শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২২, ০৩:৩১ দুপুর
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২২, ০৩:৩১ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে থানায় জিডি

চা শ্রমিক

আব্দুল বাছিত বাচ্চু, মৌলভীবাজার: ভেস্তে গেছে সমঝোতার সকল চেষ্টা। মালিকরা দিতে চান সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি  ৩০০ টাকা। উভয় পক্ষের এমন কঠোর অবস্থানের কারণে বুধবার ঢাকায় মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে ৬ ঘণ্টায় এক ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা সারাদেশে সর্বাত্মক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এমনকি বৃহস্পতিবার (১৮ আগস্ট) আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন চা শ্রমিক ইউনিউনের সহ সভাপতি পঙ্কজ কন্দ। এতে দ্রুত পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। পাশাপাশি শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৪টি চা বাগের পক্ষে থানায় জিডি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ চা শ্রমিকদের ধর্মঘট অবরোধের ফলে কোটি কোটি টাকার চায়ের পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে মঙ্গলবার জুড়ী উপজেলার ধামাই চা বাগানে কর্তৃপক্ষ নিজেরা বিকল্প ব্যবস্থায় চা- কল চালাতে গেলে সাধারণ শ্রমিকরা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা ও পুলিশের অফিসার ইনচার্জ  ওসি সঞ্জয় চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। 

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা আমাদের সময় ডট কম কে বলেন গত ২ দিন আমাদের আলোচনা ও আন্দোলন এক সাথে চলেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সারাদেশে ২৪০টি চা বাগানে ধর্মঘট শুরু হয়েছে। বিকেলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

মঙ্গলবার শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন সচলায়তনের শ্রীমঙ্গলে এসে বিষয়টি সুরহা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ৩০০ টাকা মজুরীর বিষয়টি আলোচানা করতে রাজি না হওয়ায় বৈঠকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর  শ্রম অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ডাকেন মহাপরিচালক। 

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শ্রম অধিদপ্তরে বিকেলে আনুমানিক সাড়ে ৫টায় এই বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় রাত সাড়ে ১১টায়। দুই দফায় ৬ ঘণ্টা অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদ চা শ্রমিকদের মজুরী ১২০ টাকার স্থলে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা করতে রাজি হন। এর পরপরই বাংলাদেশ চা  শ্রমিকনেতারা ঘোষণা দিয়েছেন দাবি না মানা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।

বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকার শ্রম অধিদপ্তরের কার্যালয়ে চা-বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদ ও চা-শ্রমিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের নিয়ে এ সভায় দুই পক্ষের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। বিরতি দিয়ে দুই দফা চলে বৈঠক।

বৈঠকে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরী, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ৭ ভ্যালির সভাপতি, সংগঠনের নির্বাহী উপদেষ্টা রামভজন কৈরী, সহসভাপতি পংকজ কন্দ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল, অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দি, মনু ধলাই ভ্যালির সম্পাদক নির্মল দাশ পাইনকা এবং বাংলাদেশীয় চা সংসদের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা ‘আমাদের সময় ডটকম’ কে বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবিদাওয়া মালিকপক্ষ ও সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। মালিকপক্ষ দৈনিক মজুরি ১৪০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা সেটা মানিনি। সারাদেশের চা-শ্রমিকেরা আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আমাদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। আমরা বৃহস্পতিবার  বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করব।’

এদিকে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের চলমান ধর্মঘটের মধ্যে শ্রীমঙ্গলের ৪টি চা-বাগানের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে কাঁচা চা-পাতা নষ্ট হচ্ছে বলে জিডিতে অভিযোগ করা হয়।

জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ ওসি শামীম আর রশীদ তালুকদার ‘আমাদের সময় ডটকম’কে বলেন, শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা-বাগান, ডিনস্টন চা-বাগান, আমরাইল ছড়া চা-বাগান ও বালিশিরা চা-বাগান—এই চারটি চা-বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা বাদী হয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় রাতে আলাদাভাবে সাধারণ ডায়েরি করেছেন। অভিযোগ করা হয়েছে, ধর্মঘটের ফলে রাজঘাট চা-বাগানের ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৫ কেজি, ডিনস্টন চা কারখানায় ৯৯ হাজার ২৫০ কেজি, বালিশিরা চা কারখানায় ৫০ হাজার ২০৭ কেজি, আমরাইল চা কারখানায় ৫ হাজার ৬৮৩ কেজি কাঁচা চা-পাতা নষ্ট হয়ে গেছে। মূলত আমাদের অবগত করার জন্য এই জিডি করা হয়েছে ।

থানায় জিডি করার বিষয়ে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহী উপদেষ্টা রামভজন কৈরি ‘আমাদের সময় ডটকম’কে বলেন,  এই চা-পাতা নষ্ট হওয়ার পেছনে মালিকপক্ষই দায়ী। আমরা আন্দোলনে যাওয়ার আগে মালিকপক্ষকে মজুরি বাড়ানোর জন্য বলেছি, তারা মানেননি। পরে আমরা টানা চার দিন মাত্র দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেও চা বাগানের সব কাজ করেছি। আমাদের  সঙ্গে তখন মালিকপক্ষ বসলে আজকের ধর্মঘটের প্রয়োজন পড়ত না। মালিকপক্ষ ইচ্ছে করেই কালক্ষেপণ করে চায়ের ক্ষতি করছে।’

চা শমিকদের দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরীসহ বিভিন্ন দাবি দাওয়ার বিষয়ে বুধবার ঢাকায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠক করা হয়। শ্রম অধিদপ্তরের ডিজি খালেদ মামুন চৌধুরী নিজ দপ্তরে বিকেলে এই সভা করেছেন। মঙ্গলবার শ্রীমঙ্গল বিভাগীয় শ্রম দপ্তরে চা শ্রমিকদের সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে কোনো সমাধানে পৌঁছতে না পারায় তিনি ঢাকায় এই সভা আহবান করেছিলেন।

এদিকে মঙ্গলবার কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়। বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ পরিচালকের সম্মেলন কক্ষে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দুই দফার এ বৈঠক চলে। বৈঠকে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডিজি খালিদ মামুন চৌধুরী এনডিসি সভায় সভাপতিত্ব করেন।

দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরীর দাবির কোনো সুরহা না হওয়ায় শ্রমিকরা শ্রম দপ্তরের আন্দোলন স্থগিত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এসময় চা শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে মহাপরিচালক বিষয়টি নিষ্পত্তির লক্ষে বুধবার নিজ কার্যালয়ে আবারও সভা আহবান করে সভা মুলতবি টানেন। 

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা ‘আমাদের সময় ডটকম’কে বলেন, মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত আমাদের সাথে প্রথম পর্বের আলোচনা হয়। কিন্তু আমাদের ৩০০ টাকা মজুরীর দাবি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হননি কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে আগামী ২৩ আগস্ট আলোচনার আশ্বাস দিয়ে  কর্মসূচি স্থগিত করার প্রস্তাব দেন। পরে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। মহাপরিচালকের এমন প্রস্তাব শোনার পর কেউ তা মানতে রাজি হয়নি।

বিজয় হাজরা বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টায় আবার বৈঠক বসলে মহাপরিচালক মহোদয়কে আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেই। এরপর তিনি বুধবার নিজ দপ্তরে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাব দিলে আমরা রাজি হয়েছি। তবে আলোচনার পাশাপাশি আন্দোলন দুটোই চলবে।

এর আগে চা শ্রমিক নেতাদের নিয়ে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) খালেদ মামুন চৌধুরী এনডিসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শ্রীমঙ্গলে বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন। দুই বারে ৪ ঘণ্টা এই সভা চলে।

জানা গেছে, শ্রম অধিদপ্তরের ডিজি খালেদ মামুন চৌধুরী (এনডিসি) ও বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ- পরিচালক (ডিডি) নাহিদ ইসলাম সহ সিভিল ও পুলিশ প্রশাসন এবং  শ্রম দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,  চা শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা রামভজন কৈরি, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নৃপেন পাল, সিলেট সুরমা ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা, সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরাসহ সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভ্যালির সিনিয়র ৩০ জন চা শ্রমিক নেতা প্রথম পর্বের সভায় অংশ নেন। তবে সভার দ্বিতীয় পর্ব অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। উত্তেজিত শ্রমিকদের অনেকে সভায় ঢুকে পড়ে। পরে বুধবার বিকাল ৪টায় ঢাকায়  শ্রম দপ্তরে ত্রিপক্ষীয় সভা আহ্বান করে সভা মুলতবি করা হয়। এসময় কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক মুলতবি হয়ে যায়। পরে চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে কর্মবিরতির আহবান সাধারণ শ্রমিকরা মেনে নেয়নি। ফলে আমরা আন্দোলন ও আলোচনা এক সঙ্গে চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্পাদনা: হ্যাপী

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়