শিরোনাম
◈ নতুন মার্কিন বাণিজ্য নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানিতে মারাত্মক হুমকি ◈ গুরুতর আহত মোজতবা খামেনি, গোপনে মস্কোতে অস্ত্রোপচার—আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি ◈ সৌদির সাড়ে ৭০০ মাইলের পাইপলাইন কি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হতে পারবে ◈ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ কীভাবে কোটি মানুষের খাদ্য সংকট ডেকে আনতে পারে: আরটি’র রিপোর্ট ◈ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন বাণিজ্য জোটে বাংলাদেশের নজর ◈ সি‌রিজ জ‌য়ে আন‌ন্দিত ত‌বে শেষ ওভা‌রে ১৪ রান লাগ‌বে ব‌লে ভ‌য়ে ছিলাম: মিরাজ ◈ ক্রেডিট কার্ডের ঋণসীমা বাড়ালো কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সর্বোচ্চ মিলবে ৪০ লাখ টাকা ◈ তানজিদের সেঞ্চুরি, তাসকিনের ঝলক—পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় ◈ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এলোপাতাড়ি গুলি, একজন আহত ◈ প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সেজিল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইরান

প্রকাশিত : ১৬ মার্চ, ২০২৬, ০১:৩১ রাত
আপডেট : ১৬ মার্চ, ২০২৬, ০৪:০৬ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সৌদির সাড়ে ৭০০ মাইলের পাইপলাইন কি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হতে পারবে

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সৌদির ভেতর দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত পাইপলাইন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছবি: আরামকো

মিডল ইস্ট আই এর প্রতিবেদন: পারস্য উপসাগরে তেলের ট্যাংকারে আগুন জ্বলছিল, আর সৌদি আরব আশঙ্কা করছিল—ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাবে। ১৯৮০-এর দশকে এই প্রণালি বাইপাস করে বা এড়িয়ে যেতে মরুভূমিতে যে পাইপলাইনটি তারা তৈরি করেছিল, চার দশক পর সেটিই এখন ‘পুরোদমে চালু’ হচ্ছে। কারণ, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নজিরবিহীন পতনের মুখে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের গত মঙ্গলবার জানান, তারা ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ বাড়াচ্ছেন এবং কয়েক দিনের মধ্যেই এর দৈনিক পূর্ণ সক্ষমতা ৭ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছাবে।

পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ৭৫০ মাইল দীর্ঘ এই পাইপলাইন এখন উপসাগরীয় তেল রপ্তানির প্রধান ভরসা।

এই পাইপলাইন সৌদি রাজকোষে অর্থ আনতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মূল্যবান সময় এনে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপন্ন করছে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে।

হিউস্টনের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জিম ক্রেন বলেন, ‘এই পাইপলাইন চালু করা বাজারের জন্য বিশাল সহায়তা।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি ঠিক এই কাজের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল—ইরান হরমুজ বন্ধ করে দিলে কৌশলগত এই সংকীর্ণ পথ এড়িয়ে যাওয়া এবং সৌদি আরবকে শেষ ভরসার উৎপাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।’ তবে এই পাইপলাইন কোনোভাবেই সম্পূর্ণ নিরাপদ সমাধান নয়।

লোহিত সাগর কি হরমুজের অচলাবস্থা ভাঙতে পারবে

গত বছর সৌদি আরব দৈনিক ৬৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেলজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়ানবু স্থাপনা সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা জোরদার করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা যায়।

মঙ্গলবার আবুধাবির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রুওয়াইস শোধনাগার বন্ধ করে দেয়। ড্রোন হামলার পর সেখানে আগুন লাগার কারণে। এ দিকে, হরমুজ প্রণালি কার্যত অ-ইরানি জাহাজের জন্য বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানায়, ইরান ওই সংকীর্ণ জলপথে মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০টি নিষ্ক্রিয় মাইনবাহী জাহাজ ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছে।’

হরমুজ বন্ধ থাকায় ইরাক, বাহরাইন ও কুয়েতের জ্বালানি উৎপাদন কার্যত থেমে গেছে। বাহরাইনের তেল উৎপাদক সংস্থা বিপকো সোমবার ‘ফোর্স মেজর’ বা বাধ্যতামূলক উৎপাদন হ্রাস ঘোষণা করেছে। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতারও, যা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে।

সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং চার মিলিয়ন ব্যারেল পরিশোধিত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ও ছোট একটি আমিরাতি পাইপলাইন চালু থাকলেও বাজারে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংকট শুধু অপরিশোধিত তেলের নয়, বরং তা থেকে তৈরি জ্বালানি নিয়েও। ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আসলে এগুলোই ব্যবহার করে।

ট্রান্সভার্সাল কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও ‘সৌদি ইনক’ বইয়ের লেখক এলেন ওয়াল্ড বলেন, ‘যদি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে আরামকোর সব অপরিশোধিত তেল ইয়ানবুতে পাঠানো হয়, তাহলে এটি আর গ্যাস বা তেলজাত পণ্য বহন করতে পারবে না।’ যুদ্ধ কত দিন চলবে—এই প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজার প্রতিক্রিয়া দেখানোয় তেলের দাম এ সপ্তাহে অস্থির ছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট তেলের দাম সোমবার ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ছুঁয়ে মঙ্গলবার ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৮৮ দশমিক ৯৩ ডলারে লেনদেন হয়েছে।

জেট জ্বালানি ও ডিজেলের সংকট

গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোহমান রাসমুসেন বলেন, অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও বাস্তব অর্থনীতির জন্য তা স্বস্তি নাও আনতে পারে, কারণ শিল্প ও পরিবহন নির্ভর করে ডিজেল, জেট জ্বালানি ও ফুয়েল অয়েলের ওপর। তিনি বলেন, ‘এটি মূলত ডিস্টিলেট সংকট। বিশেষ করে ইউরোপে জেট জ্বালানি ও ডিজেলের সংকট। পাইপলাইন বা কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার সমস্যা হলো, এগুলো মূলত অপরিশোধিত তেলের বাজারকেই সরবরাহ দেয়।’

জি-৭ দেশের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খবরও ব্রেন্ট তেলের দাম কমাতে সহায়তা করেছে। রাসমুসেন বলেন, ‘অচলাবস্থা বেশি পরিশোধিত পণ্যে, অপরিশোধিত তেলে নয়। বাজার ও অর্থনীতিবিদরা বিষয়টি বোঝেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউরোপের জন্য বিশেষভাবে সমস্যাজনক, কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার তেলজাত পণ্যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর ইউরোপ উপসাগরীয় শোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’ তাঁর মতে, ২০২৬ সালের শুরুতে ইউরোপের ডিজেল আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং জেট জ্বালানির প্রায় অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে।

লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের শোধন ক্ষমতা থাকলেও এশিয়ায় অপরিশোধিত তেল সরবরাহের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হয়, যা ২০২৩ সালে সৌদি রপ্তানির ৭৫ শতাংশ ছিল। ওয়াল্ড বলেন, ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের চুক্তি এবং তেলজাত পণ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারে না।’

নতুন ঝুঁকি: হুতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি লোহিত সাগরে সরিয়ে নেওয়ায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো গ্রেগ প্রিডি বলেন, ‘এতে হুতিদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। পুরো অবকাঠামোই ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে, আর ইয়ানবু থেকে এশিয়ায় যাওয়া তেলকে বাব এল-মান্দেব প্রণালি পার হতে হয়।’

এর আগে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে হুতিরা লোহিত সাগরকে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রায় নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় এসে বিমান হামলার মাধ্যমে হুতিদের দমন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে যায়।

এ পর্যন্ত হুতিরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি। তারা তেহরানের মিত্র হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজেদের তারা লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের তুলনায় বেশি স্বাধীন মনে করে।

প্রায় তিন বছরের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যেও হুতি-সৌদি নাজুক যুদ্ধবিরতি টিকে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুতিরা নতুন করে লড়াই শুরু করতে অনিচ্ছুক হতে পারে, কিন্তু তারা ইরানের একটি বড় তাস হিসেবেই রয়ে গেছে। প্রিডি বলেন, ‘আমার মনে হয় না ইরান এখনো পুরো মাত্রায় উত্তেজনা বাড়িয়েছে। হুতিদের যুদ্ধে প্রবেশ সংঘাতের নতুন ধাপের সূচনা হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ইরান লক্ষ্য নির্বাচন খুব সতর্কভাবে করছে। হরমুজ বন্ধ করা এবং উপসাগরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালালেও তারা স্থায়ী ক্ষতি এড়িয়ে চলছে। তাঁর ভাষায়, ‘ইরান সৌদি অবকাঠামোয় এমনভাবে হামলা করছে যাতে দীর্ঘ মেয়াদে সৌদি আরব ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, কিন্তু অন্য সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি আরব যদি যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যাবে।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়