শাহীন খন্দকার: রাজধানী মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। দেশের একমাত্র সরকারি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র, প্রতিদিন দেশের বিভাগীয় শহর-জেলা-উপজেলা থেকে ক্যান্সাররোগী চিকিৎসার আশায় ভিড় জমাচ্ছেন এই বিশেষশায়িত হাসপাতালে।
অন্যদিকে হাসপাতালটিতে রোগীর চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শয্যা নেই, নেই যন্ত্রপাতি। বছরের পর বছর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়ে আছে, সব মিলিয়ে রোগীরা কেবল লড়াই করছেন উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার জন্য এই হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসা পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে ।
বাংলাদেশে একমাত্র সরকারি জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক বললেন পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোমÍফা আজিজ সুমন জানালেন, হাসপাতালটিতে রোগীদের সাশ্রয়ী মুল্যে ক্যান্সার নির্ণয়, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং সার্জারি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় বিশিষ্ট ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা।
দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল হওয়ায় রোগীরা এখানে আসেন। প্রতিদিন রোগী আসছে এক হাজার থেকে ১২শত। এই ১২শত রোগীকে আউটডোর ইনডোর ডে-কেয়ার কেমোথেরাপীসহ বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শয্যা রয়েছে পাঁচশতটি।
তিনি বলেন, রেডিওশন থেরাপির ব্যাবস্থা খুবই সীমিত। বাংলাদেশে বর্তমানে রেডিওশন থেরাপি-ই ক্যান্সার রোগীদের জন্য বিশেষ ডিমান্ড রয়েছে। সেখানে মাত্র দুটি মেশিন চালু আছে। দুটি মেশিন দিয়ে ডে-সহ নাইট শিফট চালু করার পরেও বর্তমানে সেবা দিতে পারছি মাসে ২৫০ জন রোগীর।
পরিচালক বলেন, ইতিমধ্যে একটি তথ্য ডেটা করা হয়েছে বর্তমানে কতজন রোগী চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন, সেই তথ্যে দেখাগেছে চারহাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন। এখান থেকেই প্রতি মাসে ২৫০ জন রোগীকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। কঠিন এক বাস্তবতার মধ্যদিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
আজকে যে রোগী আসছেন, সেই রোগীকে আমরা আগামী বছর অক্টোবরে চিকিৎসাসেবা দিতে পারবো। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সীমাবদ্ধতা থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে মেশিন স্বল্পতা। বিশেষষায়িত এই হাসপাতালে ৭টি মেশিন বসানোর মতো ব্যাংকার রয়েছে। বর্তমানে দুটি মেশিন চলছে।
ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, খুবই দ্রুত আরো ৫টি মেশিন বসালে হয়তো চলমান যে সংকট রয়েছে কাটিয়ে উঠতে পারবোনা। কারণ রেডিও থেরাপি অন্য মেশিনের মতো না।
এই মেশিন বসাতে অত্যাধুনিক ব্যাংকার লাগে, তাই সরকার চাইলেই রাতারাতি ব্যাংকার তৈরি করে মেশিন বসাতে পারবেন না। তবে হাসপাতালে ৭টি ব্যাংকার রয়েছে, তার মধ্যে দুটি মেশিন অকেজো হয়ে গেছে সেই মেশিন দুটো সরিয়ে ফেলানো হয়েছে।
বর্তমানে দুটি মেশিন চালু এবং তিনটি ব্যাংকার খালি রয়েছে। চলতি অর্থ বছরেই তিনটি মেশিন এর মধ্যে আসবে ১টি মেশিন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আগামী অর্থবছরে বাকি দুটি আসার সম্ভবনার কথা জানিয়েছেন।
ডা. সুমন বলেন, ক্যান্সার রোগটি অত্যান্ত ব্যায়বহুল চিকিৎসা। এই ৫শত শয্যার হাসপাতাল এখন সারা বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীদের জন্য আশ্রয়ের জায়গা। তাই ক্যান্সারের রোগীরা সারাদেশ থেকে এখানে আসছেন চিকিৎসার জন্য। ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওশন থেরাপি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যযে কোন হাসপাতালে দেখবেন সার্জারি সুবিধা রয়েছে, ক্যামোথেরাপি সুবিধা রয়েছে কিন্ত রেডিওশন সুবিধা বাংলাদেশে সরকারী ব্যাবস্থাপনায় খুবই সীমিত সুযোগ রয়েছে।
পরিচালক বলেন, দুটি মেশিন দিয়ে ২৫০ জন রোগীকে সেবা দিতে ৬ সপ্তাহ লাগছে দুই শিফটে এক রাতে দুই দিনে দেওয়া হচ্ছে মেশিন স্বল্পতার জন্য। ডাঃ মোস্তফা আজিজ আরও বলেন, ৫০০ শয্যা যদি আপনি ভাগ করে দেন তাহলে রেডিওলেশন থেরাপির মেশিন মাত্র ৬০টি, হেমাটোলজিষ্ট থেরাপির শয্যা ৪০টি, সার্জারি বিভাগে শয্যা রয়েছে ৪০ টি বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করে দিলে এই স্বল্প সংখ্যক শয্যা দিয়ে সারাদেশের সেবা দেওয়া সম্ভব না। তিনি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে দ্রুত এই ৫০০-১২০০ শয্যার দাবি করেন পরিচালক। তিনি আরও বলেন ইতিমধ্যে জনবলের জন্য মন্ত্রনালয়ে চিঠি প্রেরন করা হয়েছে। ঔষধ প্রসঙ্গে বলেন, রোগীকে দিতে পারছিনা। তাই রোগীর জন্য ঔষধ বরাদ্দের জন্যও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে বহির্বিভাগে ৮০০-এর বেশি রোগী সেবা নেন, যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীর প্রচন্ড চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে হাসপাতালটি ঘুরে চিকিৎসা সেবার নানামুখী অপ্রতুলতা দেখা যায়। হাসপাতালের রেডিওথেরাপি ডিপার্টমেন্টে গিয়ে দেখা যায় সকাল থেকে রেডিওথেরাপির জন্য আসা দেড় থেকে দুইশ রোগী অপেক্ষা করছেন। কেউ মেঝেতে শুয়ে আছেন, কেউ ব্যথায় অস্থির হয়ে বসে আছেন। কিন্তু সেবা পাচ্ছেন না। দু-একজন কোনোরকমে ‘ম্যানেজ’ করছেন। সেবা না পেয়ে কেউ কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালটিতে সব মিলিয়ে আটটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র ছিল। এর মধ্যে চারটি বহুদিন ধরে অকেজো, আর দুটি যন্ত্র মেরামত-অযোগ্য। বর্তমানে মাত্র দুটি যন্ত্রে কোনোরকমে সেবা চলছে। টাঙ্গাইল, রংপুর, সিরাজগঞ্জ থেকে আসা রোগীদেও মধ্যে কেউ জানালেন, দ্বিতীয়বার টিউমার ধরা পড়েছে, কেউ বলছেন ব্রেষ্টক্যান্সার, প্রথমবার দীর্ঘ চিকিৎসা ও অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ ছিলেন।
এবার ব্যথা এমন যে কোমর থেকে পা পর্যন্ত পুরো একটি পাশ অবশ হয়ে গেছে। রোগীরা বলেন, ডাক্তার বলেছেন ১৪ দিন পরপর কেমোথেরাপি দিতে হবে। কিন্তু এই হাসপাতালে ভর্তি হতেই নাকি এক মাস লাগে। যদি ভর্তিতেই এত সময় লাগে, তাহলে কিভাবে সময়মতো চিকিৎসা পাব?
রোগী ভর্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অইচ্ছু কর্মকর্তা বলেন, আপনি যদি পাশের বক্ষব্যাধী হাসপাতালে একটি সার্জারি রোগী ভর্তি করাতে চান, তাহলে আপনাকে মিনিমাম ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। ক্যান্সার হাসপাতাল তো গোটা বাংলাদেশে একটা বিশেষশায়িত হাসপাতাল। সারা বাংলাদেশ থেকে ক্যান্সার রোগী আসছে! তাদের জন্য একমাত্র স্পেশালাইজড ক্যান্সার হাসপাতাল এটি।
তিনি বলেন, একসময় প্রতিদিন ৬০০ রোগী রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রপাতির স্বল্পতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের সবশেষ ৬টি রেডিওথেরাপি মেশিন ছিল, যেগুলো দিয়ে দৈনিক ৬০০ রোগীকে থেরাপি দেওয়া হতো। শেষ যে মেশিনটি নষ্ট হয়েছে, সেটি ২০০৯ সালের। সেই মেশিনটি ২০২৪ সালের শেষের দিকে নষ্ট হয়েছে। এরপর দীর্ঘদিন রেডিওথেরাপি বন্ধ ছিল। ৫ আগস্টের পর নতুন ডিরেক্টর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি করে দুটি মেশিন চালু করার ব্যবস্থা করেছেন এবং আরেকটি মেশিন ক্রয়ের অনুমোদন এনেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগী প্রায় দ্বিগুণ হবে। সেই হিসেবে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য-দেশে অন্তত ১৮০টি সেন্টার থাকা প্রয়োজন।
কিন্তু বর্তমানে সেন্টার আছে ২৪টি, এর মধ্যে সরকারি মাত্র ১২টি। সরকারি সেন্টারগুলোর মধ্যে পাঁচটিতে দীর্ঘদিন ধরে রেডিওথেরাপি মেশিন অচল হয়ে আছে।