শিরোনাম
◈ দেশের সব মাদ্রাসার জন্য অধিদপ্তরের জরুরি নির্দেশনা ◈ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের ভয়াবহ ধ্বংসেও টিকে রইল এই ভবন, আহত হননি কোনো বাসিন্দা ◈ তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ-চীন সমন্বয়, ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ◈ হজের খরচ বাড়াচ্ছে সৌদি সরকার ◈ সবই টাকার খেলা, মেসিকে টিকিয়ে রাখতেই অন্যায়: ফিফার বিরুদ্ধে মিশর কোচের বিস্ফোরক অভিযোগ ◈ ঢাকার মিরপুর, চট্টগ্রাম ও সি‌লেট স্টে‌ডিয়া‌মে এশিয়া কাপ আয়োজনের পরিকল্পনা বিসিবির  ◈ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের পাল্টা আঘাতের দাবি ◈ বিশ্বকা‌পে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ফিফা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদ‌ন্তের দা‌বি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ◈ উত্তাল সাগর: এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দেশ ◈ আকুর বিল পরিশোধের পরও রিজার্ভ ৩৬.৫২ বিলিয়ন ডলার

প্রকাশিত : ০৭ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫২ দুপুর
আপডেট : ০৮ জুলাই, ২০২৬, ০১:৪৪ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

বঙ্গোপসাগরের গ্যাস না তুলে উল্টো আমদানি, নীতিগত ভুলে আড়াই লাখ কোটি টাকার খেসারত

ডেস্ক রি‌পোর্ট : ২০১২ ও ২০১৪ সাল- আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) লাভ করে। চারপাশের সমুদ্রবক্ষে যখন প্রতিবেশী দুই দেশ দেদার গ্যাস তুলছে, তখন বাংলাদেশের অর্জিত এই বিশাল জলরাশিকে ধরা হয়েছিল দেশের আগামী শতাব্দীর ‘জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কিন্তু সমুদ্র বিজয়ের এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে ২০২৬ সালেও গভীর সমুদ্রের সেই গ্যাস ব্লকে একটিও কূপের শিখা জ্বলে ওঠেনি। যখন দেশের শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আমদানিকৃত এলএনজির পেছনে ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ লোডশেডিংয়ে জর্জরিত- তখন প্রশ্ন উঠেছে, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কেন থমকে রইল এবং এর পেছনে নীতিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা ভয়াবহ? সূত্র: নয়া‌দিগন্ত

নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করা এবং ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে টাকা দেয়া ছিল একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধ। ৫০ হাজার কোটি টাকা সঠিক সময়ে অনুসন্ধানে খরচ করলে বাংলাদেশ আজ ছয় লাখ কোটি টাকার গ্যাসের মালিক হতে পারত। এক দশকের অবহেলা ও ভুল নীতির খেসারত দিচ্ছে আজকের দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণ। নীতিগত ভুলে আড়াই লাখ কোটি টাকার খেসারত দিতে হয়েছে দেশকে। আর বিশেষজ্ঞদের মত হলো, আমদানির আত্মঘাতী পথ সম্পূর্ণ পরিহার করে সমুদ্রের নিজস্ব সম্পদ উন্মোচনেই লুকিয়ে আছে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সার্বভৌমত্ব।

দীর্ঘসূত্রতার এক দশক ও ত্রুটিপূর্ণ পিএসসি

সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশ সমুদ্রবক্ষকে ২৬টি ব্লকে (অগভীর সমুদ্রে ১১টি এবং গভীর সমুদ্রে ১৫টি) ভাগ করলেও, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে পার করে দেয় এক দশকেরও বেশি সময়। কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং ভূরাজনৈতিক পরাশক্তিগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় নষ্ট করেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

এর চেয়েও বড় আঘাত ছিল আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর (আইওসি) জন্য তৈরি ‘উৎপাদন বণ্টন চুক্তি’ বা মডেল পিএসসির জটিলতা। ২০০৮, ২০১২ এবং ২০১৯ সালের পিএসসিতে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম প্রতি হাজার ঘনফুট সর্বোচ্চ ৭.২৫ ডলার বেঁধে দেয়া হয়েছিল। অথচ একই সময়ে মিয়ানমার বা ভারত আন্তর্জাতিক বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১০ থেকে ১৪ ডলারের প্রস্তাব দিচ্ছিল। ফলে টোটাল এনার্জি বা কনোকোফিলিপসের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কাজ মাঝপথে রেখেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।

পাশাপাশি, পুরো সমুদ্রসীমার তথ্য সংবলিত কোনো ‘ডেটা ব্যাংক’ বা থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে (ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ) না থাকায় বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের ব্লকে বিনিয়োগ করাকে ‘অন্ধকারে কোটি ডলারের জুয়া’ বলে মনে হয়েছে।

আমদানি লবি ও আড়াই লাখ কোটি টাকার খেসারত

বিগত বছরগুলোতে দেশের অভ্যন্তরে বা সমুদ্রে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির দিকেই নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ ছিল বেশি। এলএনজি আমদানির জন্য স্পট মার্কেট এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দেদার খরচ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে একটি শক্তিশালী ‘আমদানি লবি’ বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, যারা নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির কমিশন ও বাণিজ্যে বেশি আগ্রহী ছিল। ফলে দেশীয় অনুসন্ধান সংস্থা ‘বাপেক্স’ বা পেট্রোবাংলাকে সমুদ্রে নামানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। বিগত এক দশকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় দু’টি ক্ষত হলো- বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অলস বসিয়ে রেখে বিপুল অঙ্কের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (ভর্তুকি) প্রদান। বিভিন্ন জাতীয়-আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এবং পেট্রোবাংলা ও পিডিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে গত এক দশকের (২০১৬-২৬) খরচের একটি ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায় :

অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে গত ১০ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ দিতে হয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮ সাল থেকে শুরু করে গত ৮ বছরে এলএনজি আমদানিতে (বিশেষ করে ২০২২-২৪ সালের আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের চড়া মূল্যসহ) সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

এর ফলাফল হলো- এই দুই খাতে গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) চলে গেছে, যার বেশির ভাগই পরিশোধ করতে হয়েছে মূল্যবান ডলারে।

২০% অর্থ অনুসন্ধানে দিলে কী হতে পারত

গভীর ও অগভীর সমুদ্রে বা স্থলভাগে একটি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন করতে গড়ে ৮০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা) খরচ হয়। যদি গত ১০ বছরের মোট অপচয়ের মাত্র ২০% অর্থ (অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকা বা ৪.৫ বিলিয়ন ডলার) নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে ফ্রন্ট-লাইন ফান্ড হিসেবে বরাদ্দ করা হতো, তবে দেশের জ্বালানি মানচিত্র বদলে যেত:

৫০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে সমুদ্র ও স্থলভাগে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি উচ্চপ্রযুক্তির অনুসন্ধান কূপ খনন করা সম্ভব ছিল। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ৩ থেকে ৪টি অনুসন্ধান কূপে একটি সফল গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে (সাফল্যের হার ২৫%-৩০%)। সেই হিসাবে মাঝারি ও বড় মিলিয়ে অন্তত ৫টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে পারত।

পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে যদি ন্যূনতম পাঁচ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যেত (যা দেশের বর্তমান মজুদের প্রায় সমান), তবে আন্তর্জাতিক বাজারে (প্রতি এমসিএফ ১০ ডলার হিসাবে) সেই গ্যাসের বর্তমান মূল্য দাঁড়াত প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ছয় লাখ কোটি টাকা।

বিগত ১০ বছরে এলএনজি ও ক্যাপাসিটি চার্জে অপচয় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর ২০% ৫০ হাজার কোটি টাকা অনুসন্ধানে ব্যয় করা হলে ছয় লাখ কোটি টাকার গ্যাস পাওয়া যেত।

২০২৬ সালের চ্যালেঞ্জ : সমাধান কোন পথে

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম যখন আকাশচুম্বী হয় এবং ডলার সঙ্কটে দেশের অর্থনীতি কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন দেরিতে হলেও সরকারের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে পিএসসি সংশোধন করে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে যুক্ত করার পর মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট এক্সনমোবিল এবং শেভরন বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে কাজের আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে পেট্রোবাংলার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে শুরু হওয়া দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, চুক্তি সই এবং প্রাথমিক জরিপ শেষ করে গভীর সমুদ্রে প্রথম পরীক্ষামূলক কূপ খনন করতে ২০২৬-২৭ সাল পার হয়ে যাবে। আর যদি সেখানে গ্যাসের সন্ধান মেলেও, তবে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে এনে কারখানায় পৌঁছাতে ২০৩০ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

এই হিসাব ও বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে বিদেশ থেকে তৈরি গ্যাস আমদানি করা এবং ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে টাকা দেয়া ছিল একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধ। ৫০ হাজার কোটি টাকা সঠিক সময়ে অনুসন্ধানে খরচ করলে বাংলাদেশ আজ ছয় লাখ কোটি টাকার গ্যাসের মালিক হতে পারত।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়