নিজস্ব প্রতিবেদক : চলতি জানুয়ারি মাসে দেশের এলপিজি অপারেটররা যাতে সর্বোচ্চ বেশি পরিমাণে এলপিজি আমদানি করতে পারেন অপারেটরদের সে অনুরোধ করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, অনেক অপারেটরের সঙ্গে কথা বলেছি তারা স্পট মার্কেট থেকে এলপিজি আনার চেষ্টা করছেন। এ মাসে যদি ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি চলে আসে তাহলে বর্তমান সংকট অনেকটা কেটে যাবে। আর অপারেটররা যদি ফেব্রুয়ারি মাসের আমদানিও নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে আসন্ন রমজানে এলপিজি সংকট থাকবে না। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও ‘এনার্জি ও পাওয়ার’ সাময়িকী এর সহযোগিতায় এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব বলেন তিনি।
‘রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জেস ইন দ্য এলপিজি মার্কেট’ শীর্ষক এই আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনার্জি এন্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লাহ এম আমজাদ হোসেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, এলপিজি নীতিমালা সংষ্কার বিষয়ে (বিইআরসির আতওাভুক্ত বিষয়) আমরা বিশ্লেষণ করছি এবং যেখানে যা প্রয়োজন সে অনুযায়ী সংষ্কার করবো। নভেম্বরে ১৭০টি এবং ডিসেম্বরে ২৯টি জাহাজের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এলপিজি আমদানি বাধাগ্রস্থ হয়। বিশ্বের বড় আমদানিকারকদের জন্য আমাদের অপারেটরদের মতো ছোট আমদানিকারকরা আমদানির সুযোগ কম পাচ্ছেন। ২০২৪ সালের শেষের তিনমাসের তুলনায় ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে ১ লাখ ৬৩ হাজার টন কম এলপিজি আমদানি হয়। এই সময় লিমিট না থাকার পরও বেশ কিছু অপারেটর তাদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করে এবং এজন্য তাদের আটকানো হয়নি। এলপিজি অপারেটরদের বিইআরসিতে ১৯টা কাগজ জমা দিতে হয়। আমি চেষ্টা করেছি একে ৪টিতে নামিয়ে আনার। এলপিজিতে লাইন্সেস ভোগান্তি কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে বসবো আমরা।
বাংলাদেশে এলপি গ্যাস ব্যবহারের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২২ সালে ১২ লাখ ৯০ হাজার টন, ২০২৩ সালে ১২ লাখ ৮০ হাজার টন, ২০২৪ সালে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন, ২০২৫ সালে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন এলএনজি ব্যবহার হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ তিন মাসের (অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর) সঙ্গে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে এক লাখ ৬৩ হাজার টন কম আমদানি হয়েছে। নভেম্বরের ১৮ তারিখে ২০ হাজার টন এলপিজি নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি এসে ফিরে গিয়েছে। ফলে নভেম্বরে ওই জাহাজ যোগ হলে ১ লাখ ২৫ হাজার টন আমদানি হতো।
এলপিজি আমদানিতে পরিমাণ সীমা কোনো সমস্যা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, লিমিট ক্রস করে যারা আমদানি করেছে তাদেরকে আটকানো হয়নি। আইগ্যাস নামের একটি কোম্পনির লিমিট এক লাখ টন হলেও গত বছর তারা এক লাখ ৮৩ হাজার টন আমদানি করেছে। ওমেরার লিমিট তিন লাখ থাকলেও আমদানি করেছে তিন লাখ ২০ হাজার টন, মেঘনার লিমিট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার টন, আমদানি করেছে ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ডেলটা এলপিজির অনুমতি ছিল ৬০ হাজার টন, আমদানি করেছে ৮০ হাজার টন।
তিনি বলেন, রেগুলেটরি সংস্কারের বিষয়ে বিইআরসি আন্তরিক, মানুষের জন্য সহজ করতে কাজ করেছি। এখানে এসে দেখলাম লাইসেন্সের জন্য ১৯টি কাগজ লাগে, আমরা আলোচনা করেছি ১৩টি হলেও চলে। আমরা ৪টি কাগজে নেমে আসতে পারি, পরিবেশ, বিস্ফোরণ ও ফায়ার সার্ভিসের কাগজগুলো আমরা না দেখলেও চলে। বিইআরসি ফি ১৮ লাখ থেকে কমিয়ে ১০ লাখ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে দুই বছর আগে, এখনও মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এলপিজি খাতে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এলপিজি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে একাধিক সংস্থা থেকে লাইন্সেস নিতে হয়। ব্যবসা করতে গিয়ে যদি এতগুলো জায়গা থেকে পারমিশন নিতে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে হয় তবে এটি এই খাতের বড় বাঁধা। এই খাতের জন্য মোট ২৬টি আলাদা অনুমতি নিতে হয়। বছরে একটি অপারেটরের এলপিজির লাইন্সেস ও অন্যান্য ফি বাবদ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার উপর লাগে। এটিও এ খাতে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জ। এলপিজি অপারেশনে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে লিকেজ ইস্যুতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি নজরদারিতে রাখা।
এলপিজি নিয়ে সিঙ্গেল রেগুলেটরি সংস্থার ব্যবস্থা করতে হবে। এলপিজির জন্য বিশেষ কোন নীতিমালা নেই। এক সময় দেশে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টন এলপিজি আমদানি হতো। এখন ১৬ লাখ টন পর্যন্ত আসছে। এটি বড় একটি ব্যবসা খাত হতে যাচ্ছে। এজন্য বিশেষ নীতিমালা থাকতে হবে। লিকেজ পরীক্ষা প্রতিবছর হলেও লাইন্সেসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতি পাচ বছর পর দেওয়া যেতে পারে। নীতিমালা সংস্কার না করা হলে অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন। এই ব্যবসায় প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। এই ব্যবসা ভালোভাবে চালাতে নিয়মিত বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু এলপিজি নিয়ে ব্যবসায়ীরা এত ভোগান্তিতে পড়লে তা এই খাতে বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচক হবে না। যেহুতু আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস কমে যাচ্ছে এজন্য এলপিজির উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এই মুহুর্তে অনেক খাতেই আমাদের বিকল্প জ্বালানি হচ্ছে এলপিজি।
জ্বালানি বিভাগের যুুগ্মসচিব এ, কে, এম ফজলুল হক বলেন, এলপিজি খাতে এখন তিনটি সমস্যা। এর দাম, এর নিরাপত্তা ইস্যু এবং মার্কেট ডিসওর্ডার। বর্তমানে মাত্র ৫ থেকে ৬টি অপারেটর এলসি খুলে এলপিজি আমদানি করতে পারছে। এ খাতে ভালো ব্যবস্থাপনার জন্য এলপিজির জন্য বিশেষায়িত নীতামালা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
লোয়াব প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, লোয়াব-এর ৫ জন সদস্যের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এক বছর আগে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। এক বছর পরে মন্ত্রণালয় থেকে জানালো হলো নীতিমালায় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আসে না। বর্তমানে এলপিজির সংকট ও দামবৃদ্ধির জন্য লোয়াবকে দায়ী করা যাবে না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, এলপিজি ৪০ হাজার কোটি টাকার শিল্প। এর গ্রাহক সংখ্যা দেড়কোটি। কিন্তু এত বছর পরেও একে অত্যাবশকীয় পণ্যে পরিনত করতে পরিনি। ক্যাবের পক্ষ থেকে আমি দাবি তুলেছি একে অত্যাবশকীয় পণ্যে পরিণত করার জন্য। এতে এলপিজি খাতকে আরও সুশৃঙ্খল করে আনা যাবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুজ্জামান সরকার, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. আবুল হাসান, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোটারর্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) এর সভাপতি মো. শামীম জাহাঙ্গীর, নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজসহ এলপিজির বিভিন্ন অপারেটর।