মনিরুল ইসলাম: সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ চেয়েছেন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির দেওয়া নোট অব ডিসেন্টে (ভিন্নমত) পরিবর্তন চাইলে বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে এসে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে স্পিকারকে নিয়োগের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির অষ্টম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন কমিটির সভাপতি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব দিয়েছেন অনেকে। তবে এ বিষয়ে আলোচনা ও মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংবিধান সংশোধন কমিটি একদলীয় সরকারের ক্ষমতা স্থায়ী করার চেষ্টা করেছিল। গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে গঠিত বর্তমান কমিটির সঙ্গে সেই কমিটিকে এক করে দেখা উচিত নয়।
বিএনপির দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট শিথিল করার বিষয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দল এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব দিতে চাইলে কমিটির বৈঠকে এসে তা জানাতে হবে। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল অংশ নিক, সেটিই তাঁরা প্রত্যাশা করেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বক্তব্য
সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে তাঁরা গণভোটকে স্বীকার করেন। গণভোটে উত্থাপিত প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জনগণের রায়কে তাঁরা সম্মান করেন। ভবিষ্যতে আবার গণভোট হলে তা সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত হবে বলেও জানান তিনি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের আলোচনা
বৈঠকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি—এই চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব উঠে আসে।
এ ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা এবং মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা, বিচারক নিয়োগ আইন প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন কর্মপরিধি নির্ধারণের বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের মনোনয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে অংশ নেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সাকিলা ফারজানা অংশ নেন।
এ ছাড়া দেশের বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকেরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ৪৪ জন সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে তাঁদের লিখিত ও মৌখিক মতামত এবং প্রস্তাব তুলে ধরেন।
সংবিধান সংশোধন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এবং সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করতে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করছে বিশেষ কমিটি।