দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে তদারকি জোরদার করায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মিথ্যা ঘোষণার সন্দেহে ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এসব ঘটনায় দায়ের করা হয়েছে ২৭০টি মামলা। এ থেকে রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে ৫৮.২ কোটি টাকা।
কাস্টমসের তথ্যমতে, কাস্টমসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার জব্দ করা চালানের সংখ্যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯.৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জব্দ করা হয়েছিল ৩৬১টি চালান। আর রাজস্ব ও জরিমানা আদায়ের পরিমাণ ৩১.৭ কোটি টাকা থেকে ৮৩.৬ শতাংশ বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরে ধরা পড়া দুটি ঘটনায় দেখা যায় আমদানিকারকেরা কীভাবে পণ্যের নাম ও পরিমাণের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করেছিল।
এর একটি ঘটনায়, কাউবয় ফুডস কোম্পানি লিমিটেড চীন থেকে জেনারেটর সেট ও এর যন্ত্রাংশ ঘোষণায় একটি চালান আমদানি করে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় চালানটিতে ১৩ হাজার ৩৩৫ কেজি অঘোষিত পণ্য পাওয়া যায়। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল সোলার স্ট্রিটলাইট, ইনভার্টার, পোর্টেবল পাওয়ার স্টেশন, ফুড অ্যাডিটিভস, টি-সেট ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি মডিউল।
চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ১.৩৩ কোটি টাকা; এতে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ছিল ৪৩.৪৩ লাখ টাকা। এ ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা আরোপ করে। প্রযোজ্য শুল্ক-কর পরিশোধ ও আমদানি বিধিমালা পরিপালন সাপেক্ষে পণ্যগুলো ছাড় করার অনুমতি দেওয়া হয়।
আরেক ঘটনায়, রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড চীন থেকে ২ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩ কেজি সিমলেস পাইপ আমদানির ঘোষণা দেয়। তবে পরিদর্শন শেষে চালানটিতে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত ৭২ হাজার ৫০০ কেজি বা ২৭.৪ শতাংশ বেশি পণ্য পাওয়া যায়।
কাস্টমসের হিসাবে, এই চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ছিল ১.১৪ কোটি টাকা। এ ঘটনায় ১.২ কোটি টাকা জরিমানা ও ১৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা আরোপ করা হয়।
জরিমানা ও বিমোচন চার্জ বাদে শুধু এ দুটি ঘটনায়ই সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৫৭ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম কাস্টমসের এই কঠোর নজরদারিকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেন।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'কাস্টমসে আমার ৪০ বছরের পেশাগত জীবনে মিথ্যা ঘোষণার কারণে এত বিপুলসংখ্যক মামলা হতে আগে কখনো দেখিনি।'
গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কৃতিত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কড়াকড়ি অব্যাহত থাকলে মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ার প্রবণতা কমবে এবং রাজস্ব আদায় আরও বাড়বে।
রাজস্ব আদায়ে বড় উল্লম্ফন
এআইআর শাখার তথ্য বলছে, গত তিন বছরে কাস্টমসের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাত্রা অনেক বেড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১৬৭টি চালান জব্দ ও ২২৮টি মামলা দায়ের করে। সে সময় রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছিল ২৭.৪৪ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ৩৬১টি চালান জব্দ ও ১৯৯টি মামলা দায়ের করা হয়। এতে রাজস্ব ও জরিমানা আদায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩১.৭ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জব্দ করা চালানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৭টি। এই সময়ে মামলা হয়েছে ২৭০টি এবং রাজস্ব ও জরিমানা আদায়ের পরিমাণ বেড়ে ৫৮.২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
অন্যদিকে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এআইআর শাখা মোট ১ হাজার ৪৫১টি চালান জব্দ ও ৮৪৩টি মামলা দায়ের করেছে। ওই অর্থবছরে ৫২.০৮ কোটি টাকা রাজস্ব ও ৫৯.৬৩ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১১১.৭২ কোটি টাকা।
এ পরিসংখ্যানই বলছে, অনিয়ম শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগের হার বেড়েছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে মিথ্যা ঘোষণার প্রকৃত চিত্র বা ব্যাপকতা কতটুকু, তা কেবল এই তথ্য থেকে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায় না।
সুনির্দিষ্ট নজরদারির দাবি ব্যবসায়ীদের
ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তবে তারা সতর্ক করে এ-ও বলেন, অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে যেন বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সাবেক সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মিথ্যা ঘোষণার পেছনে কখনো কখনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকে। তারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব অনিয়ম করে। পরে অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়।
কেবল জরিমানার ওপর নির্ভর না করে আরও জোরালো নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। তবে এই ব্যবসায়ী নেতা সতর্ক করে বলেন, সব আমদানিকারকের পণ্য ঢালাওভাবে তল্লাশি করা হলে পণ্য খালাসে বিলম্ব হতে পারে। এতে রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ীরাও ভোগান্তির শিকার হতে পারেন।
সাধারণত ভুল ট্যারিফ ক্লাসিফিকেশন, পণ্যের পরিমাণ বা দাম কম দেখানো ও কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্য লুকিয়ে আনার মাধ্যমে এই মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমস বেশ কিছু সন্দেহজনক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্ক্র্যাপ ঘোষণা দিয়ে যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনী আনা, অন্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন লুকিয়ে আনা এবং ভুল ঘোষণায় কাপড় আমদানি।
নজরদারি বাড়াচ্ছে কাস্টমস
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমিন টিবিএসকে বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাস্টমস বিভাগ তাদের নজরদারি ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো-র আওতায় সেবাগুলোকে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর কাস্টমস কর্মকর্তারা আরও সতর্ক হয়েছেন। বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে পরিপালন নিশ্চিত করতে তারা তদারকি আরও জোরদার করবেন।
কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, এই অভিযান ফলপ্রসূ ও টেকসই করতে হলে ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন (রিস্ক-বেজড ইন্সপেকশন) চালাতে হবে। একইসঙ্গে বৈধ পণ্যের খালাস প্রক্রিয়ায় অহেতুক বিলম্ব না ঘটিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড