কুয়াশার মায়াবী আড়মোড়া ভেঙে পুব আকাশে যখন শীতের সূর্য সোনা রোদ উঁকি দেয়, তখন চরাচরের রূপ বদলে যায় নিমেষে। হিমেল হাওয়ার মৃদু ঝাপটায় ফসলের মাঠ যেন সবুজাভ-হলুদ ঢেউয়ে মেতে ওঠে। দুপাশে অবারিত সরিষাখেত, মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে মেঠো পথ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ধরিত্রী বুঝি তার অঙ্গে হলুদ রঙের এক বিশাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। তবে প্রকৃতির এই অনন্য ক্যানভাস দেখতে এখন পর্যটকের ভিড় বাড়ছে মানিকগঞ্জে। যেন কোনো নিপুণ শিল্পী পরম মমতায় মাটির বুকে ঢেলে দিয়েছেন কাঁচা হলুদের মায়া।
প্রকৃতির এক অনন্য ‘হলুদ সাম্রাজ্য’ রাজধানী ঢাকার একদম কোলঘেঁষেই কৃষিপ্রধান জেলা মানিকগঞ্জ। বর্তমানে এই জেলার প্রতিটি উপজেলা—ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর, সাটুরিয়া, সিংগাইর কিংবা শিবালয় সেজেছে নববধূর সাজে। সরিষা ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ আর মৌমাছিদের গুনগুন গুঞ্জনে মুখর চারপাশ।
ঘুরতে গিয়ে যা পাবেন
মানিকগঞ্জের সরিষাখেত আপনাকে শুধু চোখের আরাম দেবে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবহমান গ্রামবাংলার প্রাণের স্পন্দন। মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আপনি যখন হলুদের মায়ায় ডুব দেবেন, তখন বাড়তি পাওনা হিসেবে তা আপনার ঝুলিতে জমা পড়বে।
গাছ থেকে নামানো টাটকা রস: শীতের ভোরে গাছি যখন গাছ থেকে হাঁড়ি নামিয়ে আনেন, সেই টাটকা খেজুর রসে চুমুক দেওয়া এক আনন্দদায়ক অনুভূতি।
নদী ও প্রকৃতির সান্নিধ্য: দুপুরে ধলেশ্বরী কিংবা কালীগঙ্গার স্বচ্ছ শীতল জলে একটু ঝাঁপাঝাঁপি অথবা নৌকায় ঘুরে বেড়ানো যাবে। এতে আপনার শরীর-মন পুরোপুরি সতেজ হবে।
মধু সংগ্রহের দৃশ্য: অনেক খেতের পাশে দেখা মিলবে সারিবদ্ধ মৌ চাষের বাক্স। মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের ব্যস্ততা দেখার অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে।
শীতের পিঠাপুলি: মানিকগঞ্জের প্রায় প্রতিটি বাজার ও বাসস্ট্যান্ডে দেখা মিলবে ধোঁয়া ওঠা চিতই আর ভাপা পিঠার। ঝাল ঝাল নানা পদের ভর্তা আর গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ আপনার রসনাবিলাস পূর্ণ করে দেবে।
কোথায় যাবেন
মানিকগঞ্জের প্রতিটি প্রান্তই এই সময়ে দেখার মতো সুন্দর। তবে বিশেষ বিশেষ কিছু জায়গা আপনার ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করতে পারে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক-সংলগ্ন: ঢাকার গাবতলী থেকে বাসে চড়ে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে বানিয়াজুরী, মহাদেবপুর কিংবা ঘিওর এলাকায় নামলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে হলুদের স্বর্গ।
ঘিওরের রাথুরা চক: বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ডের কাছে বিশাল এই চকে যেন রঙের মেলা বসেছে। এখানে পাওয়া যায় স্থানীয় গাভির খাঁটি দুধ-চা আর জিবে জল আনা মুখরোচক বিভিন্ন খাবার।
সিংগাইর ও ঝিটকা: হেমায়েতপুর থেকে ধল্লা হয়ে সিংগাইর, চারিগ্রাম কিংবা ঝিটকার পথে মাঠের পর মাঠ সরিষাখেত আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
সাটুরিয়া: এখানে সরিষার অবারিত সৌন্দর্যের পাশাপাশি আপনি দেখে নিতে পারেন ঐতিহাসিক বালিহাটি জমিদারবাড়ি।
যাতায়াত
নিজস্ব গাড়ি বা মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে সুবিধা হলো, ইচ্ছেমতো যেকোনো নয়নাভিরাম স্পটে আপনি থামতে পারবেন। এ ছাড়া ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি বাসে চড়ে অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারেন মানিকগঞ্জে। এরপর বাস কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা অথবা ব্যাটারিচালিত অটোতে করে জেলার বিভিন্ন স্পটে যেতে পারবেন। সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।
সতর্কতা
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে কোনোভাবেই যেন কৃষকের ফসলের ক্ষতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, আপনার একমুহূর্তের অসতর্কতা একজন কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম নষ্ট করে দিতে পারে। কোনোভাবেই সরিষাগাছের ওপর হাঁটা কিংবা ফুল ছেঁড়া উচিত নয়।
সূত্র: আজকের পত্রিকা