মহসিন কবির: নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। বকিী ৮টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এর মধ্যে ৫টি দল ভোট বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছে, এতে তাদের কি অর্জন হবে? এমনটাই প্রশ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
এসব দলগুলোর বৃহত্তর কোনো জোটের অংশ হিসাবেও পরোক্ষ কোনো ভূমিকা নেই তাদের। ফলে নিবন্ধিত হয়েও ভোটের মাঠ কিংবা জোটের হিসাবের বাইরে তারা। এই দলগুলোর মধ্যে নিবন্ধন স্থগিত থাকা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিক দলও রয়েছে। আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো বাধা না থাকলেও নির্বাচনের পরিবেশ নেই, অফিস বেদখল কিংবা নেতারা কারাগারে ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে নির্বাচন অংশ নিচ্ছে না তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব দল জোটের বাইরে রয়েছে, ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ তৈরি করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। ফলে ভোটের ফলাফলে তারা বড় কোনো ভূমিকা রাখবে না। এমনকি জোটের বাইরে থাকায় ভোটের মাঠে তাদের টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। আবার জেতার সুযোগ নেই- এমন বাস্তবতা মেনে নিয়েও অনেক ছোট দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছে। তারাও কার্যত বৃহৎ ভোটার-জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে তাদের বর্জনের সিদ্ধান্তও নির্বাচনী ফলাফলে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইসিতে নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলনের (বিএনএম) কোনো প্রার্থী। এর মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও ওয়ার্কাস পার্টি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদও (ইনু)। যদিও জাসদের কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বলে ইসি বলছে, তবে জাসদের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা ১৪ দলীয় জোটে রাজনৈতিক দল ছিল ১২টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ বলে নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন স্থগিত করে রেখেছে। বাকি ১১টি দলের মধ্যে গণতন্ত্রী পার্টি ও জাতীয় পার্টি (জেপি) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। অন্য দলগুলোর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-ইনু) অজ্ঞাত স্থান থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, সাম্যবাদী দল, গণ-আজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, ন্যাপ (মোজাফফর) বর্জনের ঘোষণা না দিলেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এই দলগুলোর নেতাকর্মীরা পলাতক অবস্থায় আছেন। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে কয়েকটি দল সক্রিয় থাকলেও সরকার বা নির্বাচন কমিশন তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বাধা দিতে দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত পাঁচজন নেতা আমাদের সময়কে জানান, তাদের অফিস বেদখল অবস্থায় আছে। জীবনের নিরাপত্তা নেই। যে কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের নাই।
১৪-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গত ৩০ ডিসেম্বর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, তারা এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তারা নির্বাচন বর্জন করেছে। তবে ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাসদের (ইনু) সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে এরা স্বতন্ত্র থেকে করছে নাকি অন্য দল থেকে করছে তা জানা যায়নি।
বিবৃতিতে জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেছিলেন, তাদের দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু কারাগারে আর সাধারণ সম্পাদক ৫ আগস্টের পর থেকে দলীয় কার্যক্রমে অনুপস্থিত। জাসদ নির্বাচনে কাউকে দলীয় মনোনয়ন দেয়নি। জাসদ আগামী নির্বাচন বর্জন করছে।
একই দিন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, দেশে বর্তমানে নির্বাচনের ন্যূনতম সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। ওয়ার্কার্স পার্টি সর্বোচ্চ সদিচ্ছা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেষ্টা করলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে। বিধায়, কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নির্বাচনের বর্জনের গত ২৮ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জনগণের জানমালের নিরাপত্তাহীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার ঘাটতি এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা নির্বাচনকে যথাযথ রূপে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। ... তাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি ও এই দলের অন্য কেনো নেতা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
অন্য দিকে, নিবন্ধন না থাকায় ৭টি বামপন্থি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত দল ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা’সহ বেশকিছু দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে তাদের পক্ষ থেকে বাধা নেই বলে জানা গেছে। জোটভুক্ত দল বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের (মাহবুবুল), গণমুক্তি ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট ইউনিয়নের আহ্বায়ক ইমাম গাজ্জালী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ।
একলা চলছে যারা : দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ আন্দোলনে ছিল গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলো। এর মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে নিজ নিজ প্রতীকে অংশ নিচ্ছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য। অন্যদিকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার হিসাব মেলাতে পারেনি বলে এককভাবে অংশ নিচ্ছে জেএসডি। আর গণতন্ত্রমঞ্চের একমাত্র অনিবন্ধিত দল ভাসানী জনশক্তি পার্টি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এ ছাড়া নিবন্ধিত অন্য দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ ও বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন একজন করে।
জানতে চাইলে ভাসানী জনশক্তি পার্টির আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের দল এখনও নিবন্ধিত নয়। খুব শিগগিরই নিবন্ধন হয়ে যাবে। তবে আমাদের দলের কেউ যদি নির্বাচনে স্বতন্ত্র অংশ নিতে চায় তারা নিতে পারে বলে জানিয়ে দিয়েছি।
এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি হলেন তানিয়া রব বলেন, সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম ও রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের জন-সার্বভৌমত্বের ধারাকে ধারণ করে আমাদের এমন এক নবতর শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে, যা প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। এ লক্ষ্যে একইভাবে নির্বাচন করছে জেএসডি।
জি এম কাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা) এককভাবে ও আনিসুল ইসলাম ও এবিএম রহুল আমিন হাওলাদার নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি-জেপি জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএফ) গঠন করে নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিচ্ছেন। দুপক্ষ থেকেই নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সংখ্যা প্রকাশ করলেও নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ আছে। কিন্তু এনডিএফকে ভোটের মাঠে রেখে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, এবিএম রহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, রত্ম হাওলাদার শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, যেসব দল জোটের বাইরে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে তাদের অধিকাংশেরই ভোটব্যাংক সীমিত। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে মূলত দুটি মেরু বিদ্যমান-একটি বিএনপিকেন্দ্রিক আরেকটি জামায়াতকেন্দ্রিক। কিন্তু ছোট দলগুলোর সেই অর্থে স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী ভোটার প্রতিনিধিত্ব নেই। ছোট দলগুলো এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলেও সার্বিক ফলাফলের ওপর তাদের বড় কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, যেসব ছোট দল ‘জেতার সুযোগ নেই’-এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছে, তারাও কার্যত বৃহৎ ভোটার জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে তাদের বর্জনের সিদ্ধান্তও নির্বাচনী ফলাফলে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, জোটের হয়ে নির্বাচন করাকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এতে জোটভুক্ত দলগুলো সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামবে। ভোটারদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। এক্ষেত্রে জোটের বাইরে এককভাবে নির্বাচন করা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হবে, এককভাবে ভোটের মাঠে ঠিকে থাকা কঠিন হবে।