কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে টানা হয়েছে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন। উদ্দেশ্য ছিল বড় জাহাজ থেকে তেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরে সংরক্ষণাগারে নেওয়া। কিন্তু অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প।
এদিকে প্রকল্পটির ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ৩ হাজার ৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বিপিসি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬৯০ কোটি টাকার কিস্তি দিতে হবে। প্রকল্পের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের জন্য নির্ধারিত ১৮ মাসের গ্যারান্টির মেয়াদও শেষ হয়েছে।
এই প্রকল্পের ফলে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় করা যাবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু অপারেটর নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা করতে পারেনি বিপিসি। বড় ট্যাংকার থেকে তেল খালাসের ১১ দিনের প্রক্রিয়াটি কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে আনারও কথা ছিল এর মাধ্যমে।
৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প দেশের প্রথম সমন্বিত সমুদ্র ও স্থলভিত্তিক তেল সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা। বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল খালাসের ধীর ও ব্যয়বহুল পদ্ধতি বাদ দিতে কক্সবাজারের ২০১৮ সালের আগস্টে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে বিপিসি।
ইন্সটলেশন অব সিঙ্গেল মুরিং (এসপিএম) ব্যবস্থায় বড় ট্যাংকারগুলো সাগরে ভাসমান একটি বয়ার সঙ্গে নোঙর করতে পারে। সেখান থেকে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সরাসরি সমুদ্রের নিচে থাকা পাইপলাইনে পাঠানো হয়। এতে তেল খালাসের সময় কমে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসার কথা।
প্রকল্পে একটি ভাসমান বয়া এবং সমুদ্র ও স্থলভাগ মিলিয়ে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন রয়েছে। একটি পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল এবং অন্যটিতে ডিজেল পরিবহন করা হয়।
এই পাইপলাইনগুলো মহেশখালীর কালারমারছড়ায় থাকা ছয়টি ট্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে তিনটি অপরিশোধিত তেল ও তিনটি ডিজেল সংরক্ষণের জন্য। পরে অন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব জ্বালানি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) পাঠানো হয়।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় চীনের সহজ শর্তের ঋণ, সরকারি অর্থ এবং বিপিসির অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নির্মাণকাজ করেছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)।
বড় পরিমাণে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি মজুতের সুযোগ তৈরি করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করাও ছিল এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সংকট হলে এর প্রভাব কমানোর কথাও ছিল।
কিন্তু এখনো সেই সুফল দিতে পারেনি প্রকল্পটি। চার দফা সময় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
ওই মাসেই প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। গভীর সমুদ্রের জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানোও হয়।
দুই বছরেও নিয়মিত কার্যক্রম নেই
২০২৪ সালের আগস্টে সিপিপিইসিকে প্রকল্প বুঝে নেওয়ার সনদ দেয় বিপিসি। তবে এখনো কোনো অপারেটর নিয়োগ করা হয়নি।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই অপারেটর নিয়োগের ব্যবস্থা না করাও এই বিলম্বের একটি কারণ। শুরুতে প্রকল্পটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিপিপিইসিকে দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথমবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। এতে একজন দরদাতা কারিগরিভাবে যোগ্য হলেও তার দরপত্র বিপিসির প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি ছিল। ফলে দরপত্রটি বাতিল করা হয়।
পরে জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে এসপিএম চালুর লক্ষ্যও ঠিক করা হয়েছিল। তবে সেই সময়সীমাও পার হয়ে গেছে।
এরপর ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। পরে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি করা হয়।
এবার ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের কাগজ কিনলেও জমা দেয় তিনটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো ইন্দোনেশিয়ার পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টাল, সিপিপিইসি এবং হংকংভিত্তিক হিলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (হংকং) লিমিটেড।
দরপত্র মূল্যায়নে বিপিসিকে সহায়তা করেছে আবুধাবিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স।
বিপিসির নথি অনুযায়ী, পাঁচ বছরের জন্য প্রকল্পটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালকে। প্রতিষ্ঠানটির মূল দর ১২৮ মিলিয়ন ডলার।
আয়কর ও মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) চুক্তির মোট মূল্য দাঁড়াবে ১৫৯ দশমিক ১৩৫ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।
জুলাইয়ে বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দেওয়ার অনুমোদন চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠান।
মূল্যায়ন কমিটি পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালকে কারিগরিভাবে যোগ্য এবং সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে বিপিসি এখনো প্রতিষ্ঠানটিকে কাজের আদেশ দেয়নি।
১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে বিপিসির সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি ‘প্রায় চূড়ান্ত’ এবং শিগগিরই তা সম্পন্ন হবে।
চালুর আগেই শেষ গ্যারান্টির মেয়াদ
অপারেটর নিয়োগে দেরি হওয়ায় সিপিপিইসির দেওয়া ১৮ মাসের ত্রুটি-দায়বদ্ধতার মেয়াদ চলতি বছরের আগস্টে শেষ হয়ে গেছে। অথচ এসপিএম এখনো নিয়মিতভাবে চালু হয়নি।
এসপিএমে কোনো ত্রুটি বা যন্ত্রপাতিতে সমস্যা হলে এখন এর মেরামতের খরচ বিপিসিকেই বহন করতে হবে। আগে এসব খরচ সিপিপিইসির দেওয়া গ্যারান্টির আওতায় পড়ত।
এসপিএম পড়ে থাকায় বিপিসি এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল পরিবহন করছে। একই সঙ্গে এমন একটা নতুন স্থাপনার খরচও বহন করছে, যেটা প্রত্যাশিত মাত্রায় সাশ্রয়ী হয়নি।
শুরুতে এসপিএমের মাধ্যমে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব করেছিল বিপিসি। তবে বর্তমানে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
দুই বছর দেরির কারণে সম্ভাব্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা যায়নি বলে হিসাব করেছে বিপিসি। এর প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি আরও বেশি। কারণ এখনো বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে সমুদ্রে তেল স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেছেন, এত বড় সরকারি বিনিয়োগের পরও এসপিএম কেন চালু করা যায়নি, তা তদন্ত করা দরকার। এর জন্য যারা দায়ী, সরকারি নথিতে তাদেরও চিহ্নিত করা উচিত।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তেল খালাসে দেরির কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, সেটাও হিসাব করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, ঠিকাদারের ১৮ মাসের গ্যারান্টির আওতায় থাকা যেসব ত্রুটি মেরামতের খরচ এখন বিপিসিকে বহন করতে হবে, সেগুলোর ব্যয়ও হিসাব করে দায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা উচিত।
শিগগিরই অপারেটর নিয়োগ চূড়ান্ত
এসপিএম পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে তোলা হতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জ্বালানি বিষয়ক যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা বলেন, আগামী বৈঠকেই প্রস্তাবটি কমিটির সামনে তোলা হতে পারে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সর্বশেষ দরপত্রে এসপিএম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পের্তামিনাকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের জন্য পের্তামিনার সর্বশেষ দর প্রায় ১২৮ মিলিয়ন ডলার।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার