কখনও অন্যের সিম ক্লোন, আবার কখনও মোবাইল হ্যাক করে ব্যাংকিং অ্যাপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া; এর বাইরেও ওয়াইফাই রাউটার ও সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতারণা চালিয়ে আসছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তিন বন্ধু। মাত্র তিন বছরের মধ্যে তারা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছিলেন। সম্প্রতি প্রতারণার অভিযোগে এই তিনজনকে গ্রেফতার করে র্যাব।
গত বছরের ১৭ আগস্ট ডিএমপির একটি থানার পুলিশ পরিদর্শক ক্ষিতিশ চন্দ্র রায় নামে এক ব্যক্তির মোবাইল ফোনে বিকাশ থেকে একের পর এক ক্যাশ আউট মেসেজ আসে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের ব্যালেন্স চেক করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন তার ২ লাখ ২০ হাজার টাকা উধাও হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী ক্ষিতিশ জানান, তার এক ব্যাচমেটের অকাল মৃত্যুতে পরিবারকে সহায়তা করার জন্য অন্য ব্যাচমেটরা বিকাশে টাকা পাঠিয়েছিল। কিন্তু তিনি ভুলবশত একটি ফিশিং লিংকে ক্লিক করায় প্রতারকরা তার ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ক্ষিতিশ। অভিযোগের ভিত্তিতে ডিবি এবং পরে র্যাব কাজ শুরু করে। কয়েক মাসের তদন্তে শতাধিক নম্বর যাচাই করার পর একটি ফোন নম্বর শনাক্ত হয়। সেই সূত্র ধরে র্যাব রাজধানীর শেওড়াপাড়ার একটি ঠিকানায় অভিযান চালায়। ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে তারা দেখে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা এবং রাউটারে ভর্তি রয়েছে ডেটা।
সেই বাসায় ঢুকে অবাক হয় র্যাবের পুরো টিম। ফ্ল্যাটের ভেতরে বাইরে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। রুমের ভেতর রাউটারে ভর্তি। বাড়ির মালিক জানান, স্টুডেন্ট হলেও পেশা ফ্রিল্যান্সিং জানিয়ে বাসায় উঠেছিলেন অভিযুক্তরা।
এ সময় আটক করা হয় সাদমান সাকিব প্রিয়ম, তরিকুল ইসলাম ইমন ও মাহিনুর রহমান মাহী নামের তিন বন্ধুকে। উদ্ধার করা হয় শতাধিক এনআইডি, অর্ধশতাধিক মোবাইল ফোন, প্রিন্টারসহ প্রতারণার বিভিন্ন আলামত। র্যাব জানায়, প্রিয়ম আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইসির ছাত্র, মাহি কিশোরগঞ্জের ইশাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবিতে পড়াশোনা করে, আর ইমন বেকার। তারা ২০২২ সাল থেকে প্রতারণা শুরু করে এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে এতটাই দক্ষ যে ফিশিং লিংক পাঠিয়ে অন্যের ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেয়া তাদের জন্য সামান্য ব্যাপার।
র্যাব ৩ এর উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার সাইদুর রহমান জানান, কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী কিছুটা জ্ঞান পেয়েছে। আরেকজন, যিনি কিশোরগঞ্জের এলএলবিতে পড়েন, তার আইটি বিষয়ে কিছু বিশেষ দক্ষতা আছে। এ দুজনের সংযোগ তৈরি হলে তারা বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে সফল হয়।
তিনি বলেন, এদের সফলতার প্রাথমিক ধাপ ছিল ফেসবুক পেজ ও অনলাইন গেম খেলা। বিশ্লেষণ চালিয়ে তারা শিখে নেয় কীভাবে অন্যের ওটিপি বা মোবাইলের বিকাশ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা যায়, কিউআর কোড ভাঙা যায় এবং রাউটারে ঢুকে তথ্য হাতানো যায়। এছাড়া তারা অনলাইনে বিভিন্ন পণ্যের নাম করে বিকাশ নম্বর এবং কৌশলে এনআইডি সংগ্রহ করত। পরে সেই নম্বর হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নিতো। এখানেই শেষ নয়, তারা ওয়াইফাই রাউটার ও সিসিটিভি ক্যামেরা হ্যাক করত এবং সেখান থেকেও তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ হাতিয়ে নিতো।
সাইদুর রহমান আরও জানান, কখনও তারা নিজেদের নাম পরিবর্তন করত; যেমন, সাদমান খান থেকে সাদমান আহমেদ বা সাদমান আহমেদ প্রিয়ম। তবে এনআইডি নাম্বার অপরিবর্তিত রেখে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট খুলত। এরপর তারা এই তথ্য ব্যবহার করে আরেকটি জালিয়াতি চক্র চালাত, যেখানে মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হতো।
তিনি বলেন, পরে তারা মানুষকে ট্র্যাপে ফেলে তাদের টাকা হাতিয়ে নিতো। বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার বিশ্লেষণ করে, বিশেষ করে ঘরে যেখানে শিশুদের জন্য সিসিটিভি রাখা হয়, সেখান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণা করত।
শিক্ষার্থী হলেও এই তিনজন প্রতারণার টাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। তারা দামি গাড়ি, মোবাইল ব্যবহার করতেন এবং ঢাকায় অর্ধলক্ষ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকতেন। এলাকাবাসী তাদের চলাফেরায় সন্দেহ করতেন।
এলাকাবাসী জানান, মাঝে মাঝে তারা সাদা প্রাইভেটকারে চলাফেরা করতেন এবং তাদের কাছে অনেক মোবাইল ফোন দেখা যেত। এদের কেনাকাটা দেখে বোঝা যেত, তারা দামি জিনিসপত্র কিনছিল। পরে বাড়ির দারোয়ানরা জানান, তাদের হাতে অনেক টাকা-পয়সা রয়েছে। এখন বোঝা যাচ্ছে তারা এভাবে টাকা উপার্জন করছিল। এদিকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ জব্দের জন্য আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সূত্র: সময়টিভি