টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকায় পর অবশেষে গেরুয়া শিবিরের কাছে ভরাডুবি হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃনমূল কংগ্রেসের। মোদি সরকারের দীর্ঘদিনের অভিলাষ—হিন্দুত্ববাদ এবার কলকাতার মাটিতেও ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু জায়গায় দেখা গিয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর কট্টরপন্থীদের আক্রমণের ভয়াবহ চিত্র। সূত্র: ইনকিলাব প্রতিবেদন
রাজনৈতিক বাঁক বদলের পর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে টালিউড তারকাদের আকস্মিক পরিবর্তিত রূপ। এ যেন সেই গানের মত, 'সম্পর্ক বদলে গেল একটি পলকে'। যেসব তারকারা এতবছর মমতা সরকারের থেকে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে, সরকার পতনের কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোপুরি ভোল পাল্টে ফেলেছেন তারা।
একসময় যেসব টালিউড তারকা গেরুয়া শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা কি এখন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত? দল সুযোগ দিলে কি তাদের ঘরে ফেরা শুধু সময়ের অপেক্ষা? এমন প্রশ্নই করা হয়েছিল অভিনেত্রী পার্নো মিত্র, তনুশ্রী চক্রবর্তী, কাঞ্চনা মৈত্র, অনিন্দ্যপুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রূপা ভট্টাচার্যকে।
এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি অভিনেত্রী পার্নো মিত্র। সূদুর আটলান্টা থেকে তনুশ্রী চক্রবর্তী বলেন, দলের সঙ্গে আমার কোনও দিন বিরোধ হয়নি। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময়ের অত্যাচারের পর বিজেপি ক্ষমতায় আসায় এবার বাংলার মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন।
কাঞ্চনা মৈত্রের দাবি, তৃণমূল না করায় টালিউডে তাঁকে কার্যত কোণঠাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, কাজ পাচ্ছিলাম না। অথচ সংসার চালাতে হবে, বাড়িতে বৃদ্ধা মা রয়েছেন। সেই কারণেই দল ছাড়তে হয়েছিল।
রূপা ভট্টাচার্য জানান, যে কারণের জন্য বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলাম, সেই কারণটাই তো এখন আর নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল ক্ষমতা থেকে সরে গিয়েছেন। তাহলে আবার রাজনীতিতে ফিরব কেন? তাই আপাতত রাজনীতি থেকে দূরেই থাকতে চান তিনি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় টলিউডের একঝাঁক তারকাদের। শনিবার (৯ মে) সকালে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত হয় এই অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবীণ অভিনেত্রী মমতাশঙ্কর নতুন সরকারের যাত্রাকে ‘নতুন স্বাধীনতা’র সাথে তুলনা করেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সাদা পাঞ্জাবিতে উপস্থিত হয়েছিলেন অভিনেতা জিৎ।
এছাড়াও প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, যীশু সেনগুপ্ত, মমতাশঙ্কর, পন্ডিত অজয় চক্রবর্তী ও তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদারের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে এই সকলে তারকাদের দেখা গেছে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে। বিজেপির জয়ের পর তাঁদের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিতি রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমনকি অভিনেতা ঋষি কৌশিক জানান, সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও তিনি আদর্শগতভাবে নতুন সরকারের সমর্থক।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় অভিনেতা জিৎ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, "এই জিৎ, এই বিজয়, ভারতীয় জনতা পার্টির জন্য এক অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে এসেছে। এটা শুধু একটি রাজনৈতিক জয় নয়, মানুষের প্রতি এক বড় অঙ্গীকার।
পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি ভূমি, যা সম্পদ, প্রতিভা, সংস্কৃতি এবং অসংখ্য মানুষের অবদানে সমৃদ্ধ। এই মাটির মানুষ তাঁদের মেধা, পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশকে বহু কিছু দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই বাংলার গৌরব, অস্মিতা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার ঐতিহ্যকে যেভাবে মানুষের চোখে, দেশের চোখে এবং বিশ্বের চোখে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই বেদনাদায়ক।
আজ আমি আশা করি, ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার বাংলার জন্য এক নতুন সকাল, এক নতুন আলোর দিশা নিয়ে আসবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীজি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন "মোদীর গ্যারান্টি” – সেই কথার ওপর আজ কোটি কোটি মানুষের আশা ও বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে। আমি আশা করি, ভারতের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ পশ্চিমবঙ্গ, আমাদের প্রিয় বাংলা, আবারও “সোনার বাংলা” হয়ে উঠবে এবং তার হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধার করবে।"
টালিউডের রোমাঞ্চ রানী অভিনেত্রী শ্রাবন্তী। বিধানসভা নির্বাচনে তাকে দেখা যায় তৃনমূলের প্রচারণায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকেই কি প্রচারে গিয়েছিলেন? এ বিষয়ে নায়িকার স্পষ্ট বক্তব্য, ‘আমি একজন শিল্পী। আর একজন শিল্পী হিসাবেই গিয়েছিলাম প্রচারে। শিল্পীদের ওপর অনেক চাপ থাকে। আমি ছাড়াও অনেকেই দিদির আহ্বানে প্রচারে গিয়েছিলেন। আমি তো নগণ্য। আজকে এত কুৎসা হচ্ছে, শিল্পীদের নিয়ে এত কথা এত ট্রোলিং চলছে, কী বলব! শিল্পীরা কীভাবে চলেন, এসব বলার আগে সাধারণ মানুষ কি একবারও ভাবেন? আমাদের ওপরেও তো চাপ থাকে।’
এছাড়া নিজ দলের পরাজয়ের পর টালিউডে ব্যান সংস্কৃতি নিয়ে তারকা অভিনেতা দেব বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রিতে আর কেউ কাউকে ‘ব্যান’ করতে পারবে না। প্রযোজকদের উপরে নিয়মের বোঝা চাপাতে পারবে না। সুষ্ঠুভাবে কাজ হবে। কাজের পরিমাণ বাড়বে। বাইরে থেকেও কাজ আসবে। যদি না তৃণমূল কংগ্রেসের করা ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝে তার পাশে দাঁড়ালে বেঁচে যাবে বাংলা সিনেমার দুনিয়া।‘
নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন পরিচালক ও অভিনেতা রাজ চক্রবর্তী। বৃহস্পতিবার (৭ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নিজের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে নতুন সরকারকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন এই নির্মাতা।
২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে ব্যারাকপুর কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন রাজ চক্রবর্তী।
এরপর পাঁচ বছর বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছরের নির্বাচনেও একই কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হন তিনি। তবে এবার বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচীর কাছে পরাজিত হন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন, '২০২১ সালে আমার রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ। মানুষ আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন কাজ করার। পরবর্তীতে ৫ বছর ধরে, সেইভাবেই বিধায়কের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছি। সেই অধ্যায় শেষ হল, ২০২৬-এ। সঙ্গে শেষ হল আমার রাজনৈতিক জীবনের পথচলা।'
পোস্টে নতুন সরকারকেও শুভেচ্ছা জানান রাজ। তিনি লেখেন, ‘বাংলার মানুষের মতামতে, বাংলায় নতুন সরকার এসেছে। তাদের জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। আশা করব, আপনাদের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে যাবে উন্নতির পথে। মানুষের সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে। সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।’
এদিকে অভিনেতা ঋদ্ধি সেন লেখেন, 'টলিউড নতুন রাজনৈতিক দলের সাথে কতটা এবং কিভাবে ঘনিষ্ঠ হবে সেটা আরেকটু সময় পেরোলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে তবে আপাতত যেটা ভাবতে ভালো লাগছে সেটা হলো বিদায় ‘তৃণউড’। সিনেমা এবং যেকোনো শিল্পমাধ্যমকে রাজনৈতিক দল থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার প্রতিরোধ অব্যাহত থাকা উচিত।'
প্রশ্ন হলো এবার কি তবে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব চালচিত্র বদলাবে? টালিগঞ্জে জয়ী হয়ে পাপিয়া অধিকারী বলেন, "আমি স্বপ্নের টালিগঞ্জ গড়ব। আমরা সব পরিকল্পনা করে ফেলেছি, সব বলব। সব দিক থেকে কীভাবে টালিগঞ্জকে নতুনভাবে গড়ে তোলা যায় ব্যবস্থা করা হবে।"