বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে দুনিয়াজুড়ে বইছে উন্মাদনার ঝড়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরে বাংলাদেশ খেলার সুযোগ না পেলেও এখানে উত্তেজনার কমতি নেই। জনপ্রিয় দলগুলোর সমর্থকরা, বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল-ভক্তরা বাগ্যুদ্ধেই মাঠ গরম করে রাখছেন। এই বিরোধিতা মাঝেমধ্যে প্রাণঘাতী সংঘাতেও রূপ নিচ্ছে।
তথ্য বলছে, এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে নানা ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের প্রাণ গেছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। প্রিয় দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান তিনজন। এ ছাড়া মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় দুর্ঘটনা, উত্তেজনায় হার্ট অ্যটাকসহ বিভিন্ন ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন।
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এরই মধ্যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, যেখানে বড়পর্দায় খেলা দেখানো হবে, সেখানে ডিবির সদস্যরা নজরদারি করবেন।
দূরদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ঘিরে দেশে হতাহতের ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ চলার সময় এক মাসে ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিন জেলায় তিনজন খুন হন। পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে ও ছাদ থেকে পড়ে সাতজনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও হবিগঞ্জে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে এক কিশোরের মৃত্যু হয়।
জানতে চাইলে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, খেলা বিনোদনের অংশ, তাতে জয় পরাজয় থাকবে– এটি মেনে নেওয়ার মানসিকতায় ঘাটতি আছে আমাদের। তবে এটি শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রে নয়; জাতিগতভাবেই আমরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক– কোনো ক্ষেত্রেই জয় পরাজয় স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। নিজের মতের বাইরে কিছু হলেই আমরা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠি। এর মূলে রয়েছে আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং অন্যের আবেগের প্রতি সম্মান দেখানোয় ঘাটতি। আমরা মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সুস্থতার বিষয়ে মনোযোগী না হওয়ায় এমনটা ঘটছে।
তবে বিশ্বকাপ ঘিরে পৃথিবীর অনেক দেশেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় পর্দায় খেলা দেখানোর স্থানে গুলিতে একজন নিহত হন। মেক্সিকোতে জয় উদযাপনের সময় ভিড়ের ভেতর দমবন্ধ হয়ে চারজন এবং জর্ডানে হুড়োহুড়ির কারণে পদদলিত হয়ে একজনের মৃত্যু ও আটজন আহত হন।
খেলার বিরোধে ঝরল তিন প্রাণ: গত বুধবার একই দিনে ঢাকার আদাবর ও সিলেটের জকিগঞ্জে দুজনকে খুন করা হয়। সেই রাতেই ঢাকার আশুলিয়ায় এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়। আদাবরে বিএনপির নবোদয় হাউজিং ইউনিটের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বাদশার ওপর হামলা চালায় প্রতিপক্ষ। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক আবুল বাশারকে মৃত ঘোষণা করেন। দুদিন আগে ব্রাজিলের জয় উদযাপন নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে বলে সমকালকে জানান মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান।
এদিকে, ব্রাজিল জাপান ফুটবল ম্যাচ নিয়ে সমর্থকদের বিরোধের জেরে আশুলিয়ায় নাহিদ হাসান নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার পর মাটিচাপা দেওয়া হয়। বুধবার মধ্যরাতে আশুলিয়ার সাধুপাড়া এলাকার গরুর হাটে মাটি খুঁড়ে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, ফুটবল ম্যাচ নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
সেই রাতে সিলেটের জকিগঞ্জের খলাছড়া ইউনিয়নের লামারগ্রামে ফুটবল খেলার উল্লাস ঘিরে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান আলম আহমদ। জকিগঞ্জ থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক জানান, হত্যায় অভিযুক্ত পারভেজকে গ্রেপ্তার ও রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনজনের মৃত্যু বিদ্যুৎস্পর্শে: পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেছে তিনজনের। গত ১৯ জুন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে গাছে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মাহিন শেখ নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়। ১৫ জুন চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড় এলাকায় আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে মারা যান রামহরি বৈষ্ণব। আর ৯ জুন মানিকগঞ্জ সদরে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় ফয়সাল নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়।
আরও চার মৃত্যু: বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুটবল খেলার ধুম পড়ে যায়। তেমনই একটি আয়োজন ছিল নড়াইল সদরে। সেখানে গত শুক্রবার কিশোরদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধে মোস্তাফা কাজী নামে এক বৃদ্ধকে দেশি অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় ফুটবল মাঠের গোলপোস্ট ভেঙে মাহিদুল ইসলাম নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। সেদিনই বরগুনার তালতলীতে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচের অনুশীলনের সময় স্ট্রোক করে মারা যান খোকন কর্মকার।
এর আগে ১৩ জুন ভোলার বোরহানউদ্দিনে ব্রাজিল ফুটবল দলের সমর্থনে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় যোগ দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এক যুবকের মৃত্যু হয়। তাঁর নাম মো. ইসমাইল। উৎস: সমকাল।