চীন নতুন একটি মরুভূমি সৃষ্টি করেছে। তা এখন আর সূর্যের রশ্মিকে প্রতিফলিত করে না। সূর্যের আলোকে শোষণ করে। ইনার মঙ্গোলিয়ার সোনালি বালিয়াড়িতে তৈরি করা অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল সূর্যের রশ্মি শোষণ করছে। এটিই বিশ্বের বৃহত্তম সৌর খামারগুলোর একটি। স্থানীয় বাসিন্দা শিন গুইই সারা জীবন এখানে কাটিয়েছেন। তিনি দেশের প্রয়োজনে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, আগে খুব শুকনো ছিল সবকিছু। মরুভূমিও বড় হচ্ছিল। অতিরিক্ত চারণভূমি ব্যবহার ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছিল। ঘাস কমছিল। গত দশকে কুবুচি মরুভূমির ৪৬,০০০ হেক্টরের বেশি জমি সৌর প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সৌর প্যানেল ছায়া ও বাতাবরণ তৈরি করে ঘাস রক্ষা করতে সাহায্য করছে। এ নিয়ে অনলাইন বিবিসি একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২০ সালে জাতিসংঘে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের শীর্ষে পৌঁছানো এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য পূরণের ঘোষণা দেন। বিশ্লেষক সংস্থা কার্বন ব্রিফ জানিয়েছে, চীনের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন গত ২১ মাস ধরে স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জলবায়ু নীতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে নির্গমন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক রায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিপ্লবের নেতৃত্বে এখন বেইজিং।
সৌর শক্তিতে চীনের উত্থান
২০১০ সালে চীন সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জার্মানি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার পেছনে ছিল। তখন বড় সৌর খামার ছিল হাতে গোণা। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, এখন চীনের মোট সৌর সক্ষমতা ১,০৬৩ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে। কয়েক বছর ধরে সৌর ও বায়ুশক্তি যোগে নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার ক্ষেত্রে চীন একাই বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সমান বা বেশি যোগ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জানিয়েছে, বিশ্বে উৎপাদিত প্রতি সাতটি সৌর প্যানেলের একটি তৈরি হয় চীনের একটি মাত্র কারখানায়। চীন বৈদ্যুতিক যান (ইভি), ব্যাটারি ও সৌর প্যানেল- এই তিন খাতে বিশেষভাবে বিনিয়োগ করেছে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও ঋণ এই খাতকে দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে।
অতিরিক্ত সরবরাহ ও মূল্যযুদ্ধ
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে। প্যানেল ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ বেশি হওয়ায় মূল্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে শীর্ষ সৌর কোম্পানিগুলো প্রায় ৩৮.৪ বিলিয়ন ইউয়ান ক্ষতির আশঙ্কা করছে বলে নিক্কেই জানিয়েছে। কয়েকটি প্রদেশ গত বছর ১০.৬৭ গিগাওয়াট ক্ষমতার ১৪৩টি প্রকল্প বাতিল করেছে। চীনের বিদ্যুৎ গ্রিড এখনও বড় অংশে কয়লার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে বিদ্যুতের ৫৮ ভাগ এসেছে কয়লা থেকে, যদিও সৌর ও বায়ুশক্তির অংশ বেড়ে ১৮ ভাগ হয়েছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
ইউনান প্রদেশে ঐতিহ্যবাহী চা বাগানের জায়গায় সৌর প্যানেল বসানো হচ্ছে। চাষি দুয়ান তিয়ানসং বলেন, আমার মন কাঁদে। রাতে ঘুমাতে পারি না। তিনি আশঙ্কা করছেন, মাটি আলগা হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক গ্রামবাসী ক্ষতিপূরণ বা জমি হারানোর বিষয়ে অসন্তুষ্ট। আনহুই প্রদেশে এক সময়কার বড় কয়লাখনির কারণে জমি ধসে নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান সৌর প্রকল্প গড়ে ওঠে। কিন্তু বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে।
চীন একই সঙ্গে দুটি প্রতিযোগিতায় আছে। ১. বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি ও ১৪০ কোটির বেশি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ। ২. কয়লার বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি গড়ে তোলা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে চীন এতটাই এগিয়ে গেছে যে অন্য দেশগুলোর পক্ষে তা ধরতে দশক লেগে যেতে পারে। এশিয়া সোসাইটির ক্লাইমেট হাবের লি শৌ বলেন, এটি চীনের জন্য এক বিশাল জয়। এখন প্রশ্ন হলো- অন্যান্য দেশ চীনের সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে। তবে এই দ্রুত পরিবর্তনের মাঝেও অনেক সাধারণ মানুষের জন্য এটি আরেকটি অস্থির রূপান্তর- যেখানে তাদের মতামত বা জীবিকার নিরাপত্তা সবসময় অগ্রাধিকার পায় না। চীন এখন বৈশ্বিক সবুজ শক্তির অপরিহার্য কেন্দ্র। কিন্তু এই বিপ্লবের সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য কত- সে প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মিটেনি।