কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বাদী মো. ইয়ার হোসেন এসব কথা বলেন। ইয়ার হোসেন তনুর বাবা। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। অবসরের আগে তিনি বোর্ডের অফিস সহায়ক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। ওই গ্রামের খালের পাড়ের একটি কবরস্থানে শায়িত আছেন সোহাগী জাহান তনু। তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার মাইয়াডারে বহুত কষ্ট দিয়ে মারছে তারা।
আমি আগে কইছিলাম, গরিবের কেউ নেই। গরিব মাইনসের লাই বিচার নাই। অহন দেখি বিচার অইবো। জাহিদ ও জাহিদের বউডারে গ্রেপ্তার করলে সব পরিষ্কার হবে। এখন বিচার দেখার অপেক্ষায় আছি। খুনিদের ফাঁসি দেখার অপেক্ষায় আছি।’ সোহাগী জাহান তনু হত্যার ঘটনায় তনুর বাবা ও মা বারবার সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তনুর বাবা-মায়ের দাবি- দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। তনুর পরিবারের ভাষ্য, তনু হত্যার বিচার হলে সেনাবাহিনীর সুনাম আরও বৃদ্ধি পাবে। দেশের জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। নিরাপদ এলাকায় সেনাবাহিনীর স্ত্রী ও সন্তানরা নিরাপদ থাকবে না, এটা কোনোভাবেই মাথায় আসছে না। পরিবারটি এ মামলা নিয়ে এখন আশার আলো দেখছে।
সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করলেই তনু হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হবে। সার্জেন্ট জাহিদ এ হত্যাকাণ্ডের সবকিছু জানে। সবার আগে তাকে গ্রেপ্তার করা দরকার। সে যেন কোনোভাবেই দেশ ত্যাগ করতে না পারে। একইসঙ্গে তার স্ত্রীকেও দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।
১০ বছর আগে তনু হত্যার পরপরই আমি বলেছিলাম, সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু সেই সময়ে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের আইনের আওতায় আনেননি। আমাদের কখনো পুরো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল না। অভিযোগ ছিল যেসব সেনাসদস্য আমার মেয়েকে হত্যা করেছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করেছে।
এ হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে। ওই সময়ে সেনাবাহিনী চাইলে দায়ী ব্যক্তিদের সাজা দিয়ে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে বাহ্বা পেতো। কিন্তু তৎকালীন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সেটি করতে পারেনি। এ হত্যাকাণ্ড দেশবাসীর মনে দাগ কেটেছিল। বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বর্তমান সেনাপ্রধানের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, এক দশক পর একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলো। এখন আমার মনে হচ্ছে বিচারটা হবে। দেশবাসী ও আমাদের পরিবার কুৎসিত মুখগুলোকে দেখতে পাবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০শে মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে যান তনু। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের পাওয়ার হাউজের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়।
পরদিন তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই সময়ে তনুর বাবা কয়েকজনের নাম দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের মনিরুল নামের এক ব্যক্তি অজ্ঞাতনামা দিয়ে দরখাস্ত লিখেন। এরপর ইয়ার হোসেন সেটিতে সই করতে বাধ্য হন।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, গত ২১শে এপ্রিল ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে কুমিল্লা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান (৫২)কে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে হাফিজুর রিমান্ডে আছেন। ইতিমধ্যে হাফিজুরের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রিমান্ড চলছে। তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, আমরা এই মামলা নিয়ে গবেষণা করছি। সবার সঙ্গে কথা বলবো। আগের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলবো। সূত্র: মানবজিমন