শিরোনাম
◈ থমথমে পশ্চিমবঙ্গ দফায় দফায় সংঘর্ষ ◈ আরব আমিরাতে হামলা ইরান চালায়নি: সামরিক সূত্রের দাবি ◈ লিওনেল মেসির কারণে হেরেছেন তৃণমূলের অরূপ বিশ্বাস! ◈ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজ‌নৈ‌তিক দলগুলো কী ভাব‌ছে  ◈ হরমুজ প্রণালীর নতুন সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ এলাকা ঘোষণা করলো ইরান ◈ হাম মহামারির ঝুঁকি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ! ◈ ট্রাম্প কীভাবে ঐতিহাসিকভাবে অজনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠলেন  ◈ ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনার ক্লাবে যোগ দেয়ার কথা ভাবছেন নেইমার! ◈ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার ◈ আইপিএলে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কড়াকড়ি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের

প্রকাশিত : ০৫ মে, ২০২৬, ১১:২৭ দুপুর
আপডেট : ০৫ মে, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার

মহসিন কবির: দেশের চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি বার বার বলে আসছেন। এরপর গত রোববার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করে পুলিশ। এই আটকের মধ্য দিয়ে সমাজে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে তারেক রহমানের সরকার। যদিও আটকের ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রেজাউল কাইয়ুমকে। ফলে এ নিয়ে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজের বিশিষ্টজনরা বলছেন, এটাও বা কম কিসে! কারণ অতীতে কোনো সরকারকে নিজ দলের কারও বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি। 

তাদের মতে, বিএনপি সরকার সত্যিকার চাঁদাবাজদের দু-একজনকে ধরলে দেশে চাঁদাবাজি অর্ধেকে নেমে আসবে। আর যদি পুরো মাত্রায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার শুরু করে তাহলে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হতে বাধ্য। 

সূত্রগুলো বলছে, সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের গ্রিন সিগনাল পেয়ে লাগাতার অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করে ‘অলআউট’ অ্যাকশনে নেমেছে তারা। 

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি মহানগর এলাকা, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ইউনিটকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজির মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী সে যে দলেরই হোক, যত বড় নেতাই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যৌথ অভিযান শুরু করার কথা বলেছেন। সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা যৌথ অভিযান চালাচ্ছি। গত ১ মে থেকে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। 

সূত্র বলছে, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের দমনে পুলিশের পক্ষ থেকে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বিট পুলিশিংয়ের আদলে কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কমিটির নাম হতে পারে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি, কমিউনিটি পুলিশিং বা বিট পুলিশিং। ওইসব কমিটিতে মসজিদ, স্কুল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে। 

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখনই অভিযান পরিচালনা করে যখন অপরাধটা মহামারির আকার বা একটা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাছাড়া অতীতে এ ধরনের অভিযানে মূল চাঁদাবাজরা গ্রেফতার হওয়ার নজিরও তেমন নেই। তবে ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পরের নির্বাচিত সরকার মূল চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। 

তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাভাবনা অনেক ইতিবাচক এবং ব্যতিক্রমধর্মী। এটা নেতাকর্মীদেরও ধারণ করতে হবে। যখন প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাচেতনা, দেশ নিয়ে ভাবনা, দেশপ্রেম বিএনপির সব নেতাকর্মীর মধ্যে থাকবে তখন দেশ অনেক এগিয়ে যাবে। 

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান গণমাধ্যমকে বলেছেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ইউনিটভিত্তিক কঠোর অভিযান চলছে। এর পাশাপাশি থানায় চাঁদাবাজির যে মামলাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর তদন্ত এগুচ্ছে কিনা তা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির মামলাগুলো তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে কোনো অবস্থাতেই পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ঢাকা রেঞ্জের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে লাগাতার অভিযান অব্যাহত আছে। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল, এমনটি জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার যে কোনো মূল্যে দেশকে চাঁদাবাজ মুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের সামনে এ মুহূর্তে জাতীয় কিছু ইস্যু রয়েছে। তবে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ মুহূর্তে বড় কাজ হচ্ছে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক সমূলে উৎপাটন করা। এ নিয়ে সরকার সিরিয়াসলি কাজ করছে বলে জানান তিনি। 

ঢাকা মহানগরীতে তিন দিনে গ্রেফতার ১৩৩ চাঁদাবাজ : ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম বিভাগের ভিত্তিতে এক হাজার ২৫৪ জন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকায় থানাভিত্তিক চাঁদাবাজদের নাম রয়েছে। তালিকা ধরে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে ডিএমপি বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা বিভাগ। গত তিন দিনে ৬৫ জন তালিকাভুক্তসহ ১৩৩ জন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির আলামত জব্দ করা হয়েছে।

গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ছাড়াতে কেউ তদবির করলে ধরে নেওয়া হবে সেও চক্রের সঙ্গে জড়িত। তদবিরে কাউকে ছাড়া হবে না। চাঁদাবাজ যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা, গণপরিবহণ ও নির্মাণাধীন ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট তৎপর হয়েছে বলে আলোচনা আছে। চাঁদার টাকা না পেয়ে হামলার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশে চাঁদাবাজ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা হালনাগাদ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। 

চাঁদাবাজদের নিয়ে র‌্যাবের তৈরি করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে চাঁদাবাজদের গডফাদার রয়েছে ৬৫০ জন। এসব গডফাদারের অধিকাংশেরই রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়, যা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলার প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ। এই তালিকায় প্রায় চার হাজার চাঁদাবাজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা পেয়ে চাঁদাবাজ গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে র‌্যাব। ১৫টি ব্যাটালিয়ন একযোগে অভিযান শুরু করেছে। আশা করছি খুব শিগগিরই ভালো ফলাফল আসবে। 

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে অতীতে দেখা গেছে, অভিযান পরিচালনা করে যাদের ধরা হয়, তারা মূল চাঁদাবাজ না। তারা অন্য কারো হয়ে কাজ করে। যার হয়ে বা যে গ্রুপের হয়ে কাজ করে সেই গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক নেতারা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। ফলে চাঁদাবাজদের মূল নেতা বা মূল পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেফতারের বাইরে রেখে এই অভিযানে মোটা দাগে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। 

ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, আমাদের দেশে যারা ক্ষমতায় থাকে, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সরকার প্রত্যেকেরই একটা সুবিধাভোগী নিজস্ব বাহিনী তৈরি হয়। তারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তার বা আক্রমণ করে এই চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, অভিযানের মাধ্যমে যারা চাঁদাবাজির মূল হোতা, যাদের নির্দেশে চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো ঘটে সেই হোতাদের খুঁজে বের করে এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, রাজনৈতিক দলের কাছে সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি। শুধু বক্তৃতায় বা বিবৃতি দিয়ে মানুষকে আশা দেখানোর পরিবর্তে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বর্তমান সরকারকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। 

ঢাকা মহানগরী এলাকায় যান চলাচলে গত দুই-আড়াই বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। সড়কে পুলিশ যেখানে নিরুপায়, সেখানে সাধারণ মানুষও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে। এখন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যানজট সৃষ্টি হলে পুলিশের পাশাপাশি প্রায়ই সাধারণ মানুষকেও ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। এ প্রেক্ষিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। এর অংশ হিসেবে যানবাহনের পাশাপাশি সড়ক পারাপারে আইন লঙ্ঘন করলে পথচারীদের নামেও হবে মামলা-জরিমানা। এ ছাড়া ট্রাফিক আইন অমান্যকারী পুলিশ সদস্য ও রাষ্ট্রের ভিআইপি গাড়িতে মামলা দিলে পুরস্কার ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা অমান্য করা প্রভাবশালী মহলের নিত্যকার ঘটনা। এ ছাড়া সড়কের পাশে গাড়ি পার্কিং করে যানজট সৃষ্টি করাও তাদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই নিরুপায় ট্রাফিক সার্জেন্টরা। সেই অবস্থা এখন আর নেই, ডিএমপির কমিশনারের স্পষ্ট নির্দেশ ট্রাফিক আইন অমান্যকারী গাড়ির মালিক যেই হোক মামলা হবে।

গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। আগের মতোই চলছে ট্রাফিক পুলিশ। জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে পথচারীদের পারাপারেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। আবার ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়া পথচারীদেরও পারাপারে বাধা দিতে দেখা গেছে। তবে অনেকাংশে সতর্ক থাকছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। ভিআইপিদের গাড়ির ক্ষেত্রে কৌশলী সার্জেন্টরা।

তারা ভিডিও মামলা করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক উপ-পুলিশ কমিশনার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পথচারী সিগন্যাল লাইট বসানো হয়েছে। তবে মামলার ক্ষেত্রে একটু সময় নেওয়া হবে। আগে সাধারণ পথচারীদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরপর ধাপে ধাপে আইন প্রয়োগ করা হবে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক আইন অমান্য করার অপরাধে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ঢাকা মহানগর এলাকায় যানবাহনের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৮ হাজার ৩৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৫৮ হাজার ৪২৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১ হাজার ৬১টি ও মার্চে ২৮ হাজার ৫৫০টি মামলা হয়েছে।

এ সময়ের মধ্যে ৮ হাজার ৫১টি বাস, ৪ হাজার ৯৭৫টি ট্রাক, ৬ হাজার ৬৪টি কার্ভাডভ্যান, ১৩ হাজার ৮৫২টি প্রাইভেটকার, ১৫ হাজার ২টি কার/জিপ, ২ হাজার ৮১১টি মাইক্রোবাস, ৬ হাজার ৭১৪টি পিকআপ, ২৭৬টি হিউম্যান হলার, ৪৮টি ব্যাটারিচালিত আটোরিকশা, ৪৯ হাজার ৯৭৭টি মোটরসাইকেল ও ৩৬১টি অন্যান্য যানবাহনে মামলা করেছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়া গেল এপ্রিল মাসের ১৬ দিনে ডিএমপির আটটি ট্রাফিক বিভাগ সড়ক আইন অমান্য করার অপরাধে ২৮ হাজার ৮৯টি মামলা করেছে। এই সময়ে তারা ৫ হাজার ৪৩২টি গাড়ি ডাম্পিং ও ২ হাজার ৭২০টি গাড়িতে রেকার বিল করেছে।

সম্প্রতি ট্রাফিক আইন অমান্য করার অভিযোগে পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিদর্শকের সরকারি গাড়িতে ভিডিও মামলা করে ট্রাফিক পুলিশ। পরে মামলার কপি আইজিপির নামে পুলিশ সদর দপ্তরে চলে যায়। ডিএমপির এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন আইজিপি। পরে ওই পরিদর্শকের এক দিনের বেতন কর্তন করা হয়। এরপর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ট্রাফিক বিভাগে। ‘অন্যায় নিজে করব না, অন্যকে করতে দিব না’ এখন এই সেøাগানে চলছে পুলিশ।

ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত একাধিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমনিতেই অনেক সড়কে নির্ধারিত স্থান ছাড়া ইউটার্ন করতে না দেওয়ায় বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়। এরপর মামলা দেওয়ার কথা শুনলে তো...। এ জন্য ডিএমপি সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ভিডিও মামলা দেওয়া হচ্ছে এসব গাড়ির বিরুদ্ধে। পরে বাসায় মামলার কাগজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সার্জেন্ট দেশ রূপান্তরকে বলেন, কমিশনার স্যারের নির্দেশে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোরভাবে কাজ করছে ট্রাফিক বিভাগ। তারপরও মাঝে মধ্যে ভয় হয়। মামলা করার নির্দেশনা থাকলেও কোনো ঝামেলা হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেন না। সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। পুলিশের আচরণে এ বিষয়ে পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে এখনো কঠোর সতর্ক থাকতে হয়।

চলতি বছরের ১ মার্চ রাতে রাজধানীর গুলশান এলাকায় নম্বর প্লেটবিহীন বেআইনি সুবারু স্পোর্টস কার থামিয়ে তল্লাশি ও কাগজপত্র যাচাইয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গুলশান বিভাগের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। গাড়িতে ‘ডাক্তার নাহিয়র’ লেখা নেমপ্লেট ছিল। তল্লাশির সময় গাড়িতে থাকা ব্যক্তির পক্ষে বিদেশ থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেন। তবে পুলিশ বলছে, বিষয়টি নিয়মিত বদলির অংশ। তারপরও বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক সদস্যদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। কার গাড়িতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আবার ঝামেলায় পড়তে হয় এমনটা বলছেন তারা।

ডিএমপি সদর দপ্তরের ঘোষণার পর থেকে ঝটিকা অভিযানে নেমেছে ট্রাফিক বিভাগ। প্রায় দিনই ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অভিযান করছে পুলিশ। এ সময় তারা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বাস ও ট্রাকের বিরুদ্ধে সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরে দাঁড়ানো ও মাথায় হেলমেট না থাকার মামলা হচ্ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঢাকা মহানগরে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক আইনভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থায় শতভাগ আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে ম্যানুয়াল মামলা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে স্বয়ংক্রিয় মামলা পদ্ধতি চালু করতে হবে। এতে ঝুঁকি ও যানজট উভয়ই কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সড়কে যানবাহনের পাশাপাশি যত্রতত্র পথচারী পারাপারের বিষয়ে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগটি ভালো হয়েছে। অনেক সময় পথচারীদের অসচেতনায়ও দুর্ঘটনা ঘটে।City & 

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, পুলিশ এখন ডিজিটাল মামলার দিকে যাচ্ছে, যেখানে ভিআইপি ও পুলিশের গাড়িতে মামলা দিতে পারলেই পুরস্কার পাবেন সার্জেন্টরা। এ ছাড়া লাল বাতি, জেব্রা ক্রসিং, যত্রতত্র গাড়ি থামানো, উল্টো চলাচল ও বাম লেন ব্লক করলেই মামলার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় যত্রতত্র পারাপার করলে পথচারীদের বিরুদ্ধেও আইনগত নেওয়া হবে।

সোনারগাঁও ও গুলশান-২সহ ১৬টি স্থানে পথচারীদের উদ্দেশে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া শাহবাগসহ রাজধানীর অনেক সড়কে পথচারী পারাপারে সিগন্যাল লাইট বসানো হয়েছে। সবুজ বাতি জ¦লার আগে কোনো পথচারী রাস্তা পার হলেই মামলা-জরিমানা করা হবে। এর পাশাপাশি ট্রাফিক এডুকেশন পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়