বিশেষ প্রতিবেদক: দেশের হাওর জলাভূমির অস্তিত্ব রক্ষায় এবার নতুন করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন অন্তঃবর্তীকালীন সরকার। সারা দেশে থাকা হাওর-জলাভূমি অবৈধ দখল, ভরাট কিংবা পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথে বাধা সৃষ্টি করলে অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পাবলিক রিলেশন্স অফিসার) ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
অধ্যাদেশে অপরাধের ধরণ অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জারিকৃত ‘সুরক্ষা আদেশ’ লঙ্ঘন, হাওর-জলাভূমি, হাওরের কান্দার অবৈধ দখল, ভরাটকরণ, অননুমোদিত খনন কিংবা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে এমন অবকাঠামো নির্মাণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশে এসব অপরাধকে ‘আমলযোগ্য’ ও ‘অ-জামিনযোগ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, হাওর জলাভূমি এলাকা থেকে অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন, মাটি, বালু বা পাথর আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া পরিযায়ী পাখি শিকার, সংরক্ষিত জলজ প্রাণী শিকার, জলাবন বিনষ্ট করা এবং বিষটোপ বা কারেন্ট জাল, নিষিদ্ধ উপকরণ কিরণমালা ছাই দিয়ে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
একই সঙ্গে অধ্যাদেশের মাধ্যমে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই গঠিত ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরকে’ ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এখন থেকে হাওর ও জলাভূমি সংশ্লিষ্ট এলাকায় যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে এই অধিদপ্তরের মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অধিদপ্তর নিশ্চিত করবে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের ফলে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জনসাধারণের জীবিকার কোনো ক্ষতি হবে কিনা।
একই অধ্যাদেশে সরকার চাইলে বিশেষ কোনো হাওর বা জলাভূমিকে ‘সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারবেন। সংরক্ষিত এলাকার পানির প্রবাহ ও জীববৈচিত্রের জন্য ক্ষতিকর কোনো স্থাপনা থাকলে অধিদপ্তর তা অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে পারবে। সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের অংশ হিসেবে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি অবিলম্বে সারাদেশে কার্যকর হবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার পরিবেশ ও মানবাধিকার উন্নয়নকর্মী সারোয়ার জাহান হাওর জলাভুমি রক্ষায় অন্তঃবর্তীকালীন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ ও নতুন অধ্যাদেশ জারির বিষয়টিকে ইতিবাচক আখ্যা গিয়ে বলেন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর-মধ্যনগর এলাকা অধ্যুষিত মাদার ফিসারিজ অব টাঙ্গুয়ার হাওর, সীমান্তনদী জাদুকাটা অবৈধভাবে সেইভ, ড্রেজার, নদীর তীর কেটে স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথরোধ করে অবৈধভাবে খনিজ বালি পাথর লুট, চুরি বন্ধে, তাহিরপুরের বাদাঘাট বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভান্ডার খাল বা ভাঙ্গার খাল দখলদারদেও কবর থেকে পুনরুদ্ধার করা এমনকি ওই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খাল-নদী জলাশয়, জলাভুমি ভরাটে জড়িতদের ব্যাপারে নতুন জারিকৃত অধ্যাদেশ অনুযায়ী আইন প্রয়োগ করা হলে বিপন্ন হওয়া হাওর জলাভূমি, খাল, নদীগুলোর পরিবেশ আবারও স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
গ্রীণ বাংলাদেশ বিডির সমন্বয়ক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হাওরের রাজধানী সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর অন্তর্ভুক্ত সংসার জলমহাল বা জলাভুমি, পাটলাই নদীর তীরের আশে পাশে ঘিরে উচ্চ আদালতে ভুল তথ্য দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গেল ১৭ বছর ধরেই কমপক্ষে ৫টি পাথর ভাঙ্গার ক্রাশার মেশিনে দিবারাত্রী পাথর ভাঙা, বিক্রির অবাধ বাণিজ্য, জাদুকাটা, রক্তির নদীর তীর দখল, বালি-পাথর অবৈধভাবে ডাম্পিং, সারি সারি পাথর ভাঙার মেশিনে শব্দ দূষণ, নদী দূষণের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে আসলেও হাওর-নদীর প্রতিবেশ-পরিবেশ, অতিথি পাখিদের নিরাপদ বিচরণ, মা মাছের প্রজনন, শব্দ দূষণ, আশেপাশের বসতিরগুলোর মানুষজনের, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নানা প্রকার রোগ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নজর এড়িয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন, তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যরা।