‘আমার পেটের ডান দিকে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হলো। আমি ভেবেছিলাম হয়তো গ্যাস হয়েছে। ওষুধ খাওয়ার পরেও ব্যথা কমলো না। অবশেষে পরীক্ষা করানোর পর জানা গেল যে আমার পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে।’
অনেকেরই এরকম অভিজ্ঞতা হয়।
পিত্তথলিতে পাথর জন্মানো বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের একটি সাধারণ রোগ।
এতে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস এবং প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে সঠিকভাবে চিকিৎসা করা হয়, তবে সম্পূর্ণরূপে এর নিরাময় সম্ভব।
১. পিত্তরস কী?
যকৃতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গকে বলা হয় পিত্তথলি। এটি প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়।
এর প্রধান কাজ হলো যকৃত দ্বারা প্রতিদিন উৎপাদিত পিত্তরস সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা।
২. পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়?
পিত্তথলিতে প্রধানত তিনটি উপাদান থাকে: কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ এবং বিলিরুবিন।
যখন এই তিনটি উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্ফটিকগুলোই বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।
পিত্তথলিতে পাথর তৈরির কারণসমূহ: পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকা; পিত্তথলির সম্পূর্ণরূপে খালি হতে না পারা; অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদন; পিত্তথলির সংক্রমণ বা প্রদাহ।
৩. পিত্তথলির পাথর কত প্রকারের হয়?
কোলেস্টেরল পাথর
এই ধরনের পাথরই সব থেকে বেশি হয়, ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের পাথরই তৈরি হয়।
পিগমেন্ট পাথর
বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে এগুলো তৈরি হয়। সাধারণত যকৃতের রোগ বা রক্ত-সম্পর্কিত কিছু নির্দিষ্ট অসুস্থতার কারণে এগুলো দেখা দেয়।
৫. অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলো কী কী?
ভারতে পিত্তপাথর একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। আনুমানিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার পিত্তপাথর সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই সমস্যাটি দুই থেকে তিন গুণ বেশি দেখা যায় এবং ৪০ বছর বয়সের পর এর ঝুঁকি বাড়ে।
তরুণদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যায়, যার প্রধান কারণগুলো হলো ক্রমবর্ধমান স্থূলতা, ব্যায়ামের অভাব এবং অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণ।
৬. পিত্তথলির পাথর হওয়ার লক্ষণগুলো কী কী?
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এই সমস্যাটি আলট্রাসাউন্ড করার সময় আকস্মিকভাবে ধরা পড়ে।
লক্ষণ কখন দেখা দেয়?
বিপজ্জনক লক্ষণগুলি কী কী?
নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই হাসপাতালে যাওয়া উচিত:
৭. পিত্তথলির পাথর কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট: এটি একটি খুব সহজ, স্বল্প খরচের এবং অত্যন্ত নির্ভুল পরীক্ষা।
রক্ত পরীক্ষা: সিবিসি, লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম বিলিরুবিন এবং লিভার এনজাইম পরীক্ষা করা হয়।
এমআরসিপি এবং সিটি স্ক্যান: পিত্তনালীতে পাথর রয়েছে এমন সন্দেহ হলে সিটি স্ক্যান বা এমআরসিপি করা হয়।
ইআরসিপি: এটি শুধু পাথর শনাক্ত করতেই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা অপসারণ করতেও ব্যবহৃত হয়।
৮. পিত্তথলিতে পাথরের চিকিৎসা কী?
পিত্তথলিতে পাথর থাকা সত্ত্বেও যাদের কোনো উপসর্গ থাকে না, তাদের বেশিরভাগেরই কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
ডাক্তারের পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। যদি উপসর্গ দেখা দেয় এবং বারবার ব্যথা অনুভূত হয়, তবে অস্ত্রোপচার একটি ভালো বিকল্প।
ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি – এটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আদর্শ চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়।
ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা:
৯. কখন জরুরিভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন?
ওষুধ কি পিত্তপাথর গলাতে পারে?
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু তা সবার জন্য কার্যকর নয়।
ছোট কোলেস্টেরল পাথরের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের জন্য ওষুধ সহায়ক হতে পারে।
চিকিৎসায় কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছরও লাগতে পারে, কিন্তু পুনরায় পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই, অস্ত্রোপচারকে একটি স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১০. পিত্তথলি অপসারণ কি বিপজ্জনক?
অনেকেই এই বিষয়টিতে ভয় পান।
পিত্তথলি অপসারণের পরেও যকৃত পিত্তরস উৎপাদন করতে থাকে, যা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যায়, তাই অনেকেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
১১. চিকিৎসায় বিলম্ব হলে কী হয়?
এ ছাড়াও পিত্তথলির ক্যানসার হওয়ার একটি বিরল ঝুঁকি থাকে
১২. পিত্তথলিতে পাথর হওয়া আটকানো যায় কি?
যদিও শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়, তবে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে।
পিত্তপাথর সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা
১৪. কখন আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত?
যদি আপনি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনোটি অনুভব করেন, তাহলে আপনার অবিলম্বে হাসপাতালে যাওয়া উচিত:
যদিও আজকাল পিত্তথলির পাথর একটি সাধারণ সমস্যা, তবুও এটিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ দেখা যায় না, কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস এবং অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।
একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর শারীরিক ওজন এবং নিয়মিত ব্যায়াম এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
যদি আপনার পেটের উপরের ডানদিকে বারবার ব্যথা হয়, তবে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং একটি আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান করানোই শ্রেয়।
এই সমস্যার সবচেয়ে নিরাপদ, কার্যকর এবং স্থায়ী চিকিৎসা হলো আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি।
সময়মতো রোগ নির্ণয়, যথাযথ চিকিৎসা এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হলো পিত্তপাথর প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
সূত্র: যুগান্তর