শিরোনাম
◈ সাগর খালি, ঘাট নীরব: কক্সবাজারে সামুদ্রিক মাছের সংকট ◈ প‌রিচালক নাজমুল বি‌সি‌বি থে‌কে পদত‌্যাগ না করা পর্যন্ত  মাঠে নামবেন না ক্রিকেটাররা: সংবাদ স‌ম্মেল‌নে কোয়াব সভাপ‌তি ◈ সাফ ফুটসাল চ‌্যা‌ম্পিয়ন‌শি‌পে বাংলা‌দে‌শের কা‌ছে পাত্তাই পে‌লো না ভারত ◈ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনায় তাড়াহুড়ো কেন, প্রশ্ন সিপিডির  ◈ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিপিএল স্থগিত করলো বিসিবি ◈ ইসলামী আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা, ৫০ আসন ফাঁকা রেখেই সমঝোতা ১০ দলের! ◈ বিপিএলের ম্যাচ দেখতে না পারায় মিরপুর স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষুব্ধ জনতার ভাংচুর (ভিডিও) ◈ দাবি আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধের প্রবণতা, দায় কার? ◈ রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিয়োগপ্রত্যাশী শিক্ষকদের কথা শুনলেন তারেক রহমান ◈ শহীদ হাদি হত্যা মামলায় নতুন মোড়, পুনঃতদন্তের নির্দেশ

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৫৮ বিকাল
আপডেট : ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

হাকালুকির বুকে হিজল বন

‘পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;

পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;...’

কোনো এক হিজলের বনে মুগ্ধ হয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। লিখেছিলেন কবিতার এই লাইন। এমনই এক ঘুঘু-ডাকা হিজলের বন দাঁড়িয়ে আছে হাকালুকি হাওরের বুকে। ভাই-বন্ধুরা মিলে শীতের রাতে আড্ডা দিতে দিতে ঠিক হলো, সবাই মিলে হিজল বন দেখতে যাব। এর নৈসর্গিক রূপ উপভোগ করতে হলে যেতে হবে ভোরেই। সে অনুযায়ী ভোর ঠিক ছয়টায় উঠে পড়লাম আমরা। মোটরবাইকে চড়ে রওনা দিলাম হাওরের দিকে।

আমাদের মতো অনেকে হাকালুকি হাওরের বিস্তৃত সবুজ মাঠে বিশাল হিজল বন দেখতে আসেন প্রায়ই। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর অংশে তিনটি হিজল বন রয়েছে। এটিকে কেউ বলেন মিনি কক্সবাজার, কেউ বলেন লোকাল সুন্দরবন।

পৌষের কাকডাকা ভোর। আমরা ছুটছিলাম হাকালুকি হাওরের বুকে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল বনের দিকে। কুয়াশা মাড়িয়ে, মেঠো পথ বেয়ে ধীরে ধীরে। এঁকেছিলাম প্রকৃতির শান্ত, বিষণ্ন আর প্রেমময় এক ভোরের চিত্র। হাকালুকি হাওরের খুব কম অংশ পড়েছে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায়। তবে প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্ষুদ্র অংশ। যেতে যেতে পথে সেই সৌন্দর্যটুকু মূর্ত হয়ে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে।

নরম রোদের আবছা আলোয় ঝলমল করছে শিশিরভেজা ঘাস। যেন ‘সব রূপ লেগে আছে ঘাসে’। পা মাড়াতেই এক শীতল অনুভূতি দূর করে দেয় সকল পরিশ্রান্তি। ভোরের আলো ফুটতে শুরু হয়েছে পাখির কিচিরমিচির। অতিথি পাখিদের খুব একটা দেখা না মিললেও খাবারের খোঁজে নেমে পড়েছে সাদা বক আর গাঙচিল। একটু পরপরই দেখা মিলছে হাওরের চরে ঘুরে বেড়ানো হাঁসের ঝাঁক। প্রায় জল শুকিয়ে যাওয়া খালে মাছ ধরছেন জেলেরা। পাড়ে অপেক্ষায় বসে আছেন মাছের ব্যাপারীরা। কেউ কেউ চাঙ্গা (মাছ রাখার ঝুড়িবিশেষ) নিয়ে ছুটছেন গন্তব্যে। জলমহালগুলোতে মাছেরা কাটিয়ে উঠেছে শীতঘুম। কৃষকেরা জমিগুলোতে রোপণ করছেন বোরো ধান।

শ্যালো মেশিনের ঘটঘট শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে হাওরের বনে। তার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা নদীর মতো অসংখ্য ছোট-বড় খাল। খালের স্বচ্ছ জলে খেলা করছিল ভোরের রাঙা আলো। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাখালেরা গরুর পাল নিয়ে ছুটছে হাওরের দিকে। একের পর এক গরুর পাল মাঠে নামছে। রুনুঝুনু শব্দে বাজছে বাছুরদের গলায় বাঁধা ঘণ্টা। মাঠ সরব হয়ে উঠছে রাখালিয়া শব্দের কোলাহলে। মহিরুহ হিজল, দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। যেন এক একটা বিস্ময় বৃক্ষ অদ্ভুত ছাতা মেলে ধরেছে হাওরের আকাশে। আর তার ঘনবিন্যস্ত শিকড় জাল ছড়িয়ে রেখেছে বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে।

পাশের বনে ভিড় জমিয়েছে একঝাঁক ফিঙে। কিচিরমিচির শুনে কাছে যেতেই বনের ভেতর লুকিয়ে পড়ল সব। কবিতার মতোই যেন, ‘আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর’। তাদের বিরক্ত না করে উঠে পড়লাম ওয়াচ টাওয়ারে। সেখান থেকে হাওরের আসল রূপ চোখে পড়ে। প্রথম দর্শনে এক টুকরো সুন্দরবন ভেবে বসলে তেমন ভুল হবে না আশা করি।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কৃষ্ণপদ দেবনাথ জানান, হাকালুকি হাওর প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরের একটি বিশাল জলাভূমি। এখানে হিজলগাছগুলো সাধারণত ছোট ছোট ক্লাস্টার কিংবা সারিবদ্ধভাবে কান্দাগুলোতে (উঁচু ভিটা) অবস্থান করে। বছরের পর বছর গাছ নিধন এবং হাওর সংকুচিত হওয়ায় এই বনের পরিমাণ অনেকটা কমে গেছে। বিগত বছরগুলোতে সরকার এবং সিবিএ প্রকল্পের মাধ্যমে হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন কান্দা কিংবা উঁচু জায়গায় কয়েক লাখ হিজল ও করচের চারা রোপণ করা হয়েছে। বছরখানেক আগে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে রোপণ করা হয়েছে আরও ৮০০ চারা। হিজল বন মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এ বন অতিথি পাখিদের আশ্রয়স্থল।

হিজল একটি দীর্ঘজীবী ও মাঝারি আকারের চিরহরিৎ গাছ। এটি জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। এটি গ্রীষ্ম ও বর্ষা—উভয় মৌসুমে জীবন ধারণ করতে পারে। বর্ষায় হিজল বাঁচে অর্ধডুবন্ত অবস্থায় প্রবল প্রাণশক্তি নিয়ে। হয়ে ওঠে অনন্য রূপসী। শুকনো মৌসুমেও কচি পাতার সবুজে আচ্ছন্ন করে রাখে চারপাশ। রূপ আর লাবণ্যে মন কাড়ে। সমাদৃত হয় গল্পে, কাব্যে। এমনই হিজল-বট তমালের নীল ছায়ায় বাংলার মুখ দেখেছিলেন জীবনানন্দ। আর কবি নজরুল প্রিয়ার চরণ রাঙাতে চেয়েছিলেন হিজল বিছানো বনের পথে।

এই শীতে আপনি চাইলেই ঘুরে আসতে পারেন হাকালুকির হিজল বন। ভ্রমণ ডায়েরিতে যুক্ত করতে পারেন একটি দারুণ দিনের আনন্দলিপি।

যেভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে হিজল বন দেখতে যেতে পারেন। এ জন্য প্রথমে সিলেট শহরে যেতে হবে। সেখান থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদর। সেখান থেকে ঘিলাছড়া ইউনিয়ন। বর্ষাকালে নৌকা কিংবা ট্রলার ভাড়া করে হাকালুকি হাওরের মাঝে অবস্থিত হিজল বন এবং ওয়াচ টাওয়ারে যাওয়া যায়। শীতকালে হেঁটে অথবা বাইক ভাড়া করেও পৌঁছানো যায়। সূত্র: আজকের পত্রিকা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়