নতুন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো হলেও বছরের পর বছর ঝুলে থাকা প্রকল্পের জট কাটছে না। একদিকে নতুন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো শেষ না হওয়ায় পুরনো প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে সময় ও ব্যয়ও। পরিকল্পনা কমিশনের এডিপি নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ১০৮টি। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ৭০টি। তবে একই সময়ে ৩৭৭টি ‘ক্যারিওভার’ প্রকল্প, ৪৬৮টি সময় বাড়ানো প্রকল্প এবং ৪৭টি ১০ বছরের বেশি পুরনো প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ফলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে নতুন প্রকল্প যুক্ত হলেও পুরনো জট কাটানোর চ্যালেঞ্জ বহাল রয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় এটি ৭০ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বাস্তবায়নের এমন ধীরগতির মধ্যেই বড় আকারের নতুন এডিপি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
এডিপি অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ১০৮টি প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ৭০টি। আগের অর্থবছরে নতুন প্রকল্প ছিল মাত্র ২৬টি। যদিও নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মোট বরাদ্দে এসব প্রকল্পের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে চলমান প্রকল্পের সংখ্যা ২৫৮টি, সমাপ্তির অপেক্ষায় থাকা প্রকল্প ৪০৩টি এবং ক্যারিওভার প্রকল্প ৩৭৭টি। ব্লক বরাদ্দ ও বিশেষ উন্নয়ন সহায়তার অংশও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৪০৩টি প্রকল্প নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথা। এছাড়া আগের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া আরও ৩৭৭টি ক্যারিওভার প্রকল্প রয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরেই মোট ৭৮০টি প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরিকল্পনা কমিশন সম্ভাব্যভাবে মাত্র ২৩১টি প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। অর্থাৎ বরাদ্দ, বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এডিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বৃদ্ধি এখনো বড় সমস্যা। বর্তমানে বিনিয়োগধর্মী ৯৭৬টি প্রকল্পের গড় বয়স ৫ দশমিক ৭ বছর। এর মধ্যে ৩২২টি প্রকল্পের বয়স ৬ থেকে ১০ বছর এবং ৪৭টি প্রকল্প ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রায় ৪৮ শতাংশ প্রকল্প এক থেকে চারবার পর্যন্ত সংশোধন করা হয়েছে। সময় বাড়ানো প্রকল্পের সংখ্যা আগের অর্থবছরের ৪৬৩টি থেকে বেড়ে ৪৬৮টিতে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়বার সময় বাড়ানোর ঘটনা এক বছরে ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
এডিপিতে প্রতীকী বরাদ্দের প্রবণতাও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে ৭৭টি প্রকল্পে এক লাখ টাকা বা তার কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট প্রকল্পের প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এমন প্রকল্প ছিল ৪৫টি। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই তালিকাভুক্ত প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৬৩টি। বিদেশি অর্থায়নের জন্য অপেক্ষমাণ অননুমোদিত প্রকল্প রয়েছে ১৭৯টি। পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্প দীর্ঘদিন তালিকায় থাকলেও বাস্তবায়নে যেতে পারে না, ফলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়।
খাতভিত্তিক বরাদ্দে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এখনো সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে, যদিও আগের বছরের তুলনায় এর অংশ কমেছে। শিক্ষা খাতের অংশ বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং আবাসন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এই পাঁচ খাত মিলেই মোট এডিপির ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে।
বছরের পর বছর চলমান আট মেগা প্রকল্প!
বরাদ্দ বৃদ্ধির দিক থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে। শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ বেড়েছে ২১ হাজার ৩৪ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে বেড়েছে ১৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ কমেছে ৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এছাড়া আবাসন, ধর্ম ও সংস্কৃতি খাতেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এডিপির অর্থায়নে সরকারি তহবিলের পাশাপাশি প্রকল্প সহায়তার ওপরও নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। মোট এডিপির ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থ আসবে প্রকল্প সহায়তা থেকে। এর মধ্যে শুধু দুটি প্রকল্পই মোট প্রকল্প সহায়তার প্রায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবহার করবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প একাই প্রকল্প সহায়তার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্প ৫ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহার করবে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এডিপির শীর্ষ ২০টি মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৮ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় ২০ শতাংশ। এর মধ্যে আটটি প্রকল্প চলতি অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো শেষ হওয়া কঠিন বলে বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। বিশেষ করে মেট্রোরেল লাইন-১, ঢাকা-সিলেট করিডোর, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, দক্ষতা উন্নয়ন ও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি এখনো লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়েছে।
এদিকে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিবীক্ষণ, ত্রৈমাসিক অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে। তবে জমি অধিগ্রহণ, বৈদেশিক অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প সংশোধনের কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি পুরোনো প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে না পারলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়তেই থাকবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটিয়ে সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটাল করতে বড় পদক্ষেপ সরকারের
সিপিডি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আকারে বড় হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পুরোনো দুর্বলতাগুলো এখনো কাটেনি। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ১০৮টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন এক হাজার ৬৩টি প্রকল্প তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং বিদেশি অর্থায়নের প্রত্যাশায় আরও ১৭৯টি প্রকল্প রাখা হয়েছে। এছাড়া মাত্র এক লাখ টাকা বা তার কম প্রতীকী বরাদ্দ পেয়েছে ৭৭টি প্রকল্প, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বিনিয়োগধর্মী ৯৭৬টি প্রকল্পের গড় বয়স ৫ দশমিক ৭ বছর। এর মধ্যে ৩২২টি প্রকল্প ৬ থেকে ১০ বছর এবং ৪৭টি প্রকল্প ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস্তবায়নাধীন। প্রায় অর্ধেক প্রকল্প একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে এবং সময় বাড়ানো প্রকল্পের সংখ্যাও বেড়েছে। শীর্ষ ২০টি মেগা প্রকল্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সেগুলো শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের এডিপি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেই প্রকল্প নেওয়া হয়। ফলে বাস্তবায়নের সময় নানা জটিলতা তৈরি হয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি সময় লেগে যায়। এতে শুধু প্রকল্প শেষ হতে দেরি হয় না, ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আবার যেসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার কথা, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় অনেক প্রকল্প পরবর্তী অর্থবছরে গড়িয়ে যায়। এতে পুরনো প্রকল্পের জট আরও বাড়ে। উৎস: ঢাকা মেইল