’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে দেশের ৮টি কারাগার ভেঙে পালানো ৭ শতাধিক বন্দির এখনো হদিস মেলেনি। তালিকায় থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯৮ জঙ্গির মধ্যে ৭০ জন এখনো অধরা। অভিযোগ উঠেছে- এতদিন আরসা, জেএমবি, হুজি-বি, এটিবিসহ, হিজবুত তাহ্রীর, জামা’আতুল মুজাহিদীনসহ বিভিন্ন নামে আলাদা আলাদা সংগঠন পরিচালনা করে আসছিল এসব জঙ্গি। কিন্তু বর্তমানে জেল ফেরারি এসব জঙ্গি আত্মগোপনে থেকে মার্শাল-আর্টসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আড়ালে সদস্য সংগ্রহ করে প্রকাশ্যে ও অনলাইনে জঙ্গি তালিম দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে দেশে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে তারা। ক’দিন আগে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় ৮টি বিমানবন্দরসহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করে সরকার। নজর রাখা হচ্ছে কারা অভ্যন্তরে থাকা বন্দিদের ওপরেও।
কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগারের বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। পালিয়ে যান নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগারের সব বন্দি। বাদ পড়েনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি সেলও। সে সময় কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে ২০২ জন, নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬, শেরপুর কারাগার থেকে ৫শ’, সাতক্ষীরা কারাগার থেকে ৬শ’, কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ জন বন্দি পালিয়ে যান। এর বাইরে জামালপুর কারাগারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেখান থেকে বন্দি পালাতে পারেনি। সবমিলিয়ে দেশের কারাগার থেকে সে সময় ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে যায়। পরে ১ হাজার ৫১৯ জন কয়েদি গ্রেপ্তার ও স্বেচ্ছায় ফিরে এলেও এখনো ৭১৩ জন কয়েদির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে সেই সময় কারাগারগুলো থেকে ৬৭টি অস্ত্র লুট করা হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. জাকির হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমাদের কারাগার থেকে ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট জঙ্গিসহ মোট ২০২ জন আসামি পালিয়ে যায়। তন্মধ্যে অন্তত ৮৮ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিল। সেদিন পালানোর সময় কারারক্ষীদের গুলিতে আরও ৬ জন মারা যান। পালিয়ে যাওয়া কয়েদিদের মধ্য থেকে বিভিন্ন বাহিনীর সহায়তায় এখন পর্যন্ত মোট ৭২ জনকে কারাগারে ফেরাতে সক্ষম হয়েছি।
নরসিংদী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. তারেক কামাল মানবজমিনকে বলেন, ২০২৪ এর ১৯শে জুলাই নরসিংদী কারাগারের মূল গেট ভেঙে ১০ থেকে ১২ হাজার লোক ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর অস্ত্রাগারে থাকা ৮৫টি অস্ত্র ও ৮ হাজার ১৫০টি গুলি লুট করে। ওই সময় নিষিদ্ধ সংগঠনের ৯ জন জঙ্গিসহ কারাগারের সেলে থাকা সব কয়েদি পালিয়ে যায়। তখন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ জনের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৬৪৬ জন আত্মসমর্পণ করেন। আর ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখনো ৯ জঙ্গিসহ ১৪৫ জন পলাতক রয়েছে।
এদিকে ৫ই আগস্ট সাতক্ষীরা কারাগারের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে সব বন্দি পালিয়ে যায়। সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের তৎকালীন জেলার হাসনা জাহান বীথি বলেন, ভেঙে ফেলা ১০টি সেলে অন্তত ৫৯৬ জন কয়েদি ও হাজতি ছিল। তবে পরে অনেক কয়েদি ও আসামি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ এখনো ৪৬ জন পলাতক রয়েছে। কুষ্টিয়া কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১০৫ জন বন্দির মধ্যে ৮৯ জন বন্দি ফিরে আসলেও এখনো ১৬-১৭ জন অধরা রয়ে গেছেন।
এদিকে গত ২৮শে এপ্রিল রাতে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মো. ইমরান চৌধুরী (২৯), মো. মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) ও আবু বক্কর (২৫) নামে ৪ যুবককে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আরসা’ নামে নিজেদের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগ করলেও তাদের আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ ও উদ্ধারকৃত আলামত বিশ্লেষণ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তারা বলেন, প্রথমে গত ২৭শে এপ্রিল চীন পালানোর চেষ্টাকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে কামরাঙ্গীরচর থানাধীন তারা মসজিদ সংলগ্ন কয়লাঘাট সাবানওয়ালার বাড়ির চতুর্থতলার মাঝের ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করে বাকি তিন যুবককে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকা গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাসিন্দা রতন ঢালী (২৯) এবং ফয়সাল হোসেন (২২) নামে দুই বাংলাদেশি গত বছরের ২৬শে সেপ্টেম্বর টিটিপি’র হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে নিহত হয়। বাড়িতে দুবাই যাচ্ছি বলে তারা পাকিস্তানে চলে যায়। সিটিটিআই কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার খিলগাঁওয়ের একটি মেডিকেল সেন্টারে কাজ করা ওই রতন ও ফয়সাল গত বছরের ২৭শে মার্চ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে।
এরপর সেখান থেকে তারা অবৈধভাবে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে টিটিপিতে যোগ দেয়। এ ছাড়াও গত বছরের ২রা জুলাই টিটিপি’র সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাকার সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় নিজ দোকান থেকে ফয়সাল নামে ও ১৪ই জুলাই সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ থেকে শামীন মাহফুজ (৪৮) নামে দু’জনকে আটক করে র্যাব ও পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জঙ্গি নিয়ে কাজ করা ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, সিটিটিসি’র সাইবার ইন্টেলিজেন্স টিম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ইনশাআল্লাহ আমরা এটি মোকাবিলা করতে পারবো।
বিষয়টি নিয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ মানবজমিনকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারাগারগুলো থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিসহ বিচারাধীন মামলার মোট দুই হাজার ২শ’ বন্দি পালিয়ে যায়। যার মধ্যে এক হাজার ৫শ’ জনকে গ্রেপ্তার করে পুনরায় কারাগারে আনা হলেও এখনো প্রায় ৭শ’ বন্দি পলাতক রয়েছে।
উগ্রবাদী হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের সব কারাগারে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিসিটিভি মনিটরিং, সশস্ত্র পাহারা ও ডিউটির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও আটক জঙ্গিদের একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত জোনে রাখা হয়েছে। তাদের প্রতিটি কার্যক্রম কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি কারাগারগুলোয় অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কারা বিশ্লেষক ও সাবেক ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব.) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, গত ৫ই আগস্টের পর কারাগার ভেঙে বন্দি পালানো এবং অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছিল। সেই সুযোগে কিছু জঙ্গিও পালিয়ে যায়, যাদের অনেকেই এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা নিয়ে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
আমার জানামতে, কারা কর্তৃপক্ষও বন্দি থাকা জঙ্গিদের ওপর বাড়তি নজরদারি করছে। তবে জঙ্গিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা- বিশেষ করে টেলিফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে- তা কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় রাখা প্রয়োজন। একইসঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও সতর্কতা জোরদার করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি না হয়।
সূত্র: মানবজমিন