দেশের বাজারে দিন দিন বাড়ছে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের দৌরাত্ম্য। প্রসাধনী, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, শিশুখাদ্য, পোশাক, এমনকি ব্র্যান্ডেড দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য—সব ক্ষেত্রেই এখন নকল পণ্যের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে উৎসব মৌসুম, অনলাইন বাণিজ্যের বিস্তার এবং বাজার তদারকির দুর্বলতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নকল পণ্যের কারণে একদিকে যেমন ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বৈধ শিল্প ও ব্র্যান্ডগুলোর সুনাম।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অধিকাংশ ভোক্তা কম দামে কিনতে গিয়ে না বুঝেই নকল পণ্য কিনছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে আসল ও নকলের পার্থক্য এতটাই সূক্ষ্ম যে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, দেশে এমন কোনও পণ্য নেই, যার নকল বাজারে পাওয়া যায় না। বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশে কোনও পণ্য কিনতে গেলেই ক্রেতাদের ভাবতে হয় সেটি আসল নাকি নকল। অথচ বিদেশে এ ধরনের শঙ্কা থাকে না।
তিনি আরও বলেন, দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলেও নকল পণ্যের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার ব্যবহারের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
সফিকুজ্জামান উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু সেখানে নিম্নমানের বা নকল বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করলে অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাপ সহ্য করতে না পেরে আগুন লাগার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এতে শুধু প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিই নয়, শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়ে।
কোন কোন পণ্যে বেশি নকল?
বাজার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নকল হচ্ছে—
- প্রসাধনী ও স্কিন কেয়ার পণ্য
- শিশুখাদ্য ও দুধ
- ভোজ্যতেল, ঘি, মসলা ও মধু
- মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ
- ব্র্যান্ডেড পোশাক ও জুতা
- ওষুধ ও স্বাস্থ্যসামগ্রী
- পারফিউম ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা পণ্য
- অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন বিদেশি পণ্য
রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক দোকান এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব নকল পণ্য সহজেই বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সাম্প্রতিক অভিযানে দেশের প্রসাধনী বাজারে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির পরীক্ষায় বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৩৪টি আমদানিকৃত কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্যের মধ্যে ১৭টিকেই ভেজাল, অনুমোদনহীন অথবা মানহীন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষাধীন আমদানি করা প্রসাধনীর প্রায় অর্ধেকই অনিরাপদ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নকল ও ভেজাল প্রসাধনী শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিই তৈরি করছে না, একই সঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলছে দেশের অর্থনীতিকেও। বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার প্রসাধনী বাজারের ৪০ শতাংশই এখন নকল পণ্যের দখলে। এর ফলে প্রতিবছর সরকার অন্তত তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরা ১৩ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কেন বাড়ছে নকল পণ্যের ব্যবসা?
বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি কারণে নকল পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক ভোক্তা কম দামের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এ সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
দ্বিতীয়ত, অনলাইন বাণিজ্যে যথেষ্ট নজরদারি না থাকায় ভুয়া ব্র্যান্ড বা কপি পণ্য সহজেই বাজারজাত করা যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, সীমান্তপথে অবৈধ আমদানি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক নিম্নমানের পণ্য দেশে প্রবেশ করছে।
চতুর্থত, ভোক্তাদের সচেতনতার ঘাটতি এখনও বড় সমস্যা। অধিকাংশ ক্রেতাই পণ্যের লেবেল, মেয়াদ, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বা অনুমোদন যাচাই করেন না।
নকল পণ্য চেনার উপায় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে সহজেই অনেক নকল পণ্য শনাক্ত করা সম্ভব।
১. অস্বাভাবিক কম দাম
বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে পণ্য বিক্রি হলে সতর্ক হতে হবে। জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে পাওয়া গেলে সেটি নকল হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
২. মোড়ক ও প্রিন্টিং খেয়াল করুন
আসল পণ্যের মোড়ক সাধারণত নিখুঁত ও মানসম্মত হয়। নকল পণ্যে বানান ভুল, ঝাপসা লেখা, নিম্নমানের প্রিন্টিং বা রঙের পার্থক্য দেখা যায়।
৩. কিউআর কোড বা বারকোড যাচাই
অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এখন কিউআর কোড বা ইউনিক কোড ব্যবহার করছে। মোবাইল ফোনে স্ক্যান করে পণ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়।
৪. উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্য
পণ্যের উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, ব্যাচ নম্বর এবং আমদানিকারকের তথ্য স্পষ্টভাবে লেখা আছে কি না, তা দেখতে হবে।
৫. অনুমোদনের সিল
খাদ্যপণ্যে বিএসটিআই, ওষুধে ডিজিডিএ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
৬. গন্ধ, রং ও গুণগত পার্থক্য
প্রসাধনী, পারফিউম বা খাদ্যপণ্যে অস্বাভাবিক গন্ধ, রং বা স্বাদ থাকলে সতর্ক হতে হবে।
৭. নির্ভরযোগ্য দোকান থেকে কেনাকাটা
বিশ্বস্ত শোরুম, অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্র বা পরিচিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য কেনা নিরাপদ।
অনলাইনে প্রতারণা আরও বাড়ছে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায় এখন নকল পণ্যের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অনেক পেজে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। ছবি একরকম হলেও হাতে পাওয়ার পর পণ্যের মান সম্পূর্ণ ভিন্ন পাওয়া যাচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তারা অগ্রিম টাকা পরিশোধ করার পর প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। আবার রিটার্ন সুবিধা না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অভিযোগ জানানোর সুযোগ সীমিত থাকে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে
চিকিৎসকরা বলছেন, নকল প্রসাধনী, ভেজাল খাদ্য ও নিম্নমানের ওষুধ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। নকল স্কিন কেয়ার পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে ত্বকে অ্যালার্জি, সংক্রমণ এমনকি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
একইভাবে নকল ওষুধ রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে জটিলতা বাড়াতে পারে। শিশুখাদ্যে ভেজাল থাকলে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশের ওষুধ খাতে। যে ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষার কথা, সেই ওষুধই এখন অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাজারে নকল অ্যান্টিবায়োটিক, মেয়াদোত্তীর্ণ ও দূষিত স্যালাইন, ভেজাল সিরাপ এবং নিম্নমানের উপাদানে তৈরি ওষুধ ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র ময়দা, চকপাউডারসহ নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগের ট্যাবলেট তৈরি করছে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো স্পর্শকাতর রোগের নকল ওষুধও বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। ফলে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে অনেক রোগীর শারীরিক জটিলতা আরও বাড়ছে এবং ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের জীবন।
বৈধ ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত
নকল পণ্যের কারণে বৈধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আসল পণ্যের মান ধরে রাখতে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেশি হলেও নকল পণ্য কম দামে বাজার দখল করছে। এতে সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজার তদারকি জোরদার করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা কৌশল বদলে দ্রুত নতুন উপায়ে বাজারে প্রবেশ করছে। তাই শুধু অভিযান নয়, ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত নজরদারি, অনলাইন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সচেতনতাই বড় প্রতিরক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল পণ্যের বিস্তার ঠেকাতে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাজার তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে।
সামান্য অসতর্কতা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই কম দামের প্রলোভনে না পড়ে যাচাই-বাছাই করে পণ্য কেনাই এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন