বগুড়ার একটি ছোট কারখানায় প্রতিদিন আগুনের তাপে লোহা গলিয়ে ধাতু তৈরি করা হয়; সেই ধাতু ঢালাইয়ের পর হয়ে ওঠে কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ, সেচপাম্পের অংশ বা ছোট ইঞ্জিনের পিস্টন কিংবা গিয়ার।
এসব যন্ত্রাংশ তৈরির পুরনো পদ্ধতি বদলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোয় একদিকে যেমন আয় বেড়েছে, তেমনি কমছে কালো ধোঁয়া। পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
‘সরকার মেটাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের এই কারখানার মালিক মো. শিহাব উদ্দিন সরকার ২০১৫ সালে যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন এই কাজ করার জন্য কারখানায় প্রধান উপকরণ ছিল একটি কয়লাচালিত চুল্লি, যাকে বলা হয় কাপোলা ফার্নেস।
সেই চুল্লিতে লোহা গলানোর জন্য তখন দরকার হত স্তূপ স্তূপ কয়লা। চুল্লি জ্বালানোর পর কারখানাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত কালো ধোঁয়া আর ছাই। তার মধ্যেই কাজ করতেন শ্রমিকেরা।
তাতে উৎপাদন হত ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে বাড়তি খরচ, কাঁচামালের অপচয় আর পরিবেশদূষণ চলত সমান্তরালে।
শিহাব উদ্দিনের ভাষায়, তখন হিসাব মিলত না। কয়লার দাম বাড়ত। যত ভালোভাবেই কাজ করা হোক, কিছু ধাতু নষ্ট হতই। আর চিমনি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ধোঁয়ার হিসাব তো খাতায় লেখা হয় না।
সেখান থেকে কীভাবে পরিবর্তন এল? প্রশ্ন করতেই সে গল্প শোনালেন শিহাব।
তিনি বলেন, বদলটা শুরু হয় ২০২৪ সালে। একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। বিষয় ছিল সহজ একটি ধারণা দেওয়া। যেখানে কম কাঁচামাল আর কম জ্বালানি খরচ করে বেশি ও ‘ক্লিন’ বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদন সম্ভব।
প্রকৌশলের ভাষায় একে বলে ‘রিসোর্স এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন’ বা আরইসিপি। কিন্তু তার কাছে বিষয়টি আরও সহজ ভাষায় ধরা দেয়। তিনি মাথায় নেন, এর মাধ্যমে একই কাজ করা যাবে কম খরচে, কারণ এক্ষেত্রে ধাতু নষ্ট হওয়ার মাত্রা কমবে।
প্রশিক্ষণের পর তার কারখানায় বসানো হয় নতুন ধরনের একটি চুল্লি, যার নাম ইনডাকশন ফার্নেস।
এই চুল্লিতে কয়লা পোড়াতে হয় না বরং বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশের মাধ্যমে সরাসরি ধাতু গলানো হয়।
সহজ ভাষায় বললে, আগুন জ্বালাতে কয়লার বদলে এখানে কাজ করে বিদ্যুতের শক্তি। ফলে ধোঁয়া নেই, ছাই নেই, চুল্লির পাশে কয়লার কালো স্তূপ রাখারও প্রয়োজন নেই।
তবে পুরনো পদ্ধতি বদলে ফেলা সহজ ছিল না শিহাব উদ্দিন সরকারের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য। নতুন প্রযুক্তি বসাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ দরকার হয়। শিহাব এক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ১০ লাখ টাকার ঋণ, আর নতুন চুল্লি বসাতে কিছু অনুদান এই পরিবর্তনকে সহজ করে দেয়। পাশাপাশি কারখানার শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এতে লাভ কী হল? শিহাব উদ্দিনের ভাষায়, “নতুন চুল্লি বসানোর পর আমার উৎপাদন খরচ কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। এখন কাস্টমারের কাছ থেকে ভালো রিভিউ পাচ্ছি। সবাই বলছে, পণ্যের মান ভালো হয়েছে।”
এছাড়া উৎপাদনের সময় যে বর্জ্য তৈরি হত, সেটাও প্রায় ‘শূন্যের’ কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে তার ভাষ্য।
প্রচলিত কাপোলা ফার্নেসে এক টন পণ্য তৈরি করতে প্রায় ১০০ কেজি কয়লা পুড়ত, আর তা থেকে বাতাসে মিশত প্রায় ৫৫০ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড। কাঁচামালের প্রায় ১০ শতাংশও নষ্ট হত।
ইনডাকশন ফার্নেসে কয়লা লাগে না বলে ধোঁয়া আর স্থানীয় বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। কাঁচামালের অপচয়ও নেমে এসেছে প্রায় ৫ শতাংশে।
শুধু খরচ কমা নয়, নতুন চুল্লি খুলে দিয়েছে নতুন ব্যবসার দুয়ার। কাপোলা ফার্নেসে মূলত ঢালাই লোহা নিয়েই কাজ করা যেত। ইনডাকশন ফার্নেসে স্টিল, ঢালাই লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, পিতলসহ নানা ধরনের ধাতু গলানো যাচ্ছে।
অর্থাৎ একই কারখানা এখন আগের চেয়ে বেশি ধরনের পণ্য তৈরি করতে পারছে, নতুন ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারছে।
শিহাব উদ্দিন তার কারখানার জমিতে লাগিয়েছেন এক হাজার দুইশর বেশি ফলদ ও বনজ গাছ। শিল্পকারখানা মানেই ধোঁয়া আর দূষণ, এই পুরোনো ধারণাও বদলে ফেলার চেষ্টা করছেন তিনি।
তার এই অভিজ্ঞতা বগুড়ার হালকা প্রকৌশল শিল্পের অন্য উদ্যোক্তাদের কাছেও পৌঁছে গেছে। তারাও নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করে ‘রিসোর্স এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন’ করার চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে ব্যবসার মুনাফা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশগত দিকগুলোও মাথায় রাখছেন তারা।
শিহাব উদ্দিনের মত উদ্যোক্তাদের এই বদলে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) প্রকল্প ‘সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন’ বা স্মার্ট।
সরকার ও বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নের এ প্রকল্পটি সারাদেশেই বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে বগুড়া ও নওগাঁয় পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থা গ্রাম উন্নয়ন কর্ম বা গাকের মাধ্যমে মেটাল ও হালকা প্রকৌশল খাতের প্রায় এক হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনার কাজ চলছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমলে নেওয়া হয়েছে ‘রিসোর্স এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন’ বা আরইসিপি পদ্ধতি; যার লক্ষ্য কম সম্পদের ব্যবহার করে, কম দূষণ ছড়িয়ে, বেশি টেকসইভাবে উৎপাদন করা।
এ প্রকল্পের আওতায় বগুড়ার আরও অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন পিকেএসএফের সহায়তায় নিজেদের কারখানার চেহারা বদলাচ্ছেন। কারও কারখানায় বদলে গেছে চুল্লি, কারও বদলেছে মেশিন, কারও ছাদে বসেছে সৌর প্যানেল।
এ প্রকল্পের আওতায় প্রথমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; পরে প্রযুক্তিগত যে উন্নয়ন তার ব্যবসায় জরুরি, তা বসানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অনুদান দেওয়া হয় এবং পুরো ব্যবসা চালানোর জন্য দেওয়া হয় ক্ষুদ্র ঋণ। অনুদানের টাকা আর ফেরত নেওয়া হয় না।
এ প্রকল্পের আওতায় বিসিক শিল্পনগরীর একটি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় বসানো হয়েছে পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট বা পিএফআই যন্ত্র।
মেশিন আগের মতই চলে, তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে যে বাড়তি অপচয় হত, তা কমে এসেছে এই ছোট বৈদ্যুতিক প্যানেলের সাহায্যে। ফলে মাস শেষে বিদ্যুতের হিসাবেও কিছুটা সাশ্রয় হচ্ছে।
আরেক কারখানার ছাদে বসেছে সৌর প্যানেল। দিনের বেলা রোদ থাকলে মেশিন চলে সৌরবিদ্যুতে, প্রয়োজন হলে যোগ হয় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ।
রিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, রেদওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস ও হক মেটাল ওয়ার্কশপকে এভাবে গড়ে তোলা হয়েছে মডেল ওয়ার্কশপ হিসেবে, যেখানে সোলার প্যানেলের পাশাপাশি এলইডি বাতি, স্বচ্ছ টিন আর ভালো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
বগুড়ার কিছু কারখানায় আবার পুরোনো লেদ মেশিনের পাশে জায়গা করে নিয়েছে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সিএনসি মেশিন।
আগে একজন কারিগরকে হাতে মেপে মেপে যন্ত্রাংশ তৈরি করতে হত, তাতে ভুল হওয়ার সুযোগ ছিল। এখন কম্পিউটারে নকশা বসিয়ে দিলে মেশিন নিজেই নির্দিষ্ট মাপে একের পর এক যন্ত্রাংশ তৈরি করে দেয়। এতে সময় বাঁচে, কাঁচামালের অপচয়ও কমে।
পড়ে থাকা বর্জ্য থেকে ইট
বগুড়া হালকা প্রকৌশলের হাব হওয়ায় প্রচুর কারখানা রয়েছে। আর সেসব কারখানায় ধাতু গলানোর পর যে শক্ত, কালচে বর্জ্য পড়ে থাকে, তাকে বলে ফাউন্ড্রি স্ল্যাগ।
এসব বর্জ্য তাদের চোখে কাজে না আসায় ফেলতে গিয়ে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হত, তেমনি খরচও হত। কোথায় ফেলা হবে তা নিয়েও ছিল দুশ্চিন্তা।
এখন সেসব ফাউন্ড্রি স্ল্যাগ বা ধাতব বর্জ্য ফেলে না দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে সিমেন্ট-বালুর সঙ্গে মিশিয়ে তা থেকে তৈরি হচ্ছে ব্লক আর টাইলস। আর সেজন্য ফাউন্ড্রি স্ল্যাগ প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবসাও বাড়ছে সেখানে।
বগুড়া সদরের পরিবেশবান্ধব ইট ও ব্লক উৎপাদনের কোম্পানি জেডএইচ স্টার ব্রিকস অ্যান্ড ব্লকস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী তাকলিমুর রহমান বলেন, “আগে ফাউন্ড্রি শপগুলো ভাবত বর্জ্যগুলো কোথায় ফেলবে। সেটাই একটা সমস্যা ছিল। জায়গা লাগত। সরাতেও খরচ হত।”
বগুড়ার হালকা প্রকৌশল হাবে ছড়িয়ে থাকা ৭৫টির বেশি মেটাল-কাস্টিং ফাউন্ড্রির তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, এসব ফাউন্ড্রির ধাতু গলানোর পর প্রায় ২০০ কেজি বিষাক্ত, পাথুরে স্ল্যাগ (বর্জ্য) অবশিষ্টাংশ হিসেবে জমা হত।
এই ক্ষতিকর শিল্পবর্জ্য সরিয়ে উন্মুক্ত মাঠ বা রাস্তার পাশে ফেলার জন্যই ওয়ার্কশপ মালিকদের মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হত।
এদিকে তাকলিমুর আগে তার কারখানায় বিদেশ থেকে চড়া দামে আমদানি করা পাথর গুঁড়ো করে কংক্রিটের বিল্ডিং ব্লক তৈরি করতেন।
পরে পিকেএসএফের এ প্রকল্পের আওতায় তাকে স্থানীয় ফাউন্ড্রিগুলোর বর্জ্য দিয়ে কংক্রিট ব্লকের মূল ভিত্তি করার প্রশিক্ষণ দিলে তাকলিমুর ঝুঁকিটি নিলেন।
পিকেএসএফ-এর মাধ্যমে পাওয়া একটি ভারী স্ল্যাগ-ক্র্যাশিং মেশিনের সাহায্যে তিনি সেই ঘন শিল্পবর্জ্য চূর্ণ করে সূক্ষ্ম দানায় পরিণত করেন এবং তা দিয়ে পরীক্ষামূলক ইউনি-ব্লক তৈরি করেন।
পরীক্ষামূলক সেই ব্লকগুলো যখন পরীক্ষার জন্য হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (এইচবিআরআই) পাঠানো হয়, তখন সলিড ব্লকের জন্য এর কম্প্রেসিভ স্ট্রেন্থ (চাপ সহ্য করার ক্ষমতা) অফিশিয়াল ফলাফলে ইতিবাচক হয়। তখন থেকে এ পদ্ধতিই তিনি ব্লক বানাচ্ছেন।
কখনো খরচ কম পড়লে নারায়ণগঞ্জ থেকেও একই ধরনের স্ল্যাগ কিনে এনে ব্লক বানান বলে জানালেন তাকলিমুর।
তিনি বলেন, “ফেলে দেওয়া স্ল্যাগ কেবল ব্যবহারযোগ্যই না, বরং এটি পাথরের মতই মজবুত।”
এখন তাকলিমুরের কারখানায় এই ফাউন্ড্রি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রতি মাসে আড়াই লাখ পরিবেশবান্ধব হলো ব্লক, ইউনি-ব্লক এবং সলিড ইট তৈরি হচ্ছে।
তাকলিমুর বলেন, “দাম মোটামুটি সাধারণ ইটের মত হলেও আপনি কোথাও সাড়ে নয় ইঞ্চির চেয়ে বড় ইট পাবেন না। আমাদেরটা পৌনে ১০ ইঞ্চি। আবার এটার জন্য আপনার সিমেন্ট ও বালুর মশলার মিশ্রণ কম লাগবে। সবদিক দিয়েই সাশ্রয়ী।”
আর নতুন পদ্ধতিতে কারখানার উৎপাদন খরচ ‘তিন ভাগের দুইভাগে’ নেমে এসেছে বলে জানান তাকলিমুর।
বদলে গেছে কর্মপরিবেশও
এই সব যান্ত্রিক বদলের পাশাপাশি বদলাচ্ছে বগুড়ার কারখানাগুলোর ভেতরের কর্মপরিবেশও। লোহা কাটার সময় চোখে সুরক্ষা চশমা, ঝালাইয়ের সময় হাতে গ্লাভস, খোলা বৈদ্যুতিক তারের বদলে নিরাপদ সংযোগ–এমন ছোট ছোট পরিবর্তন এনে শ্রমিকের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতের চেষ্টা করা হচ্ছে এ প্রকল্পের আওতায়।
পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় ৮০ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগকে এমন পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল উৎপাদনব্যবস্থার আওতায় আনা।
এ প্রকল্পের সমন্বয়কারী এ কে এম জহিরুল হক বলেন, “সমগ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতই পুরোনো প্রযুক্তির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছে। এ কারণে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে না। এই দুষ্টচক্র থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমেই আধুনিক ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
“এর অংশ হিসেবে আপনারা দেখেছেন, বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের উদ্যোক্তারা কয়লা-চালিত ফার্নেসের বদলে ইলেকট্রিক ফার্নেস স্থাপন করেছেন, ম্যানুয়াল মেশিনের পাশাপাশি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সিএনসি মেশিন ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।”
অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিতের চেষ্টার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
জহিরুল বলেন, “উদ্যোক্তারা নানা রকম আরইসিপি চর্চা রপ্ত করছেন। আমাদের দুইটা অন্যতম প্রধান সম্পদ হচ্ছে এনার্জি এবং পানি। উদ্যোক্তারা তাদের কারখানায় সোলার পাওয়ার স্থাপন করে প্রতিমাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছেন।
“এগুলোর অপচয় রোধ এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছি। আবার কারখানার শোভন কর্মপরিবেশ ও কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও আমরা উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করছি।”
এসবের পাশাপাশি উদ্যোক্তারা যেন আরও ভালো বাজার ধরতে পারেন, সেজন্য তাদের পণ্যের ইউনিক ব্র্যান্ড আইডেনটিটি ও বিভিন্ন সার্টিফিকেশনের ব্যাপারে এ প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান জহিরুল।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বগুড়ায় প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর নতুন শিল্পপার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। চলতি মাসে বগুড়া সফরে গিয়ে সামনের শীতেই এর কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বগুড়া দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক বিকাশের ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে দাবি করে তিনি বলেন, “বিশেষ করে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের জন্য বগুড়া আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিল্পায়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।”
পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের সমন্বয়কারী জহিরুল বলেন, “লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত, যা কৃষি যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে শিল্প যন্ত্রাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা মেটায়। এই খাতের উদ্যোক্তারা যখন আরইসিপি চর্চার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন, তখন তার প্রভাব একাধিক স্তরে পড়বে বলে আমরা আশা করি।
“স্থানীয় পর্যায়ে প্রথম প্রভাব পড়বে উৎপাদন খরচ কমা ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে, যা এই উদ্যোগগুলোকে দেশীয় বাজারে আরও তুলনামূলক সুবিধা দেবে।”
তার ভাষ্য, “দূষণ কমার ফলে কারখানা এলাকা ও আশপাশের জনবসতির পরিবেশগত স্বাস্থ্যও উন্নত হবে, এবং কর্মপরিবেশ নিরাপদ হওয়ায় দক্ষ কর্মী ধরে রাখা সহজ হবে। জাতীয় পর্যায়ে এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়লে আমদানি-নির্ভরতা কমবে এবং কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।”
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম