গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শনিবার রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গত ২২ অক্টোবর নিপীড়নের শিকার শিশুটি ঘটনার বিষয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশের তদন্তেও অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
ওসি আরও বলেন, মাদ্রাসায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা পৃথক মামলায় শিশুটির বাবাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
শিশুকে নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী শিশুটিকে অনৈতিকভাবে স্পর্শ করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
মামলার পর মাদ্রাসার খণ্ডকালীন শিক্ষক মোসলেম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে শিশুটির পরিবারের করা নিপীড়নের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
মাদ্রাসায় হামলা ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ
শিশুটিকে নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও পৃথক মামলা করেছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ক্বারী মো. আলমাছ হোসেন গাজীপুরীর অভিযোগ, একদল লোক মাদ্রাসায় ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর করে।
এজাহারে বলা হয়, শিশুটির অভিভাবক ১০ থেকে ১৫ জনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেন। এ সময় অভিযুক্ত শিক্ষককে স্ট্যাপলার দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। বাধা দিতে গেলে অন্য শিক্ষক ও কর্মচারীরাও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, জমি কেনার জন্য গচ্ছিত রাখা ১৭ লাখ টাকা হামলার সময় লুট করা হয়েছে। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেছেন অধ্যক্ষ।
অভিযোগ অস্বীকার শিশুটির বাবার
তবে মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি। শুক্রবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
রুমি বলেন, ‘আমি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছি, সেটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যাচাই করা হোক। মাদ্রাসায় এত টাকা কীভাবে রাখা হয়, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হোক।’
ঘটনার বিষয়ে অধ্যক্ষকে আগেই জানিয়েছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, তিন দিন আগে অভিযোগ জানাতে গিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। তবে অধ্যক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
শিশুটির বাবা আরও বলেন, ‘আমি আমার সন্তানের বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, মব সৃষ্টি করতে নয়। আমি তো একজন বাবা হিসেবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে গিয়েছিলাম।’
মাদ্রাসায় ভাঙচুরের অভিযোগ প্রসঙ্গে রুমি বলেন, সেখানে একটি কাচের গ্লাস ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে গিয়েছিল এবং এর ক্ষতিপূরণ দিতে তিনি রাজি ছিলেন। তবে ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবি
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ ক্বারী মো. আলমাছ হোসেন গাজীপুরী দাবি করেন, অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক সম্মান শেষ বর্ষে পড়ছেন। তিনি প্রতিদিন তিন ঘণ্টা খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে মাদ্রাসায় ক্লাস নিতেন। তাঁকে উপাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন অধ্যক্ষ।
তাঁর দাবি, পরিকল্পিতভাবে বহিরাগতদের এনে মাদ্রাসায় হামলা চালানো হয়েছে। জমি কেনার জন্য রাখা ১৭ লাখ টাকা লুটের প্রমাণও তাঁদের কাছে রয়েছে।
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা
গত বুধবার দুপুরে শিশুটিকে নিপীড়নের অভিযোগ তুলে তার বাবা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে থাপ্পড় মারেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের করা মামলা এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাল্টা মামলার তদন্ত চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর ও টাকা লুটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।