নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীতে বৃষ্টির পরিমাণ কমেছে। টানা পাঁচদিনের প্রবল বর্ষণের পর আজ শুক্রবার সকাল থেকে সূর্যের দেখা পেয়েছে জেলাবাসী। এর ফলে পানি কমতে শুরু করলেও এখনো কমেনি জলাবদ্ধতা। ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনার কারণে পানি ধীরগতিতে নামছে। এই পরিস্থিতিতে জেলায় ৪২ হাজার পরিবার পানিবন্ধী হয়ে ২ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ১১৬ হেক্টর জমির আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও সবজি। ভেসে গেছে মৎস্য ঘের।
সরেজমিন জেলা শহর মাইজদী, সদর উপজেলা ও কবিরহাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিচু এলাকার বেশির ভাগ রাস্তাঘাট, বাড়িঘর এখনো পানির নিচে। বাড়ির রান্নাঘরের ভিতরে পানি থৈ থৈ করায় অনেক পরিবারে রান্না হয়নি। ফলে বাড়িঘর ছেড়ে অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ওঠেছেন। ফসলি জমির ক্ষেতগুলো পানিতে ডুবে রোপা আউশ, আমনের বীজতলা ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সদর উপজেলার চর উরিয়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন ও সুমন বলেন, নোয়াখালী ইউনিয়নের এই অঞ্চলের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ কৃষক। কৃষি কাজের ওপর নির্ভর করে এখনাকার মানুষের জীবিকা চলে। গত ৫ দিনের বৃষ্টিতে পুরো এলাকার আউশ ধান, আমনের বীজতলা, লাউ, শোষা, বরবটি, জিঙ্গা, চিচিঙ্গা, করলা, ঝালি কুমড়াসহ ক্ষেতের সব বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন সবজি তোলার সময়, ঠিক এই মুহুর্তে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাদের সব শেষ, আমরা কি দিয়ে পরিবার-পরিজন চালাব, কেমনে বাঁচবো?
কৃষক রফিক উল্যাহ ও আলা উদ্দিন বলেন, আশপাশের খালগুলোর মধ্যে প্রত্যেক বাড়ির সামনে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, অনেকেই খালের বেশিরভাগ অংশ দখল করে দোকান ও স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। ফলে খাল দিয়ে পানি নামছে না। যার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে এই ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত কৃষকদের সরকারি প্রনোদনা প্রদানসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধান চান কৃষকরা।
নোয়াখালীর শহরতলী কৃষ্ণরামপুর গ্রামের বাসিন্দা সংবাদকর্মী মো. হাসান বলেন, শহরের ড্রেনগুলো করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। অন্যদিকে গত বন্যার পর ড্রেনগুলো এবং শহরের পাশের খালগুলো পরিস্কার কিংবা সংস্কার করা হয়নি। বেশিরভাগ খাল দখল করে অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এতে পানির গতিরোধ হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরী হয়েছে। ড্রেনগুলো সংস্কার ও খালগুলোর ওপর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নোয়াখালীবাসীকে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতামুক্ত করার দাবি জানান এই সংবাদকর্মী।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ অফিসার মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, চলমান প্রবল বর্ষণে আমাদের ৩ হাজার ৫৯২ হেক্টর জমির আউশ ধান, ১ হাজার ১৭৩ হেক্টর আমন ধানের বীজতলা, ৪ হাজার ৩৫১ হেক্টর জমির সবজি, তরমুজ, আদা, হলুদ, মরিচ ও পাট আক্রান্ত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাধিক সহযোগিতার আশ^াস প্রদান করেন এই কর্মকর্তা।
নোয়াখালী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, ইতিমধ্যে প্রবল বর্ষণে জেলার সদর, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সুবর্ণচর, সেনবাগ ও হাতিয়া উপজেলা প্লাবিত হয়ে ৪৬ হাজার ৭০টি পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এতে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০৩জন মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে ৪৬টি ঘরবাড়ি। ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় এক হাজার ৮৫০জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রিত মানুষের জন্য চাউল, নগদ টাকা ও শুকনো খাবার মজুদ রাখা হয়েছে।