আজিজুল হক, যশোর: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাটে পবিত্র ঈদুল আজহার পরবর্তী প্রথম হাটেই চামড়া নিয়ে আসতে শুরু করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তবে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এতে চলতি মৌসুমেও চামড়া বেচাকেনায় বড় ধরনের ধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন এবং বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি ঠেকাতে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় চামড়া পাচার রোধে বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
রোববার (৩১ মে) সকাল থেকেই খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা থেকে কয়েক লাখ পশুর চামড়া কেনাবেচার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা রাজারহাট মোকামে জড়ো হন। এ সময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে বাজারের হতাশাজনক চিত্র উঠে আসে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির পরপরই লবণ, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি চামড়ায় অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। অথচ ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের আশঙ্কায় চামড়া কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।
রাজারহাট চামড়ার মোকাম সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এ মোকামে চামড়া আসে। প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে কয়েক লাখ চামড়া কেনাবেচা হলেও গত কয়েক বছর ধরে বাজার অস্থিতিশীল থাকায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে চামড়া সংরক্ষণে অনীহা বাড়বে। এতে একদিকে কোরবানির চামড়ার অপচয় হবে, অন্যদিকে দেশের চামড়া শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চামড়া খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্যানারি পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা গেলে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি না থাকলে প্রতিবছরের মতো এবারও চামড়া ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম জানান, তিনি প্রায় ২০০টি গরুর এবং ১৫০টি ছাগলের চামড়া নিয়ে হাটে এসেছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। তার ভাষায়, “চামড়ার কোনো দামই উঠছে না।”
যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, সরকারের নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি হলে ব্যবসায়ীরা প্রতি চামড়ায় এক হাজার ২৫০ টাকার বেশি পেতেন। কিন্তু ট্যানারি মালিকদের কাছেই তারা সেই দামে চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না।
২৫ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শার্শার রহমত বলেন, “সরকার নির্ধারিত দামে কখনোই চামড়া কেনাবেচা হয় না। আমরা নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে না পারায় কম দামে কিনতে বাধ্য হই।”
এদিকে বাজারে ধসের কারণে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যশোরের শার্শা উপজেলা ও বেনাপোল পোর্ট থানার আওতাধীন ১০২ কিলোমিটার সীমান্তের শিকারপুর, কাশিপুর, গোগা, রুদ্রপুর, অগ্রভুলোট, পাঁচভুলোট, দাঁদখালি, পুটখালি, দৌলতপুর, সাদিপুর, রঘুনাথপুর ও ঘিবা এলাকাকে চামড়া পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিজিবি।
যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়ন বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, চামড়া পাচার ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় বিশেষ করে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাইকিং করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, কাঁচা চামড়ার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী বেচাকেনা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাজারে গিয়ে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হচ্ছে। আগামী ১৫ দিন জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রাজারহাট মোকামে নিয়মিত তদারকি করবে।
তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে সেই দামে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে না। ফলে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ী, এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।