নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় বোরো ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নির্মিতব্য ফসলরক্ষা বাঁধে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) টেকনিক্যাল কাজ ও বিল বিতরণে ইউএনও কার্যালয়ের নাজির ও অফিস সহকারীর নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিগুলোর (পিআইসি) কাজে চরম অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসব অনিয়মকে ‘সঠিক নয়’ বলে দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।
সরকারি ‘কাবিটা’ নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা কমিটিতে ইউএনও সভাপতি এবং পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাঁধের প্রাক্কলন তৈরি, পিআইসি গঠন, কাজের তদারকি এবং বিলের চেক প্রদানের মূল কারিগরি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পাউবোর। কিন্তু জগন্নাথপুরে ৩৭টি পিআইসির অধীনে ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজে পাউবোকে কার্যত ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ করে রাখা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও মো. বরকত উল্লাহর কার্যালয়ের নাজির মো. মিজানুর রহমান ও অফিস সহকারী লিটনই এখন বাঁধ ব্যবস্থাপনার সর্বেসর্বা।
স্থানীয় পিআইসি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাঁধের কাজের শুরু থেকেই নাজির ও পিয়ন প্রভাব বিস্তার করছেন। পিআইসি গঠন থেকে শুরু করে অনুমোদন এবং সর্বশেষ বিলের চেক বিতরণ—সবই হচ্ছে ইউএনও’র কার্যালয় থেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নলুয়ার হাওরের এক পিআইসি সভাপতি বলেন আমাদের কাজের জন্য এখন আর পাউবো অফিসে যেতে হয় না। নাজির মিজান সাহেব আর পিয়ন লিটন সাহেবই সব ঠিক করে দেন। চেকও তারাই দিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই দুই কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন পিআইসি থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছেন। পাউবো যেখানে কারিগরি তদারকির দায়িত্বে থাকার কথা, সেখানে অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে বিল বিতরণ প্রক্রিয়াকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জগন্নাথপুর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ ফরিদের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এই নীরবতা রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, নাজির মো. মিজানুর রহমান নিজের সংশ্লিষ্টতা আংশিক স্বীকার করে বলেন, আমরা কোনো অনিয়ম করছি না। আমি কেবল বিলের চেক লিখে দিচ্ছি। কাজ করছে পাউবোই। তবে বিলের চেক কেন পাউবো’র মাধ্যমে না দিয়ে তিনি বিতরণ করছেন, সেটির কোনো সদুত্তর মেলেনি।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, নীতিমালা মেনেই সব কাজ হচ্ছে। যারা অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার কথা বলছে, তারা আন্দাজে এসব বলছেন। অভিযোগগুলো সঠিক নয়।
চলতি মওসুমে জগন্নাথপুর উপজেলায় ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৩৭টি পিআইসিকে মোট ৬ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশাল অংকের এই সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে এখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। পাউবোর গুরুত্ব কমিয়ে অ-প্রযুক্তিগত কর্মচারীদের দিয়ে কাজ চালানোয় বাঁধের গুণগত মান নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সাধারণ কৃষকরা।