বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে এখন পর্যন্ত সাতটি কোম্পানি তথ্য প্যাকেজ সংগ্রহ করেছে।
তবে দরপত্রের নথি (বিড ডকুমেন্ট) কিনেছে শুধু তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি তুর্কি পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কোম্পানি (টিপিএও)।
২০২৪ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে এক্সনমোবিল, শেভরনসহ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রস্তাব জমা দেয়নি।
সেই অভিজ্ঞতার পর উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি) সংশোধন করে এবার ২৬টি অফশোর ব্লকের জন্য নতুন করে দরপত্র ডাকে সরকার।
পেট্রোবাংলা মনে করছে, টিপিএওর অংশগ্রহণ অন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকেও উৎসাহিত করতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অফশোর অনুসন্ধানের স্থবিরতা সত্যিই কাটছে কি না, তার স্পষ্ট চিত্র মিলবে আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়ের পর।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেরিংগিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড ২ জুন, ক্রিসএনার্জি ৩ জুন, পিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ৯ জুন, অনোডা ইনকরপোরেটেড ১০ জুন, রিস্ট্যাড এনার্জি ১৫ জুন, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ১ জুলাই এবং টিপিএও ২৩ জুলাই তথ্য প্যাকেজ সংগ্রহ করে। একই দিনে টিপিএও বিড ডকুমেন্টও কেনে।
তবে তথ্য প্যাকেজ সংগ্রহকারী সব প্রতিষ্ঠানই তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী কোম্পানি নয়। নরওয়ের রিস্ট্যাড এনার্জি মূলত জ্বালানি খাতের গবেষণা, তথ্য ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো ও প্রকৌশল খাতে কাজ করে।
বড় কোম্পানিগুলো আসবে?
এবারের বিডিং রাউন্ডে টিপিএও ছাড়া অন্য কোনো বড় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি এখনও বিড ডকুমেন্ট কেনেনি।
তবে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েবের ধারণা, অনেক কোম্পানির কাছেই আগের বিডিং রাউন্ড থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে। ফলে তারা দরপত্র জমার শেষ সময়ে নথি কিনতে পারে।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে পেট্রোবাংলার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
"তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। তারা এখনও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। আমাদের ধারণা, বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এবারও অংশ নিতে পারে।"
টিপিএওর আগ্রহ কেন গুরুত্বপূর্ণ
টিপিএও তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি। কৃষ্ণ সাগরের সাকারিয়া গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উন্নয়নে এ কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এটি তুরস্কের প্রথম গভীর সমুদ্রের গ্যাসক্ষেত্র, যেখান থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিলে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়।
তুরস্কের বাইরে আজারবাইজান, ইরাক ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে টিপিএও।
সম্প্রতি এক্সনমোবিল, শেভরন ও বিপির সঙ্গে পৃথক সহযোগিতা চুক্তি এবং লিবিয়ার দুটি ব্লকে অনুসন্ধানের অধিকার পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও টিপিএওর উপস্থিতি জোরালো হয়েছে।
এ কারণে পেট্রোবাংলা মনে করছে, টিপিএওর বিড ডকুমেন্ট কেনা আগের বিডিং রাউন্ডের তুলনায় ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত।
২৬ ব্লকে আবার দরপত্র
সরকার গত ২৪ মে সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকে।
তাতে অগভীর সমুদ্রের ১১টি এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনো কোম্পানি এককভাবে বা যৌথভাবে এক বা একাধিক ব্লকের জন্য দরপত্র জমা দিতে পারবে।
দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর। একই দিন প্রস্তাব খোলা হবে।
মিয়ানমারের সঙ্গে ২০১২ সালে এবং ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরের এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এই এলাকাকে ২৬টি অনুসন্ধান ব্লকে ভাগ করা হলেও এক যুগের বেশি সময়েও অধিকাংশ ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়নি।
অথচ একই বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে মিয়ানমার বহু বছর ধরে গ্যাস উৎপাদন করছে। ভারতের কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকার গভীর সমুদ্রেও বাণিজ্যিক উৎপাদন চলছে।
বাংলাদেশে সমুদ্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদনের একমাত্র উদাহরণ সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র। সেখানে ১৯৯৮ সালে উৎপাদন শুরু হলেও মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ২০১৩ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
২০২৪ সালে নথি কিনেও কেউ দর দেয়নি
২০২৪ সালের মার্চে ২৪টি সমুদ্র ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেছিল পেট্রোবাংলা।
এক্সনমোবিল, শেভরন, ইনপেক্স, পিটিটিইপি, সিএনওওসি, ক্রিসএনার্জি ও ওএনজিসিসহ সাতটি কোম্পানি বিড ডকুমেন্ট কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ প্রস্তাব জমা দেয়নি।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার দরপত্র জমার সময়সীমা তিন মাস বাড়ালেও কোনো প্রস্তাব না আসায় বিডিং রাউন্ডটি বাতিল করা হয়।
কোম্পানিগুলো কেন দরপত্র দেয়নি, তা পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন পিএসসি তৈরি করেছে সরকার।
নতুন পিএসসিতে কী পরিবর্তন
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর প্রধান আপত্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে 'বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬' সংশোধন করা হয়েছে।
নতুন চুক্তিতে বিদেশি কোম্পানির জন্য মুনাফা সম্পূর্ণভাবে দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সিগনেচার বোনাস ও রয়্যালটির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অগভীর ও গভীর সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রেই ১০০ শতাংশ কস্ট রিকভারির সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও বছরে তা ৭৫ শতাংশের বেশি হবে না।
কোম্পানিগুলো তাদের অংশের গ্যাস দেশের বাজারে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে। তবে পেট্রোবাংলার অগ্রাধিকারভিত্তিক কেনার অধিকার বহাল থাকবে। নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগের বিডিং রাউন্ডে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর প্রধান আপত্তি ছিল গ্যাসের মূল্য, পাইপলাইন ট্যারিফ, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং পর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক তথ্যের অভাব।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ হয় প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
একসময় দেশীয় উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছালেও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ কমে যাওয়া এবং নতুন বড় ক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
সম্প্রতি মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক খাতে।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম