শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৫ সকাল
আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:২৮ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানিতে বড় ধাক্কা, ১৫ দিনের তেল আসতে লাগছে ৫০ দিন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে সংকটে পড়েছে। সৌদি আরবের যে তেল আমদানি করতে বাংলাদেশের আগে ১৫-১৬ দিন সময় লাগত, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে শঙ্কা ও সৌদি আরবের ইস্ট ওয়েস্ট পাইললাইন সাময়িক বন্ধের কারণে এখন তা আনতে ৫০ দিন সময় লাগবে। এতে একদিকে যেমন দেশের জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে, একই সঙ্গে বাড়বে পণ্য আমদানির সময়। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি আমদানির কারণে পণ্য প্রাপ্তিতে ঝুঁকি তৈরি হওয়ারও শঙ্কা আছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায় তা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট দ্রুত চলে যাবে এমন ভাবার কারণ নেই। এটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ। এজন্য বিকল্প উৎস বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করতে হবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজ চলাছল বিঘ্নিত হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি আমদানি-রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ আরেক প্রণালি বাব আল-মান্দেব দিয়েও জাহাজ চলাচলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে এ বিকল্প নৌপথটির গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যায়। কিন্তু এখন এ পথটি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হরমুজ এবং মান্দেব উভয় পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের সরবরাহ শৃঙ্খল গভীর সংকটে পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আলজাজিরার বরাতে জানা যায়, ইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরব ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৬১ ডলারে ঠেকেছে। অথচ এক মাস আগেও ছিল ৮৭ দশমিক ০৭ ডলার।

advertisement

প্রসঙ্গত, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব হয়ে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়। তবে হরমুজ দিয়ে এখন দেশে কোনো জাহাজ আসছে না। আসছে মান্দেব প্রণালি দিয়ে। আর সেখানে পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে বিমা ব্যয়, নিরাপত্তাঝুঁকি, জাহাজভাড়া ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন করে সংকট তৈরির ফলে সৌদির আরামকো থেকে যে জ্বালানি আমদানি করতে ১৫-১৬ দিন লাগত এখন তা দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে আসতে ৫০ দিনের মতো লাগবে। এখানে সময় একটি চ্যালেঞ্জ। এতে ফ্রেইট কিছুটা বেড়ে যায়। আবার এত দীর্ঘ সময়ে পণ্য প্রাপ্তিতে ঝুঁকিও থাকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশে জ্বালানির ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করা হয়। এতে বিভিন্ন দেশের রিফাইনারিগুলোর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ক্রুড পেতে দেরি হবে। আবার যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন তা হয়তো পূরণ হবে না। বিভিন্ন পথ ঘুরে আসায় পণ্য পেতে দেরি হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই ফিডে সমস্যা মানেই বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়া। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য যারা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ তাদের ওপর বাড়তি আমদানি ব্যয় যুক্ত হবে। আবার সরবরাহকারী যারা পরিশোধিত পণ্য সরবরাহ করে তাদেরও জাহাজ প্রাপ্তিতে সমস্যা হবে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়বে, ইন্স্যুরেন্স ঝুঁকিও বাড়বে। এ কারণে বিপিসির প্রিমিয়ামের ওপর চাপ পড়বে। পরিস্থিতি কোথায় যায় তা পর্যবেক্ষণ করতে আরও দু-এক দিন সময় লাগবে।

advertisement

এর ফলে জ্বালানি আমদানির খরচও বৃদ্ধি পাবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ খরচ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সব জাহাজ রাজিও হয় না। আবার জাহাজ প্রাপ্তিরও বিষয় আছে। বর্তমানে বিপিসির অক্টোবর পর্যন্ত তেলের মজুত আছে। নভেম্বরে নতুন করে তেল আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি সংকট এড়াতে সব চেষ্টাই করা হচ্ছে। রুট পরিবর্তনের কারণে জ্বালানি আমদানির ভাড়ায় কেমন প্রভাব পড়বে তা জানতে চাইলে বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বল্প দূরত্বের পথ ঘুরে আসায় আগের চেয়ে ভাড়া স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। কারণ জ্বালানিবাহী জাহাজটিকে আগের চেয়ে বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। এতে জ্বালানি খরচও বাড়বে। ফ্রেইটও বাড়বে। জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যবহৃত ট্যাংকারের খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘুরপথে সাধারণত একটি ট্যাংকারে ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় হতে পারে। কিন্তু সরাসরি গেলে এ খরচ হয় না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মান্দেব প্রণালি ও সৌদির ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইনের বিষয়টি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্য জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন। এ ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত চুক্তির চাহিদামতো তেল পাওয়া যায় না। আবার মূল্যও বেশি থাকে। এ কারণে সরকারের শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের কথা তা দেওয়া কষ্টকর হয়। এখন যেহেতু গ্যাসের সংকট এজন্য ডিজেলের ওপরও নির্ভরতা বেড়েছে। এ অবস্থায় ডিজেলের প্রাপ্তিও সমস্যার সম্মুখীন। আবার বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়ে সমস্যা আছে।

এ বিভিন্নমুখী চাপের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন হলে তা বাড়তি চাপের অনুষঙ্গ তৈরি করবে। এখন সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি খুঁজতে হবে। ডিজেলের জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে রয়েছে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হবে। আবার সবাই যখন এ দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করবে তখন এক ধরনের চাপ তৈরি হবে। তবে এ সংকট দ্রুত চলে যাবে এটা ভাবার কারণ নেই। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যাটি যেহেতু রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কিত এজন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটের বাস্তবতা মেনেই এগিয়ে যেতে হবে এবং সেভাবেই কৌশল ঠিক করা দরকার। এরই মধ্যে বাব আল-মান্দেবের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ঘুরপথে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে দেশে এসেছে এমটি নিনেমিয়া নামের একটি জাহাজ। আগে যেখানে ১২-১৩ দিন লাগত, সেখানে আফ্রিকা হয়ে আসতে এমটি নিনেমিয়ার লেগেছে ৫২ দিন। গত ২৩ জুলাই ইয়ানবু থেকে যাত্রা শুরু করা এ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)-এর একটি সূত্র জানায়, ক্রুড অয়েলের আরও একটি চালান মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনার প্রক্রিয়া চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৬ অক্টোবর জাহাজটি ক্রুড লোড করে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারে। এটি মান্দেব প্রণালি দিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। যদি এ পথে সম্ভব না হয়, তাহলে পরিস্থিতি বিবেচনায় এমটি নিনেমিয়ার মতো ঘুরপথে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, হরমুজে সমস্যা হওয়ার পর সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করছিল। যা বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে বিকল্প পথে পরিবহন হতো। এখান সেখানেও সমস্যা তৈরি হয়েছে হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির কারণে। আমাদের ক্রুড অয়েলের সর্বশেষ পার্সেলটি মান্দেব প্রণালি হয়ে আসতে পারেনি। সেক্ষেত্রে ১০-১২ দিন সময় লাগত। চালানটি সুয়েজ খাল পার হয়ে ভূমধ্যসাগর দিয়ে উত্তর আটলান্টিক-দক্ষিণ আটলান্টিক-আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ (অন্তমাশা অন্তরীপ) ও ভারত মহাসাগর হয়ে দেশে আসতে ৫২-৫৩ দিন লেগেছে। এতে সময় যেমন বেশি লাগছে, জাহাজ ভাড়াসহ আমদানি খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

advertisement

এ অবস্থায় জ্বালানির জন্য বিকল্প দেশ খোঁজার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ব্রুনাই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, সমস্যাটি বৈশি^ক এবং কম সময়ে সমাধান হবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, বাব আল-মান্দেব দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় পণ্য রপ্তানি হয়। তাই প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানিতেও সমস্যা দেখা দেবে। ইউরোপে একটি কনটেইনার পাঠাতে এখন লাগে ৪ হাজার মার্কিন ডলার। বিকল্প পথে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে রপ্তানি করতে হলে খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ডলার। আমদানিতেও একই অবস্থা হবে। বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন 

  • সর্বশেষ