ফয়সাল চৌধুরী, জেলা প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়ায় এখন ভোরের বাতাসে ভেসে আসছে এক ধরনের মিষ্টির ঘ্রাণ। শহর ও বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগঞ্জে বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে রাস্তার ধারে, পুকুরপার কিংবা বিস্তীর্ণ বাগান—সবখানেই বিভিন্ন জাতের আমের নতুন মুকুলের মৌ-মৌ গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ। আমগাছের ডালে ডালে মুকুলের ছড়াছড়ি। মধু মাসের আগমনী বার্তা নিয়ে ঋতুরাজ বসন্তের এই বার্তাবাহক যেন জানিয়ে দিচ্ছে, আর কয়েক মাস পরেই পাকা আমে রঙিন হবে চারদিক। এরই মধ্যে অনেক গাছে ছোট ছোট গুটি গুটি আমও দেখা গেছে। শেষ মাঘের শীতেই জেলায় আমের মুকুল আসতে শুরু করেছে বেশিরভাগ গাছে । তবে খুবই অল্প সংখ্যক গাছে এখনো মুকুল না এলেও পরবর্তী সময় অল্প কিছুদিনের মধ্যে আসবে ও প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে এবার আমের খুবই ভালো ফলনের আশা করছেন এই জেলার চাষিরা।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছেন, শেষ মাঘে যেসব গাছে মুকুল আসবে সেসব স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আম চাষ করলে উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবহন, রপ্তানি ও বাজারজাত করা গেলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন।এ্য এলাকার কৃষকরা কোটি টাকার আম বিক্রয় স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা যথাযথ সহযোগিতা করে আসছি।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, জেলায় ১ হাজার ৭ শ ৫৪ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়ে থাকে এবং ২৯ হাজার ১ শ ১৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল গত বছর । নির্ধারিত সময়ের আগেই আবহাওয়া ও বিভিন্ন জাতের কারণে আমের মুকুল আসতে শুরু করেছে। মাঘের শেষ সপ্তাহের দিকে আবার অনেক গাছে এর আগেও আমের মুকুল এসেছে । শেষ মাঘে যেসব গাছে মুকুল আসে, সেসব স্থায়ী হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অন্য একটি তালিকায় দেখা গেছে, ছক -১ এর ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের উৎপাদিত ফসলের তথ্যাদি মধ্যে আমের আবাদকৃত জমির পরিমাণ ১৭৫৪ হেক্টর জমি ও উৎপাদন হয়েছে ২৯১১৩ মেট্রিক টন।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, এবছর কত হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হচ্ছে তা সঠিক তথ্য এখন তারা দিতে পারেননি তবে এই জেলায় গত বছর ৩৯৭ হেক্টর জমিতে হিমসাগর আমের চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ৬৭৮৪ মেট্রিক টন, ১০৪ হেক্টর জমিতে গোপালভোগ উৎপাদন হয় ১৪৫১ মেট্রো , ১৭২ হেক্টর জমিতে ফজলি উৎপাদন হয়েছিল ২৭৮০ মেট্রিক টন, ১৯৫ হেক্টর জমিতে ল্যাংড়া উৎপাদন হয়েছিল ২৫৮৯ মেট্রিক টন , ৪৯৬ হেক্টর জমিতে আম্রপলি উৎপাদন হয়েছিল ৮৮ ৪৭ মেট্রিক টন , একুশ হেক্টর জমিতে ২১ হেক্টর হাঁড়িভাঙা উৎপাদন হয়েছিল ২৯০ মেট্রিক টন , ৯৬ হেক্টর জমিতে বারি-৪ উৎপাদন হয়েছিল ১৬৭৩ মেট্রিক টন , ১৫ হেক্টর জমিতে গৌরমতী উৎপাদন হয়েছিল ১৯৭ মেট্রিক টন , ২৩ সেক্টর জমিতে মল্লিকা উৎপাদন হয়েছিল ৩৬৮ মেট্রিক টন, ১২ হেক্টর জমিতেবোম্বাই উৎপাদন হয়েছিল ১৮০ মেট্রিক টন, ১০৪ হেক্টর জমিতে গোপালভোগ উৎপাদন হয়েছিল ১৪৫১ মেট্রিক টনসহ মোট উৎপাদন হয়েছিল ৩১ হাজার ৩ শ ৬৩ মেট্রিক টন।
এদিকে অন্য একটি তালিকায় দেখা গেছে, ছক -১ এর ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের উৎপাদিত ফসলের তথ্যাদি মধ্যে আমের আবাদকৃত জমির পরিমাণ ১৭৫৪ হেক্টর জমি ও উৎপাদন হয়েছে ২৯১১৩ মেট্রিক টন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গাছের প্রতিটি ডাল যেন হলদ-সবুজ মুকুলে মোড়া। বর্তমানে বাগানে বাগানে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আম চাষ ও রক্ষণাবেক্ষণের নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যাতে আমের ভালো রঙ, ফলন ও দাম পাওয়া যায়।
এ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রাম গঞ্জের আম চাষীদের সাথে কথা বললে তারা জানিয়েছেন, প্রতিবছর এই জেলায় প্রচুর পরিমাণে আম উৎপাদন হয় এদের মধ্যে হিমসাগর, গোপালভোগ, ফজলি, ল্যাংড়া, আম্রপলি, হাঁড়িভাঙা, রুপালি, বারি-৪, গৌরমতী, মল্লিকা, বোম্বাই, গোপালভোগ, গুটি আম অনেকে বলে আটি আম অন্যতম।
স্থানীয় আম চাষিরা জানান, মুকুল আসার আগে আম গাছের পরিচর্যা করতে হয়। নিয়মিত স্প্রে ও সেচ দেওয়া শুরু হয়েছে। এবার বেশিরভাগ গাছেই সঠিক সময়ে আমের মুকুল আসতে শুরু করেছে অল্প কিছু গাছে আমের মুকুল এসেছে আগে। গাছগুলোতে মুকুল আসতেই ঢাকা, রংপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা আসছেন এবং আগাম বাগান কিনছেন।
কুষ্টিয়া শহরের বাড়ির আঙিনায় দুটি আম গাছ লাগিয়েছেন মলি খাতুন বলেন, গাছের বয়স ১০ বছর হবে। গত ১ বছর ধরে আগাম মুকুল আসছে। একটি সুস্বাদু ল্যাংড়া জাতের আম। মুকুল টিকে থাকলে এবার ভালো ফলন পাওয়া যাবে।
আমচাষি মীর অপু ও মীর চকু জানান, মুকুল আসার আগে আমগাছের পরিচর্যা করতে হয়। নিয়মিত স্প্রে ও সেচ দেওয়া শুরু হয়েছে। এবার কিছুটা আগেই আমের মুকুল আসতে শুরু করেছে। গাছে মুকুল আসার খবর পেয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিভিন্ন এলাকার আম ব্যবসায়ীরা বাগানে বাগানে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। অনেকে আগাম বাগান কিনেও নিচ্ছেন।
কুমারখালী এলাকার আমগাছ মালিক স্বপন বিশ্বাস বলেন, তাঁর কয়েকটি প্রজাতির আম গাছ আছে। সবগুলো গাছে প্রচুর পরিমাণে আমের মুকুল এসেছে। আশা করছি এবার ব্যাপক আমের ফলন পাব।
কুষ্টিয়া মিরপুর এলাকার রাশেদুজ্জামান রাশেদ জানান, বেশিরভাগ গাছ মুকুলে ভরে গেছে। প্রায় এক মাস আগে থেকেই আমগাছে মুকুল আসা শুরু হয়েছে।
এ সময় একাধিক আম চাষিরা অভিযোগ তোলেন, কৃষি বিভাগ থেকে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা আরো বেশি পরিমাণে করলে হয়তো আরও বেশি উৎপাদন হতো এ জেলায়। কৃষকরা জানিয়েছেন কিছু কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন ও কত হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে কত মেট্রিক টন এগুলা সঠিকভাবে জরিপ না করে অতীতের সংখ্যাগুলো কম-বেশি নির্ণয় করে প্রকাশ করে থাকে। নতুন এই সরকারের আমলে ভবিষ্যতে এই ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হলে কৃষি ও কৃষিজাত উৎপাদন আরো বাড়বে বলে আশা করেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সঠিক নিয়ম পালন করলে আমের ফলন বেশি পাওয়া যাবে। যেমন-
১. ছোট গাছের মুকুল ভেঙে দেওয়া: কলমের গাছে সাধারণত প্রথম বছরে আসা সব মুকুল ভাঙার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরবর্তী বছর থেকে মুকুল না ভাঙলেও চলবে। একান্তই যদি গাছে অতিরিক্ত মুকুল থাকে তখন গাছের স্বাস্থ্য বিবেচনায় কিছু মুকুল ভেঙে দেওয়া যেতে পারে।
২. ডাল ছাঁটাই থেকে বিরত থাকা: গাছে মুকুল ও ফলন বাড়াতে, রোগ-পোকার আক্রমণ ঠেকাতে, গাছের আকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে, আমগাছের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের জন্য, প্রতিবছর ডাল ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হয়। ডাল ছাঁটাইয়ের উপযুক্ত সময় হলো ফল সংগ্রহের পরপরই। মুকুল আসার আগে বা পরে কখনোই ছাঁটাই করা যাবে না।
৩. সার প্রয়োগ: গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টিচাহিদা নিশ্চিত করতে গাছের বয়স অনুযায়ী অনুমোদিত মাত্রায় জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণত বর্ষার আগে (মার্চ-এপ্রিল মাসে) ও বর্ষার পরে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে) বছরে এই দুবার সার প্রয়োগ করতে হয়।
৪. অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার এড়িয়ে চলা: মুকুলের সময় অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার দিলে মুকুল ঝরে যেতে পারে। বেশি নাইট্রোজেন প্রয়োগে গাছে পাতার সংখ্যা কিন্তু মুকুলের সংখ্যা কমে। তাই এ সময়ে নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে।
৫. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: গাছের গোড়ায় আগাছা, শুকনো পাতা ও ঝরে পড়া মুকুল নিয়মিত পরিষ্কার করলে রোগ ও পোকার ঝুঁকি কমে।
৬. আবহাওয়ার দিকে নজর রাখা: ঘন কুয়াশা, অতিরিক্ত বৃষ্টি বা দীর্ঘ শুষ্কতা—এসব পরিস্থিতিতে গাছের যত্নে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ঝড়বৃষ্টিতে মুকুল ঝরে পড়া থেকে শুরু করে গাছ হেলে পড়া বা ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচতে খুঁটি বসিয়ে গাছকে অবলম্বন দেওয়া। গাছে মুকুল আসার আগে গাছকে রোগমুক্ত রাখাটা খুব জরুরি। সে ক্ষেত্রে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার কীটনাশক ও প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে স্প্রে করতে হয়। বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যে প্রয়োগমাত্রায় ভিন্নতা থাকতে পারে। তাই স্প্রে করার আগে অবশ্যই প্যাকেটের গায়ে নির্দেশনা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। আমগাছকে এফিড, থ্রিপস, মিলিবাগ ও হপার পোকার মতো কিছু মারাত্মক পোকার আক্রমণ ও এনথ্রাকনোজ এবং পাউডারি মিলডিউয়ের মতো ছত্রাকজনিত বিভিন্ন রোগ ঠেকাতে, আমের মুকুল ও ফল ঝরে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ও সঠিক ফলন পেতে বছরে অন্তত তিনবার কীটনাশক, ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। কীটনাশকের মধ্যে প্রতি লিটার পানিতে শূন্য দশমিক ৫ মিলিলিটার ইমিডাক্লোপ্রিড অথবা প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার সাইপারমেথ্রিন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।মুকুল আসার পরে গাছে মুকুল আসতে শুরু করলে, মুকুল যখন ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা হয়, কিন্তু তখনো ফুল ফোটেনি—এ অবস্থায় একই অনুপাতে দ্বিতীয়বার স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করতে হবে বিকেলবেলায়। এ সময় গাছের মুকুল, পাতা ও কাণ্ড ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করা জরুরি। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে বিশেষ করে মুকুল থেকে আমের গুটি আসার পর কোনোভাবেই মাটিতে পানির ঘাটতি রাখা যাবে না, এতে মুকুল নেতিয়ে যেতে পারে, ঝরে যেতে পারে মুকুল ও গুটি।
এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম বা আর্দ্র তাপমাত্রায় প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া সার ও ১ গ্রাম বোরন সার মিশিয়ে ১০–১৫ দিন পরপর স্প্রে করলে গাছে ফল ঝরে পড়া বন্ধ হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়ার উপপরিচালক ড়. মো: শওকত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এ জেলা এবার প্রায় ৯৫% আম গাছে মুকুল আসতে পারে। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমের বাম্পার ফলন হতে পারে। আমগাছে মুকুল আসার ৩০ থেকে ৪৫ দিন আগে থেকেই গাছে পানি, সারসহ সব ধরনের খাবার দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়। ছাদবাগানের ক্ষেত্রে গাছকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে যতটুকু পানি না দিলেই নয়, ততটুকু পানি দিয়ে কোনোরকমে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। কারণ, এ সময়ে সার ও পানি পেলে গাছ মুকুল না দিয়ে নতুন পাতা ছাড়তে শুরু করে। মুকুল আসার এক থেকে দেড় মাস আগেই প্রথমবারের মতো অনুমোদিত মাত্রায় সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক এবং ম্যানকজেব-জাতীয় ছত্রাকনাশক গাছে স্প্রে করতে হবে। কারণ, গাছে মুকুল আসার আগে গাছকে রোগমুক্ত রাখাটা খুব জরুরি।