মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও জিআই (গ্যালভানাইজড আয়রন) ফিটিংস বাজারে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাঁচামাল পরিবহণে বাধা তৈরি হয়েছে। এতে চালান বিলম্বিত হচ্ছে, যা নির্মাতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামালের একটি বড় অংশ—বিশেষ করে প্লাস্টিক পাইপ ও ফিটিংস তৈরিতে ব্যবহৃত পলিমার রেজিন এবং জিআই পণ্যের জন্য ব্যবহৃত স্টিল বা গ্যালভানাইজড শিট—আমদানিনির্ভর। এসব কাঁচামালের প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। বর্তমানে ওই অঞ্চল থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ চালান বিলম্বের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামালের দাম ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংঘাতের কারণে শিপিং খরচ বৃদ্ধি, বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট কিছু রুটে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। পাশাপাশি বিমা ব্যয়ও বেড়েছে, ফলে ডেলিভারির সময় আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
এরই মধ্যে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা চাপ অনুভব করতে শুরু করেছেন। উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প সরবরাহকারীর খোঁজ করছে, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
শিল্প মালিকরা জানান, প্লাস্টিক পণ্যের জন্য পিভিসি, পিপিআর ও এইচডিপিই রেজিন এবং জিআই ফিটিংসের জন্য স্টিল শিট ও গ্যালভানাইজড উপকরণ প্রধান কাঁচামাল। এর বেশিরভাগই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান থেকে আসে। এছাড়া গ্যালভানাইজড শিট মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি তুরস্ক থেকেও আমদানি করা হয়। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে সরবরাহ করে।
ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, আগে যেখানে কাঁচামাল আসতে তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগত, এখন তা ছয় থেকে সাত সপ্তাহ লাগছে। এমনকি কিছু চালান আদৌ পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তিনি বলেন, 'এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে খাতটি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে, যা কোভিড সময়ের চেয়েও গুরুতর হতে পারে।' তিনি আরও বলেন, সরবরাহ কমে গেলে কোম্পানিগুলো পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, আমদানির সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'উৎপাদন সচল রাখতে আমরা বিকল্প সরবরাহকারীর কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের চেষ্টা করছি।' তবে বিকল্প উৎস ও রুট ব্যবহারের কারণে খরচ বাড়ছে বলেও তিনি জানান।
সাজান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, অনেক কাঁচামালের দাম ইতোমধ্যে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, 'বেশি দাম দেওয়ার পরেও সময়মতো সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না, যা পুরো সাপ্লাই চেইনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।'
শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসেবে, বাংলাদেশের প্লাস্টিক ও জিআই ফিটিংস বাজারের আকার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাত হাজার কোটি টাকা, যেখানে শতাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তারা আরও জানান, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছিল। নির্মাণ কার্যক্রম বাড়ায় পাইপ ও ফিটিংসের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট সেই পুনরুদ্ধারকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্লাস্টিক ও জিআই ফিটিংস শিল্পটি নির্মাণ খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। আবাসন, অবকাঠামো, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ, গ্যাস সংযোগ এবং কৃষি সেচসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়লে এই পণ্যের চাহিদাও সাধারণত বৃদ্ধি পায়।
সূত্র: দ্য বিসনেস স্ট্যান্ডার্ড