মামুন পরিবহনের বাসা চালান পিন্টু মিয়া। পরিকল্পনা ছিল ঈদের ছুটির শেষটা কাটাবেন শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরে। স্ত্রী-দুই মেয়েকে নিয়ে প্রথমে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুরে।
কথা ছিল সৌদি প্রবাসী শ্যালককে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরে ফিরবেন তিনি। সে হিসেবে গতকাল শনিবার রাতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। বাসের রুট ছিল ঝিনাইদহ থেকে ঢাকা, কুমিল্লা হয়ে লক্ষ্মীপুর।
বাসটি ঢাকা পৌঁছালে শ্যালককে আনতে নেমে যান পিন্টু। আর স্ত্রী-সন্তানদের দেখেশুনে নিয়ে যেতে বলেন মামুন পরিবহনের সহকর্মীদের কাছে।
কিন্তু রোববার ভোররাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে একটি মেইল ট্রেন মামুন পরিবহনের বাসটিকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়।
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় নিহত হন ১২ জন। নিহত হয় মামুন পরিবহনের চালক পিন্টুর স্ত্রী লাইজু আক্তার, বড় মেয়ে ছয় বছরের খাদিজা আক্তার ও সাড়ে তিন বছরের মরিয়ম আক্তার।
দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন পিন্টু। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটানো এই ঈদই যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শোক হয়ে যাবে, এমন নিয়তি যেন কিছুতেই মানতে পারছেন না।
'যে পরিবহনের বাস চালাই, সেই বাসই স্ত্রী, সন্তানদের প্রাণ কেড়ে নেবে, তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি,' বলেন পিন্টু।
দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'আমি যে বাস চালাই, সেই পরিবহনেই ছেড়ে আসলাম স্ত্রী-সন্তানদের। সহকর্মী চালকের কাছে তাদের দায়িত্ব দিয়ে নিজে ঢাকায় নেমে গেলাম। তখন ভাবিনি এটাই শেষ দেখা।'
বাস থেকে নামার পর নিয়মিত বিরতিতে যোগাযোগ রাখছিলেন সহকর্মীর সঙ্গে। জানতে চাইছিলেন স্ত্রী-সন্তানদের খবর। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার পর হঠাৎই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
'রাত ৩টার পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ করেতে পারিনি। ফোন বন্ধ। বারবার চেষ্টা করেও পাইনি। এরপর আসে সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার খবর,' কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন তিনি।
শনিবার দিবাগত রাত পৌনে ৩টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ক্রসিংয়ে ট্রেন-বাসের এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাসটিকে টেনে-হিঁচড়ে আধাকিলোমিটার দূরে সদর দক্ষিণ উপজেলার জাঙ্গালিয়া এলাকায় নিয়ে যায় ট্রেনটি।
ঢাকাগামী 'চট্টগ্রাম মেইল' ট্রেনটি লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল বাসটিকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বাসটি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১২ জন।
শোকে স্তব্ধ পিন্টু মিয়া বলেন, 'আমি বেঁচে আছি, কিন্তু আমার ভেতরে কিছুই নেই। আমার স্ত্রী-সন্তানই ছিল আমার জীবন। আজ তারা নেই, আমি থাকলেও যেন নেই...।'
রোববার সারাদিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের আহাজারি, কান্না, শোকের মাতম সবকিছুর মাঝেও পিন্টু মিয়া দাঁড়িয়ে ছিলেন স্তব্ধ হয়ে। স্বজনরা যখন মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায়, তখন পিন্টু পুরো নিশ্চুপ।
মামুন পরিবহনের নোয়াখালী শাখার পরিচালক আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের পরিবহনের বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক পৃথক সার্ভিস আছে। পিন্টু মিয়া আমাদের অন্য রুটের বাসের চালক।' উৎস: ডেইলি স্টার।