মো. রফিকুল ইসলাম মিঠু: নির্দিষ্ট সংখ্যক মামলা দেওয়ার চাপ, টানা ৭-৮ ঘণ্টা ধুলা ও শব্দদূষণের মধ্যে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন এবং সাধারণ চালকদের সঙ্গে নিত্যদিনের বাগ্বিতণ্ডা—সব মিলিয়ে মারাত্মক মানসিক চাপে দিন কাটাচ্ছেন ট্রাফিক সার্জেন্টরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাজের মূল্যায়নে মামলার সংখ্যাকে প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা ও বার্নআউট বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সড়ক ব্যবস্থাপনাতেও।
পুলিশের মাঠপর্যায়ের একাধিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ। তবে প্রতিদিনের নির্দিষ্ট টার্গেট পূরণ করা তাদের জন্য এক ধরনের মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দিন সড়কে আইন ভঙ্গকারীর সংখ্যা কম থাকলেও টার্গেট পূরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জবাবদিহির আশঙ্কায় থাকতে হয় তাদের। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতিতে কাজ করার ফলে অনেক কর্মকর্তা ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন। পাশাপাশি মানসিক ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সেবামূলক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কাজের গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যাগত টার্গেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এতে কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের প্রকৃত প্রয়োজনের পরিবর্তে টার্গেট পূরণে বেশি মনোযোগী হতে বাধ্য হন। এর ফলে একদিকে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সাধারণ জনগণের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, অন্যদিকে কর্মীদের কর্মসন্তুষ্টিও কমে যায়।
সমাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মামলার সংখ্যার ভিত্তিতে ট্রাফিক কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা উচিত নয়। এর পরিবর্তে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের মান এবং জনসাধারণের সঙ্গে পেশাদার আচরণকে মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
প্রযুক্তির ব্যবহার: ম্যানুয়ালি মামলা দেওয়ার চাপ কমাতে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ও ই-প্রসিকিউশন ব্যবস্থা জোরদার করা।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: ট্রাফিক সার্জেন্টদের মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কর্মশালার আয়োজন করা।
ডিউটির সময়সীমা ও বিশ্রাম: শব্দ ও বায়ুদূষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিফটভিত্তিক দায়িত্ব পালন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করা।
নিরাপদ সড়ক ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখতে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা না হলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সড়ক নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।