শিরোনাম
◈ আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করা হয়নি: সিইসি ◈ ইসি থেকে সুখবর পেলেন বিএনপির আবদুল আউয়াল মিন্টু ◈ দেশীয় স্পিনিং শিল্প রক্ষায় সুতা আমদানির শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ ◈ ইতালির টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট দল ঘোষণা, অধিনায়ক প্রাক্তন হকি খেলোয়াড় ◈ জামায়াত কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিকাশ-এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করছেন: অভিযোগ ফখরুলের (ভিডিও) ◈ ২৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা এনসিপির, কোন আসনে কে লড়বেন ◈ সিইসির সঙ্গে বৈঠকে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দল ◈ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ চূড়ান্ত, অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদের অপেক্ষায় ◈ মাদারীপুরে ইজিবাইককে চাপা দিয়ে বাস খাদে, নিহত ৫ ◈ ইউএনওকে ‘শাসানোয়’ সেই ইউপি চেয়ারম্যান বরখাস্ত

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৩৩ বিকাল
আপডেট : ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : মনিরুল ইসলাম

দ্বৈত নাগরিকেরা স্থানীয় নির্বাচ‌নে প্রার্থী হতে পারলেও সংসদ নির্বাচনে কেন পারেন না? 

এল আর বাদল : বাংলাদেশের আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলেও তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব যথাযথভাবে ত্যাগ না করার কারণে। আবার কোনো কোনো প্রার্থী দ্বৈত নাগরিক হয়েও এ নিয়ে হলফনামায় তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসিতে আপিল করা হয় এই মাসের শুরুতে।

এতে কোনো কোনো প্রার্থী তাদের মনোনয়ন ফিরে পেতে আপিল করেছেন, কেউ কেউ আবার তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী দ্বৈত নাগরিক এমন অভিযোগ জানিয়ে মনোনয়ন বাতিলের আবেদনও করেছিলেন। ----- বি‌বি‌সি বাংলা

এই যেমন, ফেনী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। রিটানিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বৈধ ঘোঘণা করেন।

পরে মি. মিন্টু দ্বৈত নাগরিক এমন অভিযোগ জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেন তারই প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী।

বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে তাদের বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়।

একই সাথে বাংলাদেশের সংবিধানেও বলা আছে, বাংলাদেশ বাদে অন্য দেশের নাগরিকত্ব থাকলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

এজন্য সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামায় একটি সুনির্দিষ্ট ঘর রয়েছে। যেখানে প্রত্যেক প্রার্থীকে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলও করেছেন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকরা ভোট দিতে পারলেও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না।

ফলে নাগরিকত্ব ত্যাগের যথাযথ প্রমাণ দিতে না পারায় অনেক প্রার্থীর আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচনী আইনে সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকলেও, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন দ্বৈত নাগরিকরা। কিন্তু একই দেশে দুই ধরনের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আলাদা কেন, সেই প্রশ্নগুলোও সামনে আসছে।

জাতীয় নির্বাচনে বাধা যে কারণে 

গত বছরের ১১ই ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন।

গত ২৯শে ডিসেম্বর মনোনয়ন দাখিল শেষে পরদিন থেকেই এই মনোনয়ন যাচাই বাছাই করা হয়।

মনোনয়ন যাচাই বাছাইয়ের শুরুতেই দেশের বেশ কয়েকটি আসনের জামায়াত- এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের বেশ কয়েকজন প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়ন যাচাই বাছাইয়ের সময় দেখা যায়, সিলেটে 'দ্বৈত নাগরিকত্ব' ইস্যুতে এনসিপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও একই ইস্যুতে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর বিরুদ্ধে প্রার্থীদের অনেকেই গত ৫ই জানুয়ারি থেকে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। আবার কোনো কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি গোপন করার অভিযোগ এনেও আপিল দায়ের করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের দেশে দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারার বিষয়টি আইন ও সংবিধানে স্বীকৃত বিষয়। সুতারং কেউ যদি নাগরিকত্ব ত্যাগ না করেন তাহলে তিনি জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না"।

এর আগে ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন আলোচিত প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয় দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে। যদিও তাদের কেউ কেউ পরে আবার উচ্চ আদালত থেকে প্রার্থিতা ফিরে পান।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা জেসমিন টুলী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের আইনেই বলা আছে অন্য কোন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে তাহলে তিনি এই নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। একই সাথে সংবিধানে বলা আছে যদি তিনি ওই দেশের নাগরিকত্ব পরিহার করেন বা আনুগত্য প্রত্যাহার করে নেন তাহলে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন"।

যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ইস্যুতে মনোনয়ন বাতিল হওয়া কোনো কোনো প্রার্থী অভিযোগ করেছেন তারা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যথাযথ তথ্য দেওয়ার পরও মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।

নাগরিকত্ব ত্যাগের নিয়ম কী?

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের একটি আসন থেকে নির্বাচনে এনসিপির মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন এহতেশামুল হক। পরে যাচাই বাছাইয়ে মি. হকের মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

মি. হক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, বড় দিন উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ থাকায় সেখানকার কাগজ আনতে পারেননি তিনি। যে কারণে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

তিনি একই সাথে অভিযোগ করেন, তার মনোনয়ন বাতিল হলেও সিলেটেই বিএনপির এক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোঘণা করা হয়েছে ঠিক একই জটিলতায়।

একই ধরনের জটিলতায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) পর্যন্তও বিষয়টির সুরাহা হয় নি।

আইনজীবীরা বলছেন, কেবল আবেদনের রিসিভ কপি নয়, বরং বিদেশি সরকারের ইস্যুকৃত চূড়ান্ত 'ত্যাগপত্র' বা সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা না হলে এই সাংবিধানিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

আইনজীবী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "একেক দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ রয়েছে। সেই নির্ধারিত বিভাগে আবেদনের পর ওই বিভাগ সেই কাগজ গ্রহণ করেছে কিংবা এই গ্রহণের ফরমাল ডকুমেন্টসও মনোনয়নপত্রের সাথে জমা দিতে হবে"।

তিনি বলছিলেন, শুধুমাত্র আবেদন করলেই নাগরিকত্ব ত্যাগ হয়ে যায় বিষয়টি এমন নয়। এর পক্ষে যদি প্রমাণ না থাকে তাহলে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়ন বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন"।

এবার যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তাদের অনেকেই যুক্তরাজ্যের নাগরিক ছিলেন। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের কোন কোন দেশের নাগরিক ছিলেন।

ব্রিটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট ১৯৮১-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ ও জটিল। লন্ডনের আইন বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একজন নাগরিককে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে 'ডিক্লারেশন অব রেনানসিয়েশন প্রদান করতে হয়। এর জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়। স্বরাষ্ট্র সচিবের দফতরে এই ঘোষণা নিবন্ধিত হওয়ার পরেই কেবল নাগরিকত্ব কার্যকরভাবে শেষ হয়।

আইনজীবী মি. ইকবাল মনে করেন, সঠিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব ত্যাগ না করা কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে, দ্বৈত নাগরিক ইস্যুতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের একেক প্রার্থীর একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনেরও নজরে এসেছে। যে কারণে ইসিতে আপীল শুনানিও হয়েছে গত কয়েকদিন।

সংসদ বনাম স্থানীয় নির্বাচন

২০১৮ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বরিশালের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ।

নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে পরের বার তাকে আর সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ।

পরে ২০২৪ সালে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন দাখিল করেন। তার মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, তিনি দ্বৈত নাগরিক হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছিল।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা আইন। যে কারণে জাতীয় নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকরা প্রার্থী না হতে পারলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পারে।

যে কারণে জাতীয় নির্বাচনের আগে অনেক দ্বৈত নাগরিককে তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করে প্রার্থী হতে দেখা যায়। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয় না।

যেমন হয়েছে বরিশালেরন সাবেক মেয়র মি. আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে।

নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলেন, "সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে জাতীয় নির্বাচনের অংশ নিতে পারবেন না, মানে সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, এমন কিছু বলা হয় নি"।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমাদের দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত বিষয়। তারা ভোটার হতে পারবেন এবং নাগরিক সব কিছু করতে পারবেন। শুধুামাত্র জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না"।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "রাষ্ট্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে উনি আমাদের দেশের আইনপ্রণেতা হবেন, আবার আরেক দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন, সে কারনেই হয়তো এমন সিদ্ধান্ত"।

প্রায় একই রকম ব্যাখ্যা দিয়ে আইনজীবী জাহেদ ইকবাল বলছিলেন, "সংসদ তো নীতি নির্ধারণী ফোরাম। সেখানে দেশের আইন হয়, স্বার্থের বিষয় আছে। আর স্থানীয় সরকার তো ভিন্ন কাজ করে। তাদের কাজ উন্নয়নমূলক। যে কারণে দ্বৈত নাগরিকরা মেয়র-চেয়ারম্যান হতে পারলেও এমপি হতে পারেন না"।

কোনো কোনো দেশে দ্বৈত নাগরিকরা এমপিও হতে পারেন।

তবে, বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে, তারা জাতীয় নির্বাচন ছাড়া সব নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। আবার ভোটারের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন, ভোটও দিতে পারেন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়