শিরোনাম
◈ ডলারের দাম অপরিবর্তিত, সপ্তাহজুড়ে ওঠানামা পাউন্ড-ইউরোসহ অন্যান্য মুদ্রায় ◈ বিলের পানিতে হাঁস পালন করে বদলাচ্ছে নড়াইলের তরুণদের ভাগ্য, ডিমের বাজার ২২ কোটি টাকা! ◈ ‘ভুয়া’ খবর বিষয়ক সতর্কবার্তা দিল ভারতীয় হাইকমিশন ◈ পরিবারের বড় ছেলে, যার কাঁধে অনেক দায়িত্ব: মির্জা ফখরুলকে নিয়ে জামাতা ফাহাম ◈ পেন্টাগনের হিসা‌বে ইরানের বিরুদ্ধে গত ৬ মাসের যু‌দ্ধে ১৮ মা‌র্কিন সেনা নিহত, ৭৫০ এর বে‌শি আহত   ◈ কলকাতায় অগ্নিকাণ্ড: আতঙ্কে সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি পর্যটকেরা ◈ রাষ্ট্রপতির শপথ আজ, যেসব সড়কে থাকছে যান চলাচলে বিধিনিষেধ ◈ অ‌স্ট্রেলিয়ায় শান্তর অধিনায়কত্বে মুগ্ধ র‌বিচন্দন অশ্বিন, প্রশংসা করলেন তান‌জিদ তামিমেরও  ◈ ফিফা সভাপ‌তি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সরব এক সহ-সভাপতি, সিওও-কে বরখাস্ত করে হাঙ্গেরির সমর্থনও হারালেন  ◈ গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ রুটে আসছে মেট্রোরেল

প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫১ দুপুর
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

১৫ গ্রাম চিপসের প্যাকেট নেমে এসেছে ১০ গ্রামে, দাম একই কমছে পণ্যের পরিমাণ: ভোক্তার ওপর বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ!

১৫ গ্রাম চিপসের প্যাকেট নেমে এসেছে ১০ গ্রামে। ২৫ গ্রামের চানাচুর হয়েছে ২২ গ্রাম। ৪৫ গ্রামের টুথপেস্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ গ্রামে। আবার কোথাও পণ্যের পরিমাণ কমার পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে দামও। ফলে প্যাকেটের গায়ে লেখা দামের পরিবর্তন যতটা চোখে পড়ে, তার চেয়ে বেশি বাড়ছে পণ্যের প্রকৃত ব্যয়। দাম বাড়েনি ভেবে স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একই দামের প্যাকেটেই এখন মিলছে আগের তুলনায় কম পণ্য। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন

কাঁচামাল, প্যাকেজিং, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে সরাসরি দাম বাড়ানোর বদলে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার এ প্রবণতা এখন স্ন্যাকস, বিস্কুট, কেক, পানীয় থেকে শুরু করে সাবান, শ্যাম্পু, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যেই দেখা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, একে বলা হয় ‘শ্রিংকফ্লেশন’। অর্থাৎ পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখে এর আকার, ওজন বা পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার কৌশল অবলম্বন।

রাজধানীর ধানমন্ডির একটি সুপার শপ থেকে গতকাল ৯০ গ্রামের লাইফবয় সাবান, ৪৭ গ্রামের ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ও ২৫০ মিলিলিটারের কোকা-কোলা কেনেন স্বপ্না রায়। তিনটি পণ্যে তার খরচ হয় প্রায় ২৪৫ টাকা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আগে লাইফবয় সাবান ১০০ গ্রাম ছিল ৫০ টাকা। এখন ৯০ গ্রাম করা হয়েছে, দামও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ১০ টাকা। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর ৫০ গ্রামের দাম ১৬০ থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা হয়েছে। কোকা-কোলা ২৫০ মিলিলিটার ২০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ টাকা। দাম বাড়তে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে পরিমাণ কমিয়ে দেয়া ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ।’

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের পরিমাণ কমানোর প্রবণতা স্পষ্ট। বম্বে সুইটসের পটেটো ক্র্যাকার্স চিপসের পরিমাণ ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ গ্রাম করা হয়েছে। দাম রাখা হয়েছে আগের ১০ টাকাই। একই প্রতিষ্ঠানের মিস্টার টুইস্ট চিপসের দাম ২৫ টাকা থাকলেও ২২ থেকে কমে হয়েছে ১৮ গ্রাম। স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের রুচি বারবিকিউ চানাচুরের ২৫ গ্রামের প্যাকেট এখন ২২ গ্রাম। দাম ১০ টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ একই দামে ভোক্তা আগের তুলনায় ৩ গ্রাম কম চানাচুর পাচ্ছে।

কেকের বাজারেও একই চিত্র। অলিম্পিকের ড্রাই কেক ৩৮ থেকে কমে হয়েছে ২৫ গ্রাম। হবিগঞ্জ এগ্রোর ওয়ান্ডার মাফিন কেকের পরিমাণ ১৮ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ১৬ গ্রাম। দাম একই রাখা হয়েছে, ১০ টাকা। অলটাইমের ড্রাই কেকও ২৫ থেকে কমে ২২ গ্রাম করা হয়েছে, দাম ১০ টাকা।

প্যাকেটের গায়ে দাম একই থাকায় এসব পরিবর্তন অনেক সময় ভোক্তার তাৎক্ষণিক নজরে আসে না। তবে নিয়মিত কেনাকাটা করা ভোক্তার জন্য মাস শেষে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একেকটি পণ্যে কয়েক গ্রাম করে কমলেও নিত্যদিনের বাজারে বহু পণ্য কিনতে গিয়ে মোট ব্যয়ের ওপর তা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

রাজধানীর ৬০ ফিটের আমতলার বাসিন্দা আকবর হোসেন বলেন, ‘আমি নিয়মিত ১০ টাকার বিস্কুট কিনি। আগে একই দামে যে পরিমাণ পণ্য পেতাম, এখন প্যাকেট প্রায় একই হলেও ভেতরে কম থাকে। পরে ওজন দেখে বিষয়টি বুঝেছি। দাম না বাড়লেও কম পণ্য পাওয়ায় আমার কাছে এটি পরোক্ষ মূল্যবৃদ্ধি।’

শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইউনিলিভারের লাক্স সাবানের ওজন ১০০ থেকে কমিয়ে ৯০ গ্রাম করা হয়েছে। একই সঙ্গে এর দাম বেড়েছে ১০ টাকা। সার্ফ এক্সেলের মিনিপ্যাক ২২ থেকে কমে হয়েছে ১৮ গ্রাম। ক্লোজআপ টুথপেস্টের পরিমাণও ৪৫ থেকে কমিয়ে ৩৮ গ্রাম করা হয়েছে। অর্থাৎ প্যাকেটের আকার ও পণ্যের পরিমাণ কমানোর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয়ের চাপের একটি অংশ ভোক্তার ওপর সরাসরি দাম না বাড়িয়েই স্থানান্তর করা হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামাল, প্যাকেজিং, বিদ্যুৎ-গ্যাস, পরিবহন ও শ্রম ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সরাসরি দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে খরচ সামাল দিচ্ছে। এতে ভোক্তার চোখে দাম একই থাকলেও প্রতি গ্রাম বা মিলিলিটার পণ্যের প্রকৃত দাম বেড়ে যায়।এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে ইউনিলিভারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমদানি করা কাঁচামাল ও প্যাকেজিং উপকরণের ব্যয় বেড়েছে।

অপরিশোধিত তেল, প্লাস্টিক রেজিন ও পাম অয়েলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ব্যয়ে। তবে কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় পণ্যের মূল্য সমন্বয় সীমিত রাখা হয়েছে। ভোক্তার সুবিধা বিবেচনায় বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য পণ্য সাশ্রয়ী রাখতে প্রাইস-প্যাক আর্কিটেকচার অনুসরণ করা হয়। পণ্যের মূল্য বা প্যাকেটের আকারে পরিবর্তন বিদ্যমান আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনেই করা হয় এবং প্রতিটি প্যাকেটে সঠিক ওজন ও এমআরপি উল্লেখ থাকে।

প্যাকেটের গায়ে দাম ঠিক রেখে পরিমাণ কমিয়ে বিক্রি করার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা অধিকাংশ সময় জিনিসের দাম বাড়াতে পারি না। তাই আগের দামটাই বজায় রাখতে হয়। ফলে অনেক জায়গায় আমাদের ছাড় দিতে হয়, অর্থাৎ পণ্যের পরিমাণে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। প্রাইসটা ঠিক রাখার জন্যই আমরা মূল উপাদানের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিই। কিন্তু দাম বাড়িয়ে পণ্যের পরিমাণ কমিয়েছি এমনটি কখনো করিনি।’

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনে তিনি আরো বলেন, ‘গত ছয় মাসে পেট্রোকেমিক্যালসহ বিভিন্ন উপাদানের দাম বাড়ায় শুধু প্যাকেজিংয়ের খরচই বেড়েছে ৩২ শতাংশ। এর বাইরে তেল ও জ্বালানির দামও বেড়েছে, যেগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচের ওপর। কিন্তু ৫ টাকার একটি পণ্যের দাম তো আর হুট করে বেশি বাড়ানো যায় না। তাই বিদ্যমান দামেই যেন মানুষ পণ্যটি কিনতে পারে, সেজন্য আমরা পণ্যের মূল দাম না বাড়িয়ে ভেতরের কোয়ান্টিটি বা পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছি।’

অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি সাধারণত পণ্যের দাম বাড়ার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। কিন্তু শ্রিংকফ্লেশনের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ভিন্ন পথে। পণ্যের গায়ে লেখা দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়। ফলে প্রতি গ্রাম, মিলিলিটার বা ইউনিট পণ্যের প্রকৃত দাম বেড়ে যায়। যেমন ১৫ গ্রাম চিপস ১০ টাকায় বিক্রি হলে প্রতি গ্রামের দাম ছিল প্রায় ৬৭ পয়সা। একই প্যাকেটের পরিমাণ কমিয়ে ১০ গ্রাম করা হলে প্রতি গ্রামের দাম দাঁড়ায় ১ টাকা। অর্থাৎ প্যাকেটের দাম একই থাকলেও পণ্যের একক মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাধারণত মূল্যস্ফীতির সময় কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি দাম বাড়ানোর পরিবর্তে এ কৌশল নেয়। কারণ দাম বাড়ালে ভোক্তা বিকল্প পণ্য বা অন্য ব্র্যান্ড বেছে নিতে পারে। বিপরীতে পণ্যের পরিমাণ কমানোর বিষয়টি অনেক সময় সহজে ভোক্তার নজরে আসে না।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কোম্পানিগুলো পণ্যের পরিমাণ কমাতে পারে। তবে এখানে ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা হচ্ছে কিনা সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্যাকেটের গায়ে পণ্যের ওজন, উপাদান ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে দেয়া হচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। একই দাম রেখে পরিমাণ কমানো ভোক্তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করার কৌশলও হতে পারে।’

বাজারে শ্রিংকফ্লেশনের বিস্তার শুধু প্যাকেটের ওজন কমে যাওয়ার বিষয় নয়; এটি ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ারও একটি সূচক। দামের পাশাপাশি পণ্যের পরিমাণের পরিবর্তনও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা না হলে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ অনেকটাই আড়ালে থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতি চললে পণ্যের পরিমাণ ছোট হতে থাকে, কিন্তু দাম একই থাকে। ভোক্তার প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তারা আগের দামে আগের পরিমাণ পণ্য কিনতে পারে না। বিষয়টি বুঝে উৎপাদকরা ওজন কমানোর কৌশল নেন। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। আর ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে পণ্য কেনার পরিমাণও কমে যায়। এতে বাজারে চাহিদা কমে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’

কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ব্যবসায়ীরা সাধারণত দুটি পথ বেছে নেন—দাম বাড়ানো অথবা পণ্যের পরিমাণ কমানো। তবে বর্তমান বাজারে কিছু ক্ষেত্রে দুটিই একসঙ্গে ঘটছে। ফলে ভোক্তাকে একই পণ্যের জন্য বেশি দাম দেয়ার পাশাপাশি কম পরিমাণ পণ্যও নিতে হচ্ছে। এটি নিয়মিত তদারকিতে তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। বাজার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্যাকেটের গায়ে উল্লেখ করা পরিমাণ ও দামের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা তা যাচাই করা হবে নিয়মিত। প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য নেয়া হবে। এরপর প্রমাণের ভিত্তিতে নেয়া হবে পরবর্তী ব্যবস্থা।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়