বিনা বাধায় দেশ ভ্রমণ, সীমান্তে ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়ানো কিংবা স্বপ্নের কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ—দ্বৈত নাগরিকত্বের এমন সুবিধা কে না চায়! এমনকি এই সুবিধা নিতে চান হলিউড তারকারাও। যেমন ২০২৫ সালের শেষ দিকে সপরিবার ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পেয়েছেন অভিনেতা জর্জ ক্লুনি। খবর: সিএনএন
ভ্রমণপিপাসু আর প্রবাসীদের কাছে দ্বৈত নাগরিকত্ব সব সময়ই এক সোনার হরিণ। বর্তমান বিশ্বের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে স্থানীয় নাগরিকদের মতো দাপটে চলার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। ক্লুনির মতো যারা ভিনদেশে থাকার বা কাজ করার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু কোনো স্পন্সর পান না, তাদের জন্য দ্বিতীয় পাসপোর্টটি যেন জাদুর চাবি। এমনকি যাদের এখনই দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা নেই, তাদের জন্যও এটি বাড়তি এক নিরাপত্তা।
তবে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে হাওয়াবদল শুরু হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ এখন আর আগের মতো মসৃণ নেই। ২০২৫ সালে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ বংশসূত্রে বা অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব (গোল্ডেন পাসপোর্ট) পাওয়ার নিয়ম কঠোর করেছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে। ওহাইওর রিপাবলিকান সিনেটর বার্নি মোরেনো 'এক্সক্লুসিভ সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট' নামের এক আইনের প্রস্তাব করেছেন। এই আইন পাস হলে আমেরিকান নাগরিকেরা আর অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব রাখতে পারবেন না।
দ্বৈত নাগরিকত্ব আসলে কতটা জনপ্রিয়?
বিশ্বে ঠিক কত মানুষ দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী, তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করা অসম্ভব বলে মনে করেন টেম্পল ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক পিটার স্পিরো। কারণ, অধিকাংশ দেশই তাদের নাগরিকদের অন্য দেশের পাসপোর্টের তথ্য জানাতে বাধ্য করে না।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের ২০২১ সালের আদমশুমারি বলছে, দেশটির ২ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ একাধিক পাসপোর্টধারী, যা ২০১১ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। আর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬ শতাংশ মানুষ নিজেদের দ্বৈত নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।
বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকা 'হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স'-এ প্রথমবারের মতো সেরা ১০ থেকে ছিটকে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে ১২তম অবস্থানে রয়েছে তারা।
অভিবাসীরা সাধারণত নতুন কোনো দেশে থিতু হলেও নিজের শেকড় বা আদি দেশের নাগরিকত্ব ছাড়তে চান না। আর গত কয়েক দশকে ধনীরা বিশ্বজুড়ে অবাধ চলাচলের সুবিধা পেতে দ্বৈত নাগরিকত্বের দিকে ঝুঁকেছেন।
তবে বিশ্ব পরিস্থিতি যত অস্থিতিশীল হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেশান্তরী হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। নভেম্বরে গ্যালাপের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন মার্কিন নাগরিকের একজন দেশ ছাড়তে চান। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশ। ২০১৪ সালের তুলনায় দেশ ছাড়তে চাওয়া নারীর এই হার ৪০০ শতাংশ বেড়েছে!
বিদেশে নতুন জীবনের এই আকাঙ্ক্ষা দ্বিতীয় পাসপোর্টের আবেদনেও প্রতিফলিত হচ্ছে। নাগরিকত্ব নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান 'হেনলি অ্যান্ড পার্টনারস'-এর কর্মকর্তা ডমিনিক ভোলেক জানান, ২০২৫ সালে তারা ৯১টি দেশের মানুষকে নাগরিকত্ব পেতে সহায়তা করেছেন। আর এই তালিকায় সবার ওপরে ছিলেন মার্কিনরা।
আমেরিকান ও ব্রিটিশদের কেন এত আগ্রহ?
ডমিনিক ভোলেক বলছিলেন, 'তিন-চার বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের কোনো অফিস ছিল না, আর এখন ৯টি!' বুঝতেই পারছেন, মার্কিনিদের মধ্যে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার আগ্রহ কতটা বেড়েছে। বর্তমানে ভোলেকের প্রতিষ্ঠানের মোট গ্রাহকের ৩০ শতাংশই আমেরিকান।
রাজনীতির মাঠের অস্থিরতা নিয়ে অসন্তুষ্ট তো অনেকেই, তা তিনি যে দলের সমর্থকই হোন না কেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কোভিডের অভিজ্ঞতা। করোনার সময় অতিধনীরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন যে কেবল মার্কিন পাসপোর্ট পকেটে থাকলেই সব দরজা খোলে না। তাই তারা এখন বিকল্প খুঁজছেন।
তালিকায় ওপরের দিকে উঠে এসেছে ব্রিটিশরাও। ব্রেক্সিটের কারণে ইউরোপে অবাধ চলাচলের সুবিধা হারিয়েছে তারা। এর ওপর বর্তমান লেবার সরকারের কড়া কর নীতির কারণে ধনী ব্রিটিশরা এখন দেশের বাইরে তাকাচ্ছেন।
ভোলেক জানান, মহামারির পর নাগরিকত্ব প্রত্যাশীদের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশের মানুষই মূলত দেশ ছাড়তে চাইতেন। কিন্তু এখন হেনলির শীর্ষ ৫ দেশের তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক, চীন ও যুক্তরাজ্য।
এখন মানুষ যে শুধু দেশান্তরী হওয়ার জন্যই পাসপোর্ট করছেন, তা কিন্তু নয়। ভোলেকের মতে, অস্থিতিশীল এই সময়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পাসপোর্ট থাকাটা অনেকটা 'ইনস্যুরেন্স পলিসি' বা বিমার মতো। বিপদের সময় যা কাজে দেবে। আইনের অধ্যাপক পিটার স্পিরোও তা–ই মনে করেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষ এখন দ্বিতীয় পাসপোর্টের সুবিধাগুলো আরও ভালো করে বুঝতে পারছেন। এতে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
নাগরিকত্ব পাওয়ার উপায় কী?
সাধারণত তিনটি উপায়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া যায়: বংশসূত্র, বিনিয়োগ অথবা ন্যাচারালাইজেশন।
বংশসূত্রের ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হয় যে আবেদনকারীর পূর্বপুরুষ ওই নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক ছিলেন। তবে কত প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষ হলে নাগরিকত্ব মিলবে, তা একেক দেশে একেক রকম। কোনো কোনো দেশে আবার পূর্বপুরুষ অন্য দেশের নাগরিক হয়ে থাকলে এই সুযোগ বাতিল হয়ে যায়।
ন্যাচারালাইজেশন প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব পেতে হলে একটি দেশে নির্দিষ্ট সময়—সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর বৈধভাবে বসবাস করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকা যাবে না। অনেক সময় ভাষা, ওই দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর পরীক্ষাও দিতে হয়, প্রমাণ দিতে হয় সচ্চরিত্রের।
এত সব শর্ত পূরণ করার পরও যে নাগরিকত্ব মিলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুলও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটিশ নাগরিক হতে হলে কেবল ফি বাবদই গুনতে হয় ২ হাজার ৩৩৫ ডলার।
বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন। এটি মূলত ধনীদের জন্য। যারা অন্য কোনো দেশের অর্থনীতিতে মোটা অঙ্কের অর্থ ঢালতে পারেন, তাদের জন্যই এই 'সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট' সুবিধা। বিনিয়োগের বিনিময়ে সরাসরি পাসপোর্ট মেলে অথবা বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায়, যা পরে নাগরিকত্বের পথ খুলে দেয়।
দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা কী?
দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা অনেক। এর ফলে ইচ্ছেমতো অন্য দেশে বসবাস করা যায়, কাজের সুযোগ বাড়ে, এমনকি সন্তানদের পড়াশোনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। অধ্যাপক পিটার স্পিরো বলেন, 'আপনার সন্তান যদি ইউরোপের কোনো দেশে পড়াশোনা বা কাজ করতে চায়, তবে ইউরোপীয় পাসপোর্ট থাকলে কোনো ঝক্কিই পোহাতে হবে না।'
পাসপোর্টের শক্তির ওপর ভিত্তি করে ভিসা ছাড়াই বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সুযোগ মেলে। বিদেশে সম্পত্তি কেনা বা ব্যবসা শুরু করাও সহজ হয়। স্পিরোর মতে, 'যাদের সুযোগ আছে, তাদের জন্য এটি লুফে নেওয়া উচিত।'
ব্যবহারিক সুবিধার বাইরে আবেগের একটি বড় জায়গাও দখল করে আছে দ্বৈত নাগরিকত্ব। এটি মানুষকে তার আদি নিবাস বা পূর্বপুরুষের ভিটার সঙ্গে যুক্ত করে। আয়ারল্যান্ড বা ইতালির মতো দেশগুলোর প্রবাসীরা বিশ্বজুড়ে তাদের মাতৃভূমির সুনাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছেন। ইতালীয় নাগরিকত্ব বিশেষজ্ঞ আইনজীবী আদ্রিয়ানা কোকো রুগেরি বলেন, 'এই নাগরিকত্ব ইতালীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করেছে এবং পারিবারিক সম্পর্কের যে মূল্যবোধ, তাকে টিকিয়ে রেখেছে।'
দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা যেমন অনেক, তেমনি অসুবিধাও একেবারে কম নয়। আর এই অসুবিধাগুলো কখনো কখনো বেশ বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রথমেই আসে কর বা ট্যাক্সের বিষয়টি। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরিত্রিয়ার নাগরিক হলে আপনাকে সেই দেশের সরকারকে কর দিতেই হবে। ফলে প্রবাসে বসবাস করলেও করের বোঝা কাঁধ থেকে নামে না।
অন্য অনেক দেশ অবশ্য বসবাসের ওপর ভিত্তি করে কর আরোপ করে, তবে সেখানেও সামগ্রিক করের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ঝুঁকি এখানেই শেষ নয়। ইতালির কথাই ধরুন। ২০২৫ সালে তারা বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম বেশ কঠিন করেছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশে বসবাসরত ইতালীয়রা যদি দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিতে চান, তবে তাদের বছরে ২ হাজার ইউরো ফি দিতে হবে। কেউ যদি ফি না দিয়ে পরে সেবা নিতে চান, তবে আগের সব বছরের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। উল্লেখ্য, মাল্টার বহুল আলোচিত 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' কর্মসূচিও ২০২৫ সালে বন্ধ হয়ে গেছে।
সামরিক বাহিনীতে কাজের বাধ্যবাধকতা বা 'মিলিটারি সার্ভিস' নিয়েও জটিলতায় পড়তে পারেন দ্বৈত নাগরিকেরা। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিষয়টি প্রকট হয়ে ওঠে। ডমিনিক ভোলেক জানান, যুদ্ধের সময় বিদেশে থাকা নাগরিকদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে নবায়নের জন্য দেশে ফিরতে হতো। আর দেশে ফিরলেই যুদ্ধের ডাক পড়ার বা জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে ভর্তির ঝুঁকি ছিল।
ভোলেক বলেন, 'যাদের হাতে তখন ক্যারিবিয়ান পাসপোর্ট ছিল, তারা বেঁচে গেছেন। রাশিয়ান বা ইউক্রেনীয় পাসপোর্ট নবায়ন না করেও তারা দ্বিতীয় পাসপোর্ট দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভ্রমণ চালিয়ে নিতে পেরেছেন।'
চাইলেই যে কোনো দেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়া যায়, বিষয়টি এমন নয়। আর্জেন্টিনা ও ইরানের মতো দেশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি স্বীকারই করে না। আবার তুরস্কের নাগরিকত্ব ছাড়তে হলে পুরুষদের অবশ্যই সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয় অথবা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অব্যাহতি নিতে হয়। ৪৫ বছরের কম বয়সী পুরুষরা এই শর্ত না মানলে তাদের 'পলাতক' হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তারা নাগরিকত্ব ছাড়তে পারেন না।
দ্বিতীয় পাসপোর্টের সুবিধা যে আজীবন একই থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেমন—গ্রেনাডার পাসপোর্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে 'ই-২ ইনভেস্টর' ভিসায় বসবাসের সুযোগ ছিল। এটি বেশ জনপ্রিয়ও ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে ওয়াশিংটন এই নিয়ম কঠিন করেছে। এখন এই সুবিধা পেতে হলে আবেদনকারীকে অন্তত তিন বছর গ্রেনাডায় বসবাস করতে হবে।
অধ্যাপক স্পিরো সতর্ক করে বলেন, 'মানুষ যে কৌশলে নাগরিকত্ব ব্যবহার করছে, দেশগুলো এখন তা ধরে ফেলছে এবং সে অনুযায়ী নিয়মকানুন কড়াকড়ি করছে।'
আমেরিকায় কি দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ হচ্ছে?
গত ডিসেম্বরে ওহাইওর রিপাবলিকান সিনেটর বার্নি মোরেনো 'এক্সক্লুসিভ সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট-২০২৫' নামের একটি বিলের প্রস্তাব করেছেন। কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া মোরেনো ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। তাঁর যুক্তি হলো, আমেরিকানদের আনুগত্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিই থাকতে হবে। বিলটি ঘোষণার সময় তিনি সাফ জানিয়ে দেন, 'যদি আমেরিকান হতে চান, তবে পুরোপুরি হতে হবে। অর্ধেক হওয়ার সুযোগ নেই।'
তবে আইনের অধ্যাপক পিটার স্পিরো এই প্রস্তাবকে কেবলই 'প্রতীকী' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, নানা কারণেই এই আইন পাস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উভয় রাজনৈতিক দলই এর বিরোধিতা করবে।
স্পিরো বলেন, 'খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী ও সন্তানেরও দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। তাই এই আইন কখনোই আলোর মুখ দেখবে না। আর যদি পাস হয়ও, তবে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।'
স্পিরো বলেন, মোরেনোর প্রস্তাবে মানুষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তাতেই বোঝা যায় দ্বৈত নাগরিকত্ব এখন আর যুক্তরাষ্ট্রে ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়।
এই বিল নিয়ে ইউগভ-এর এক জরিপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ৪৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার সময় অন্য দেশের নাগরিকত্ব ছাড়ার প্রয়োজন নেই। তবে ৩১ শতাংশ সিনেটর মোরেনোর পক্ষে রায় দিয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, নিজেদের স্বার্থের বেলায় মানুষের মত বদলে যায়। জরিপে ৫৬ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, তাঁরা নিজেরা যদি অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ছাড়তে বাধ্য করা ঠিক হবে না। আর ৬৫ শতাংশ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য দেশের নাগরিকত্ব পেলেও তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়বেন না।
দ্বৈত নাগরিকরা সাধারণত যে দেশে ঢুকছেন বা যে দেশ থেকে বের হচ্ছেন, সেখানকার পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। উদাহরণ হিসেবে জর্জ ক্লুনির কথা বলা যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হওয়ার সময় মার্কিন পাসপোর্ট দেখাবেন, আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢোকার সময় ফরাসি পাসপোর্ট ব্যবহার করবেন। ফেরার সময় ঠিক এর উল্টোটা করবেন।
যেসব দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্র যদি সিনেটর মোরেনোর প্রস্তাবিত আইনটি পাস করে, তবে তারা ইরান, কিউবা ও উত্তর কোরিয়ার মতো মুষ্টিমেয় কিছু দেশের কাতারে চলে যাবে—যেখানে দ্বৈত নাগরিকত্ব পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের মতো আরও ডজনখানেক দেশেও একই নিয়ম চালু আছে। মজার ব্যাপার হলো, শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় সিঙ্গাপুর শীর্ষে থাকলেও তাদের নাগরিকেরা অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট রাখতে পারেন না।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভারত ও জাপান দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। তবে ভারত একটু ছাড় দিয়ে রেখেছে। অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়া ভারতীয়দের তারা 'ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া' (ওসিআই) নামে বিশেষ সুবিধা দেয়, তবে এটি পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব নয়।
কিছু দেশ দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দিলেও জুড়ে দিয়েছে কঠিন শর্ত। যেমন স্পেনের নাগরিক হতে চাইলে আগের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়। তবে স্পেনের সাবেক উপনিবেশ, পর্তুগাল বা ফ্রান্সের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল। আবার স্প্যানিশ নাগরিকরা যদি ওপরের তালিকাভুক্ত দেশগুলো ছাড়া অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট নেন, তবে তিন বছরের মধ্যে সরকারকে না জানালে তাদের স্প্যানিশ নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়।
নেদারল্যান্ডসও দ্বৈত নাগরিকত্বকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিলে ডাচ নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
চাহিদা বাড়ছে, তবে পথ হচ্ছে কঠিন
দিন দিন দ্বৈত নাগরিকত্বের চাহিদা বাড়লেও দেশগুলো কি নিয়ম কঠিন করছে? উত্তর হলো—হ্যাঁ। নাগরিকত্ব বিশেষজ্ঞ ডমিনিক ভোলেক বলেন, 'চাহিদা থামার কোনো লক্ষণ নেই, বরং বাড়ছে। কিন্তু জোগান বা নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশগুলো এখন অনেক বেশি কঠোর।'
বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো ২০২৫ সালে তাদের নিয়মকানুন অনেক কড়াকড়ি করেছে।
২০২৫ সালে ইতালি জরুরি ডিক্রি জারি করে বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, কেবল দুই প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষ ইতালীয় হলে নাগরিকত্বের আবেদন করা যাবে। শর্ত হলো, সেই পূর্বপুরুষকে ইতালিতে জন্মাতে হবে এবং ইতালীয় নাগরিক হিসেবেই মৃত্যুবরণ করতে হবে।
এই কঠোর আইনের বিরুদ্ধে অবশ্য আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ইতালির সাংবিধানিক আদালতে আগামী মার্চে এ নিয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
ইতালির এই নতুন কড়াকড়ি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আইনজীবী আদ্রিয়ানা কোকো রুগেরি। তার ধারণা, আদালত সম্ভবত এই আইন বাতিল বা সংশোধন করবে। কারণ, জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্ব এভাবে ঢালাওভাবে বাতিল করা যায় না। ইউরোপীয় আদালতেরও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে।
রুগেরি বলেন, 'জরুরি ডিক্রির মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে পাস করা এই আইন ইতালির সংবিধানের পরিপন্থী। এটি মানুষের অর্জিত অধিকার, পারিবারিক ঐক্য এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের ওপর আঘাত।'
পর্তুগালও নাগরিকত্ব পাওয়ার লাগাম টানতে চেয়েছিল। তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব পেতে বসবাসের মেয়াদ ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু দেশটির সাংবিধানিক আদালত এতে অসাংবিধানিক উপাদান খুঁজে পাওয়ায় আইনটি সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে। একই পথে হাঁটছে সুইডেন ও পোল্যান্ড। সুইডেন বসবাসের মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর এবং পোল্যান্ড ৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর করার পরিকল্পনা করছে।
এত দিন পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিতাড়িত সেফার্ডিক ইহুদিদের বংশধরদের জন্য পর্তুগাল ও স্পেনে নাগরিকত্ব পাওয়ার সহজ পথ খোলা ছিল। কিন্তু এখন পর্তুগাল সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং স্পেনের কর্মসূচির মেয়াদও শেষ হয়েছে।
তবে স্পেনে এখনো একটি সুযোগ আছে—কেউ যদি সেফার্ডিক বংশোদ্ভূত হওয়ার প্রমাণ দিতে পারেন, তবে ১০ বছরের বদলে মাত্র ২ বছর বসবাস করেই তিনি নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন।
অন্যদিকে, নাৎসি শাসনামলে যারা নাগরিকত্ব হারিয়েছিলেন, তাদের বংশধরদের জন্য জার্মানি বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে। কিন্তু ১৯৩৮ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যেসব ইহুদি নাগরিক অধিকার হারিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, তাঁদের বংশধরদের ফিরিয়ে আনার জন্য ইতালিতে এমন কোনো বিশেষ সুযোগ রাখা হয়নি।
'গোল্ডেন পাসপোর্ট': ইউরোপে দরজা বন্ধ, ভরসা এখন ক্যারিবীয় দ্বীপ
ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ এখন টাকার বিনিময়ে নাগরিকত্ব বা তথাকথিত 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তি পরিষ্কার—নাগরিকত্ব কোনো কেনাবেচার পণ্য বা বাণিজ্যিক লেনদেন হতে পারে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর ২০২৫ সালে মাল্টা তাদের এই বিতর্কিত কর্মসূচি বাতিল করে। এর আগেই সাইপ্রাস, বুলগেরিয়া, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য একই পথে হেঁটেছিল। স্পেনও গত বছর তাদের গোল্ডেন ভিসা প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে ইউরোপে দরজা বন্ধ হলেও সুযোগ একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, ডমিনিকা, সেন্ট লুসিয়া, গ্রেনাডা এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের মতো ক্যারিবীয় দেশগুলো এখনো বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দিচ্ছে।
এই দেশগুলোর পাসপোর্ট পকেটে থাকলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেকটা অংশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করা যায়। ডমিনিক ভোলেক জানান, অনেক আমেরিকান এখন এসব দেশের পাসপোর্ট নিচ্ছেন কেবল একটি 'রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ' ট্রাভেল ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহারের জন্য।
ক্ষমতাধর বন্ধু থাকলে সবই সম্ভব!
জর্জ ক্লুনি ও তাঁর স্ত্রী আমাল ক্লুনি ভালো করেই জানেন, ওপর মহলে বন্ধু থাকলে অনেক অসম্ভবও সম্ভব হয়। ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম যখন কঠোর হচ্ছিল, তার ঠিক কয়েক দিন আগেই—২০২৫ সালের শেষ দিকে—এই দম্পতি ও তাঁদের সন্তানরা ফরাসি নাগরিকত্ব পান। কোনো পরীক্ষা বা সাধারণ নিয়ম নয়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে 'বিশিষ্ট নাগরিক' কোটায় তারা এই সম্মান পান।
একইভাবে ২০২০ সালে হলিউড অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস ও তার স্ত্রী রিটা উইলসন গ্রিসের নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। গ্রিসে তাঁদের নিজস্ব সম্পত্তি আছে এবং ২০১৮ সালে ভয়াবহ দাবানলের সময় তাঁরা দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—এই কৃতজ্ঞতা থেকেই তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।
এমন বিশেষ সুবিধায় নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ভোলেক মনে করেন, সামনে এমন ঘটনাই বেশি ঘটবে। তিনি বলেন, 'টাকার বিনিময়ে নাগরিকত্ব পাওয়ার দিন শেষ হয়ে আসছে, সেই জায়গা নিচ্ছে মেধা বা বিশেষ অবদানের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া।'
আইনের মারপ্যাঁচ আর বাস্তবের ফারাক
কাগজে-কলমে আইন এক কথা বলে, আর বাস্তবে ঘটে অন্যটা। এমন অনেক দেশ আছে যেখানে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বা আইনের ফাঁকফোকর গলে অনেকেই একাধিক পাসপোর্ট ঠিকই নিজের কাছে রেখে দেন। সব সময় যে আইন কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা হয়, তা-ও নয়।
আবার অনেক সময় সরকার সব সুযোগের কথা ফলাও করে প্রচারও করে না। ইতালির কথাই ধরুন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নির্দেশিকায় বলা ছিল, ১৯৪৮ সালের আগে জন্ম নেওয়া সন্তানদের তাদের মায়েরা নাগরিকত্ব দিতে পারবেন না। অথচ ২০০৯ সাল থেকে দেশটির আদালত বারবার এই নিয়মের উল্টো রায় দিয়ে আসছেন। অর্থাৎ, মায়ের সূত্রেও নাগরিকত্ব মিলছে।
তাই আপনার যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্কও থাকে, তবে হাল ছাড়বেন না। বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে দেখুন, হয়তো কোনো না কোনো দরজা খুলে যেতে পারে।
নাগরিকত্ব দিয়ে দেশগুলোর আসলে লাভ কী? একেক দেশের স্বার্থ একেক রকম। ইতালি চায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের বিশাল প্রবাসী গোষ্ঠীর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে। আবার স্পেন তাদের গোল্ডেন ভিসা বন্ধ করেছে আবাসন সংকট কমানোর যুক্তিতে। তবে ছোট ও ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য এটি মূলত টিকে থাকার লড়াই।
প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা ২০২৪ সালে 'ইকোনমিক অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স সিটিজেনশিপ প্রোগ্রাম' চালু করেছে। দেশটির তহবিলে ১ লাখ ৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সোয়া কোটি টাকা) অনুদান দিলেই মিলবে নাউরুর পাসপোর্ট। আর এই পাসপোর্টে হংকং, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাতসহ ৮৫টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করা সম্ভব।
ডমিনিক ভোলেক জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নাউরু প্রায় ৫ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই টাকায় তারা দ্বীপের মাঝখানের উঁচু এলাকায় মানুষকে সরিয়ে নেবে এবং জলবায়ু মোকাবিলার অবকাঠামো গড়বে। এককথায়, পাসপোর্ট বিক্রি করেই দেশটি নিজেকে বাঁচাতে চাইছে।
ইউরোপ যখন দরজা বন্ধ করছে, তখন লাতিন আমেরিকা নতুন সুযোগ নিয়ে আসছে। আর্জেন্টিনা এ বছরই ৫ লাখ ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার নতুন কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে এল সালভাদর বিটকয়েন বিনিয়োগকারীদের জন্য নাগরিকত্বের দরজা খুলে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—আর্জেন্টিনা বা এল সালভাদরের এই কর্মসূচিতে নাগরিকত্ব পেতে ওই দেশে গিয়ে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আর আর্জেন্টিনার পাসপোর্ট পকেটে থাকলে দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট 'মারকোসুর' ভুক্ত দেশগুলোতে অবাধে চলাফেরা ও ব্যবসার সুযোগ পাওয়া যাবে।
ভোলেকের মতে, সরকারগুলো এখন নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কৌশলী হচ্ছে। ঢালাওভাবে সুযোগ না দিয়ে তারা এমনভাবে কর্মসূচি সাজাচ্ছে, যাতে বিনিয়োগের টাকা সরাসরি দেশের অগ্রাধিকার খাতগুলোতে যায়।
অন্যদিকে অধ্যাপক স্পিরো দিচ্ছেন নতুন এক পরামর্শ। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের পাসপোর্টের কদর তো আছেই; তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর পরামর্শ হলো—উপসাগরীয় (গালফ) দেশগুলোর দিকে নজর রাখা।
এখন প্রশ্ন হলো—আপাতত দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা না থাকলেও কি দ্বিতীয় পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা উচিত? বিশেষজ্ঞদের উত্তর—'অবশ্যই।'
অধ্যাপক স্পিরো নিজেই এর বড় উদাহরণ। বংশসূত্রে তিনি জার্মানির নাগরিকত্ব নিয়ে রেখেছেন। নিজে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা না করলেও তাঁর ছেলে বার্লিনে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন। স্পিরো বলেন, 'সে যদি এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেকোনো দেশে কাজ করতে চায়, ওই পাসপোর্টের জোরেই তা পারবে।'
'প্ল্যান বি' এবং সময়ের গুরুত্ব
ডমিনিক ভোলেকের কাছে দ্বিতীয় পাসপোর্ট হলো 'প্ল্যান বি' বা বিপদের দিনের রক্ষাকবচ। তিনি জন্মসূত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। কিন্তু বিনিয়োগের মাধ্যমে মন্টিনিগ্রোর পাসপোর্টও নিয়ে রেখেছেন (যা ২০২৮ সালে তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক হওয়ার সুযোগ দেবে)। এর বাইরে দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসা আর সিঙ্গাপুরের রেসিডেন্সিও আছে তার পকেটে।
ভোলেক বলেন, 'খবরের দিকে তাকালেই বুঝবেন বিশ্ব পরিস্থিতি কতটা অস্থির। সহসাই এই পরিস্থিতি বদলাবে না। তাই হাতে বিকল্প থাকা জরুরি।'
ভোলেক সতর্ক করে বলেন, 'নিয়ম বদলাচ্ছে, খরচ বাড়ছে এবং প্রক্রিয়া দিন দিন আরও কঠিন হচ্ছে। তাই আপনার আর্থিক সামর্থ্য থাকুক কিংবা বংশসূত্রে সুযোগ—যেভাবেই হোক, সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগানো উচিত। শতভাগ চেষ্টা করা উচিত।'
অধ্যাপক স্পিরোও এতে একমত। ইতালির সাম্প্রতিক কড়াকড়ির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, 'ইতালির ঘটনায় একটা বিষয় পরিষ্কার—আজ আপনি যোগ্য, কিন্তু কাল হয়তো নিয়ম বদলে যাবে তখন আর সুযোগ পাবেন না। নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা পাথরে খোদাই করা কোনো চিরস্থায়ী বিষয় নয়।'
তাই তার শেষ কথা—'যা পাচ্ছেন, এখনই লুফে নিন।' উৎস: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।