পার্সটুডে: চীনের সংবাদ মাধ্যম সিজিটিএন বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে উপস্থিত হতে ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় শরিকদের পক্ষ থেকে মার্কিন সরকারের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টি পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তিগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়ার লক্ষণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে বিশ্বের ওপর ওয়াশিংটনের কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে। এ প্রসঙ্গে সিজিটিএন বলেছে, ইরানের মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালীতে উপস্থিত হতে মার্কিন মিত্রদের অসম্মতি কেবল ন্যাটো জোটের মধ্যে বিভাজনকেই যে গভীরতর করেছে তা নয় পাশ্চাত্যের নিরাপত্তার ভিত্তিগুলোকেও নড়বড়ে করেছে।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর সামুদ্রিক পরিবহনে অচলাবস্থা দেখা দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে সিজিটিএন লিখেছে, হরমুজ প্রণালি মূলত বিশ্ব-অর্থনীতির গলা বন্ধ করে দিয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় এই প্রণালি খুলতে সক্ষম নয়।
ব্রিটিশ বিশ্লেষক মাইকেল ক্লার্কও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি বাস্তব নয় এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া সহজ কাজ নয় এবং ওয়াশিংটন তা করতে সক্ষমও হবে না।
এদিকে বেলজিয়ামের একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, মার্কিন হেজিমনি বা একাধিপত্যের যুগ শেষ হওয়ার খুব কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে। ই. দ্যোপারে নামের এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেছেন, ওয়াশিংটন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিআমিন নেতানিয়াহুর নব্য-উপনিবেশবাদী ও ফ্যাসিস্ট আদর্শের আলোকে তেলআবিবের আগ্রাসী নীতির অনুসারী হয়েছে।
ওদিকে বিবিসি জানিয়েছে, কৌশলগত আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানি হামলাগুলোর ফলে যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি ডলার। এ প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র উপদেষ্টা মার্কিন কানসিয়ান বলেছেন, এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেসবের বাস্তব রিপোর্ট খুব কমই করা হয়েছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক রবার্ট পিপ মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের উত্তেজনা সৃষ্টির মোকাবেলায় ইরানি শক্তিমত্তা ও ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘ইরান এখন যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। বিশ্ব-বাজারে জ্বালানী তেলের দরের নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের হাতে। ইরান মার্কিন-ইহুদিবাদী জোটকে ধ্বংস করে দিতে পারে এমন সম্ভাবনা ওয়াশিংটনের মাধ্যমে ওই জোটকে জোরদার করার সম্ভাবনার চেয়ে বেশি জোরালো।
ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বন্ধ করায় ও নিয়ন্ত্রণ করায় সেখান ইরান-বিরোধী নৌ-জোট গড়ার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।মার্কিন হুমকি সত্ত্বেও এখনও কোনও দেশ মার্কিন সরকারের সহযোগী হতে প্রস্তুত বলে ঘোষণা করেনি। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এই যুদ্ধকে মার্কিন যুদ্ধ বলে মনে করছে এবং এই সংঘাতে জড়িত না হওয়াকে তারা প্রাধান্য দিচ্ছে।
ইরানের জাতীয় সংসদ মজলিশে শুরায়ে ইসলামীর প্রধান তথা স্পিকার বলেছেন, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়েছে এবং পরবর্তী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের সময় হয়েছে।
পার্সটুডে জানিয়েছে, মোহাম্মাদ বাকের কলিবফ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইসরায়েল যখন অত্যন্ত সুরক্ষিত 'দিমুনা' পরমাণু স্থাপনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠেকাতে পারছে না, সামরিক অভিযানের দিক থেকে এই অবস্থা পরবর্তী নতুন পর্বে প্রবেশের সবুজ সংকেত: ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও লিখেছেন, এর ফলে দৃশ্যত পরবর্তী পরিকল্পনাগুলো যা আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়েছে সেসব বাস্তবায়নের সময় হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলোর আওতাধীন সম্ভাব্য কর্মসূচিগুলোর বিষয়ে কিছু লেখেননি তিনি।
উল্লেখ্য, ইহুদিবাদী ইসরায়েল ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইসরায়েলের দিমুনা ও অন্য আরও একটি পরমাণু স্থাপনা বিনা বাধায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। ইসরায়েলের এইসব স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরান বেশ কিছুকাল আগে দিমুনা পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানোর জন্য বিশেষ মহড়া ও প্রশিক্ষণের অনুশীলন সম্পন্ন করেছিল।
নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি কেমন হয়েছে তা জানা যায়নি, তবে পাথুরে পাহাড় ও মাটির অত্যন্ত গভীরে অবস্থিত এই পরমাণু স্থাপনার ক্ষতি করা বেশ কঠিন বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের এই পরমাণু স্থাপনাসহ তিনটি পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।