শৈশবেই বাবাকে হারিয়ে উপার্জনের পথে নামতে হয় ১৩ বছরের হাসান আলীকে। লেগুনার হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করলেও মাস দুয়েকের মধ্যে তাকে লাইনম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। তার প্রধান কাজ হয়ে ওঠে টাকা তোলা। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে হাসান। একসময় এলাকায় তার পরিচিতি হয়ে ওঠে চাঁদাবাজ হিসেবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য চার হাজারের বেশি। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন
তাদের অনেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও সহিংসতাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। নজরদারি ও বিভিন্ন অভিযানে অনেককে চিহ্নিত করা হলেও বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের একটি অংশ বারবার একই ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য অন্তত ৪ হাজার ২৫০ জন। সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে ঢাকা মহানগরে। এখানে ১৫৯টি গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার বাইরে সক্রিয় রয়েছে ২২৭টি গ্যাং, যেগুলোর সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরে—৯৮টি। এছাড়া সিলেট মহানগরে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে সাতটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলায় রয়েছে আরো ৮১টি কিশোর গ্যাং।
এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই, হামলা, মাদক সেবন ও কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘাতে জড়ানোর পাশাপাশি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়।
চলতি বছরের এপ্রিলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় করা মামলার এজাহারে ২১ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরো ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়। এর আগে মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী ও বেড়িবাঁধ এলাকায় সক্রিয় ‘ব্রেভ ডেঞ্জার স্ট্রং কিং’ (বিডিএসকে) নামের একটি গ্যাংয়ের সদস্যদের চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, মাদক সেবন ও মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তৎকালীন র্যাবের ভাষ্য, গ্যাংটির সদস্যরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করত। আরেক ঘটনায় র্যাব জানিয়েছিল, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একটি গ্যাংয়ের সদস্যরা একাকী পথচারীদের ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিত এবং চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়াত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার শুরু হয় আড্ডা, মাদক সেবন, ছোটখাটো চুরি কিংবা মারামারি দিয়ে। পরে সংঘবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা তৈরি হয় এবং হাতে আসে দেশীয় অস্ত্র ও মাদক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও দুঃসাহস প্রদর্শনের প্রবণতাও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধে উৎসাহ জোগায়। এসব গ্যাংয়ের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা কিশোরদের অপরিপক্বতা ও আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রভাব সমাজেও পড়ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের কিশোরদের একটি অংশ ক্রমেই অপরাধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক সেবন ও কারবার, চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক দিকনির্দেশনা, নজরদারি ও সহায়তার অভাবে অনেক কিশোর অপরাধের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। তাদের অসহায়ত্ব ও সামাজিক অনগ্রসরতাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ও অপরাধী ব্যক্তি কিশোরদের সংগঠিত করে গ্যাং গড়ে তুলছে এবং বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু কিশোরদের গ্রেফতার বা আইনের আওতায় আনার মধ্যে সমাধান সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। যারা তাদের ব্যবহার করে গ্যাং গড়ে তুলছে ও অপরাধে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কাউন্সেলিং, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরিবারভিত্তিক তদারকি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই তাদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। চিহ্নিত গ্যাং ও তাদের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’