ইফতেখার আলম বিশাল, রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের তদন্তে নতুন কিছু তথ্য উঠে এসেছে। গত ৩০ জুলাই নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে দিনব্যাপী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ সময় মূল্যায়ন কমিটি, ওপেনিং কমিটির সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিয়োগপ্রাপ্ত ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মীর সাক্ষাৎকার ও শুনানি গ্রহণ করা হয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই চাকরি বহাল রাখতে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কয়েকজন অর্থ দেওয়ার দাবি করলেও তারা অভিযোগের সমর্থনে কোনো ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের হিসাব বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
সূত্রগুলোর দাবি, নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেএসএফ ট্রেড লিমিটেড পূর্বে কর্মরত জনবল বহাল রাখে। এরপর থেকেই কাজ না পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বুশরা সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগও গণমাধ্যমের তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে।
গ্রামীণফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনায় বুশরা সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের জিএম সালাউদ্দিন আহমেদ এবং তার পক্ষের একজন প্রতিনিধির ব্যবহৃত ০১৭১৮-৭৮৭৮১৫ ও ০১৭০৫-৮৫০৪৭০ নম্বর থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক কর্মীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত কমিটি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
এদিকে প্রতিবেদকের হাতে থাকা কয়েকটি অডিও কল রেকর্ডে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কিছু কর্মীকে চাপ বা প্ররোচনা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে অভিযোগ প্রচারের বিষয়েও আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব অডিও রেকর্ডের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেন, তদন্ত কার্যক্রমকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করারও চেষ্টা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার উদ্দেশ্যে অভিযোগ, মানববন্ধন ও বিভিন্ন তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে। তবে এ দাবির সত্যতাও তদন্তাধীন এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বুশরা সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের জিএম সালাউদ্দিন আহমেদ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা করিনি।”
তবে, "আপনাদের প্রতিষ্ঠান এবার কাজ না পাওয়ার পরও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?"—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, “আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগপত্র প্রদান করে। ফলে নির্বাচন কার্যালয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী পূর্বে কর্মরত কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। তাই চাকরি বহাল রাখতে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বাস্তবভিত্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমেই জানা যাবে।”
কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ও কেন্দ্রীয় অনুমোদনের ভিত্তিতেই পূর্বে কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে কোনো নিয়োগ তালিকা প্রস্তুত করেনি; নির্বাচন কমিশনের সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ীই চুক্তির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
ঘুষ বা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো সুযোগ বা অবকাশ ছিল না।” তিনি দাবি করেন, বুশরা সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন অপতৎপরতা চালিয়ে তদন্ত কার্যক্রমকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির জিএম সালাউদ্দিন আহমেদ।
জানা গেছে, রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের দায়িত্ব পায় কেএসএফ ট্রেড লিমিটেড। নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি পূর্বে কর্মরত জনবল বহাল রাখে। পরে চাকরি বহাল রাখতে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলে কয়েকজন কর্মী মানববন্ধন করলে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুলাই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (শৃঙ্খলা) সালাহউদ্দীন আহমদ স্বাক্ষরিত আদেশে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ডিএম আতিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডিএম আতিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি।