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবেই সংলাপ এবং কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে আসছে।’
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করলেও মার্কিন ও ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের দাবি-পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক কয়েক দিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করছে। দেশগুলো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। প্রতিবেদনে এমন আভাসও দেওয়া হয়েছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইসলামাবাদে দুদেশের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হতে পারে, যদিও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এদিকে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বৈঠকের স্থান হিসাবে নিজেদের রাজধানী ইসলামাবাদকে প্রস্তাব করেছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধের দায় এবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ওপর : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর দায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপিয়েছেন। সোমবার টেনেসির মেমফিসে ‘সেফ টাস্কফোর্সের’ এক গোলটেবিল বৈঠকে ট্রাম্প বলেছেন, প্রশাসনের সদস্যদের মধ্যে হেগসেথই প্রথম তাকে ইরানে হামলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বৈঠকে পেন্টাগন প্রধান হেগসেথের পাশেই বসা ছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি পিটকে ডাকলাম, জেনারেল কেইনকে ডাকলাম। আমাদের আরও অনেক দক্ষ ব্যক্তিকে ডেকে বললাম, আসুন আলোচনা করি। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের একটি সমস্যা আছে। ইরান নামের দেশটি ৪৭ বছর ধরে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে।
তারা এখন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আমরা চাইলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে দিতে পারি, অথবা মধ্যপ্রাচ্যে একটি ছোট অভিযানের মাধ্যমে এই বড় সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারি।’ ট্রাম্প দাবি করেন যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথই প্রথম ইরানের ওপর হামলার পক্ষে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘পিট, আমার মনে হয় আপনিই প্রথম মুখ খুলেছিলেন এবং বলেছিলেন, চলুন এটা করি, কারণ তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে দেয়া যায় না।’
হামলা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ : ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। গত সপ্তাহে বেশ কয়েকবার ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে সৌদি যুবরাজের।
এ আলোচনার বিষয়ে জানেন-এমন সূত্রের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস এ তথ্য জানিয়েছে। সৌদি যুবরাজ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুক্তি দিচ্ছেন, মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ সুযোগ এনে দিয়েছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে রেখেছে, যা ইরান সরকারকে নির্মূল করার মাধ্যমে দূর করা যেতে পারে। তবে সৌদি কর্মকর্তারা যুবরাজের এমন অবস্থানের কথা অস্বীকার করেছেন।
ইরানে অভ্যুত্থান ঘটাতে মোসাদের ব্যর্থতায় ক্ষিপ্ত নেতানিয়াহু : ইরানে হামলার আগে সেখানে গণ-আন্দোলন উসকে দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করেছিল ইসরাইল। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হওয়ার চটেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রোববার নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বর্তমান, সাবেক মার্কিন ও ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে রাজি করিয়েছিলেন, তখন তিনি এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
ইসরাইলের চ্যানেল ১২-তে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া নেতানিয়াহুর সামনে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ইরানের নেতাদের হত্যা হওয়ার পর মোসাদ ইরানি বিরোধী দলকে প্ররোচিত করতে পারবে এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে গণবিক্ষোভ এবং প্রতিরোধ সৃষ্টি করে সরকারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারবে। তিনি এই পরিকল্পনা হোয়াইট হাউজেও উপস্থাপন করেছিলেন।
আয়াতুল্লাহর সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের আশা ট্রাম্পের : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ‘খুব শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তিনি এবং ইরানের আয়াতুল্লাহ ‘যৌথভাবে’ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করবেন। সোমবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা যদি এই গতিতে এগোতে থাকে, তবে ‘এটি খুব শিগগিরই খুলে যাবে। এটি যৌথভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। আমি এবং আয়াতুল্লাহ, তিনি যে-ই হোন না কেন, বা পরবর্তী আয়াতুল্লাহ যিনিই হোন না কেন।’
ইরানে মার্কিন পদক্ষেপ ‘পরিকল্পনাহীন’, ‘এলোমেলো’: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানকে ‘পরিকল্পনাহীন’ ও ‘এলোমেলো’ বলে বর্ণনা করেছেন সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন। তিনি ইরানে হামলাকে ‘সুচিন্তিত নয়’ বলেও মন্তব্য করেছেন। তেহরানের সরকারকে বদলানোর দীর্ঘদিনের সমর্থক বোল্টন বিবিসির ‘নিউজনাইট’ অনুষ্ঠানকে বলেন, ‘ট্রাম্প যেভাবে এগোচ্ছেন, সেই পরিকল্পনাহীন পন্থার বদলে সঠিক উপায়ে এটি করা ভালো হতো।’ বোল্টন আরও বলেন, ‘এজন্য মার্কিন জনগণ প্রস্তুত ছিল না, কংগ্রেসও প্রস্তুত ছিল না, এমনকি মিত্র দেশগুলোও প্রস্তুত ছিল না।’
দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিকের মতে ইরান যুদ্ধ ‘ইচ্ছাকৃত’ : যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ যতটা না প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে বেশি ইচ্ছাকৃত। সিবিএস নিউজ ও ইউগভের নতুন জরিপ থেকে এই মতামত জানা গেছে। ১৭ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত অনলাইনে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ৩ হাজার ৩৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক মতামত দিয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন, যা চলতি মাসের শুরুতে ছিল ৫৬ শতাংশ।
প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এছাড়া ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুদ্ধ আমেরিকার জন্য খারাপ দিকে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ৬৬ শতাংশ মানুষ একে ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’ এবং ৩৪ শতাংশ ‘প্রয়োজনীয় যুদ্ধ’ বলে মনে করেন। ৯২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ৭৩ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার এটাকে ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ মনে করলেও ৬৭ শতাংশ রিপাবলিকান যুদ্ধকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। তবে জরিপে অংশ নেওয়াদের প্রায় ৯২ শতাংশ একটি বিষয়ে একমত। তা হলো-‘এই সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা জরুরি।’