ছোট যানবাহনের এই জ্বালানি বিক্রির জন্য তারা সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন সরকারের কাছে। তবে ডিজেল বিক্রি চলবে নিরিবচ্ছিন্নভাবে।
পেট্রোল পাম্প মালিকরা ‘দুষ্টু ছেলেদের বিশৃঙ্খলার ভয়ে’ রাতের বেলায় পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখতে চান। এছাড়া ট্যাংক লরির চেম্বার ভর্তি করে তেল দেওয়া, মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করাসহ নিরাপত্তার দাবিও জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তেল থাকা অবস্থায় পাম্পে বিক্রি বন্ধ রাখা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন পাম্প মালিক নেতারা।
সংগঠনটির সভাপতি নাজমুল হক সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বলেন, “বর্তমান জ্বালানি তেলের পরিস্থিতিতে আমাদের অনৈতিক ক্ষুধা দূর না হলে সংকট কাটবে না।”
সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি ও প্রস্তাব সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন নাজমুল হক। সেগুলো হল–
• পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে হবে।
• বাস্তবতার নিরিখে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করতে হবে।
• বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবতার আলোকে ক্রেতাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
• পেট্রোল পাম্পের ট্যাংক শূন্য হয়ে গেলে তেল নিতে হুমড়ি খেয়ে পরা থেকে বিরত থাকতে হবে।
• পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির সময়সীমা সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করতে হবে।
• ট্রাঙ্ক লরির ধারণক্ষমতা সাড়ে চার হাজার লিটার, সে অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে হবে।
• সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
• অযথা পেট্রোল পাম্পে হামলা ও পেট্রোল পাম্প মালিকদের উপর একতরফা দোষারোপ করা যাবে না।
সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পেট্রোল-অকটেন বিক্রির সময়সীমা চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নাজমুল হক বলেন, "রাতের বেলায় দুষ্টু ছেলে, শয়তান লোকজনের আমদানি বেশি হয়। সে কারণে রাতের বেলায় শৃঙ্খলা রক্ষা করা যাচ্ছে না। তাই আমরা বলছি রাতের বেলায় পেট্রোল-অকটেন দেওয়া যাবে না।
“তবে হাইওয়েসহ সারা দেশের পাম্পগুলোতে ডিজেল সরবরাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে করা হবে, যাতে আমজনতার বাস-ট্রাকের চলতে কোনো সমস্যা না হয়।"
তেল পাম্পের সময়সূচি নিয়ে প্রস্তাবের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হক বলেন, "সারা পৃথিবীতেই এখন সময়সূচি মেনে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক দেশ পাবলিক পরিবহন ফ্রি করে দিয়েছে, যাতে মানুষ তেল পাম্পে ভিড় না করে। এখন রাত ২টা-৩টার সময় যদি তেল পাম্পে হামলা করে বসে, আগুন দিয়ে দেয়, তাহলে কে সামাল দেবে বলেন!
“একটা পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার রাতের বেলা তেল বিক্রি করে বাড়ি যাওয়ার সময় তাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তার মানে কত ক্রোধ থাকতে পারে! এই ধরনের পরিস্থিতির দায়িত্ব কে নেবে বলেন?"
ট্যাংক লরি ভরে তেল না দিলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে জানিয়ে নাজমুল হক বলেন, "ট্যাঙ্ক লরির চেম্বার ফুল করে দিতে হবে। সাড়ে চার হাজার লিটার করে এক একটা লরিতে আঁটে। সেখানে দুই হাজার লিটার তেল দিলে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
“যাকেই দেন, সপ্তাহে একবার দেন, মাসে একবার দেন তবু চেম্বার ফুল করে দিতে হবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে গাড়ি ডিপো থেকে বের হবে, চেম্বারটা যেন ফুল থাকে। চেম্বার খালি থাকলে সেখানে চুরির শঙ্কা থেকে যায়।"
সরকার বলছে তেলের কোন সংকট নেই। কিন্তু বেশিরভাগ পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো খোলা আছে সেগুলোতে অসহনীয় ভিড়। তেলের সংকট না থাকলে এই অবস্থা কেন তৈরি হল–সে ব্যাখ্যা চেয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
জবাবে নাজমুল হক বলেন, "আমি একেবারে দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যারা অন্যায় অনিয়ম করবে তার দায়ভার তাদের। এরকম যদি কোনো পেট্রোল পাম্প করে থাকে, আমি সরকারকে বলব তার ডিলারশিপ বাতিল করে দিতে। আমার জানা নাই এরকম কত শতাংশ পেট্রোল পাম্প করছে।
“একটা জিনিস আপনাদের বুঝতে হবে। একটা পেট্রোল পাম্পের ট্যাংকের পুরো তেল সাকশন করে ফেললে পরবর্তীতে সেখানে তেল ঢালতে গেলে সেখানে এয়ার লক হয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে পাইপগুলো চেক করে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করতে ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।
“সে কারণে পেট্রল পাম্পগুলোর ট্যাংকে অন্তত ২০০-৪০০ লিটার তেল থাকা অবস্থায় সেটাকে অফ করতে হয় (সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করতে হয়)। না হলে পরের বার ট্যাংকে তেল ঢালার পর লাইন চেক করতে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় লেগে যায়।”
তিনি দাবি করেন, তেল থাকা অবস্থায় তেল না দেওয়ার সুযোগ এখন কোনো পেট্রোল পাম্পের নেই, কারণ এখন প্রত্যেকটি পেট্রোল পাম্পের ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
“মালিকের এখানে আর করার কিছু নেই। কতটুকু তেল আসছে, কয়টা পর্যন্ত দেবেন, কাকে কতটুকু দেবেন, সেটা নির্ধারণ করছেন তিনি (ট্যাগ অফিসার)।"
বন্ধ পেট্রলপাম্পগুলো খোলার ব্যবস্থা করা হবে কিনা জানতে চাইলে নাজমুল হক উল্টো প্রশ্ন করেন, "কোন পাম্প বন্ধ আছে?"
বহু পাম্প তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে, তেল থাকা অবস্থায় বিক্রি বন্ধ রাখায় অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে–সে বিষয়গুলো তুলে ধরা হলে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, "যে অনিয়ম করবে তার সাজা হবে এটা তো স্বাভাবিক। আমি তো বলছি না যে আমার শতভাগ লোক পরিশোধিত।"
পেট্রোল পাম্পগুলো তেল মজুদ করে কালোবাজারে বিক্রি করছে–এমন অভিযোগ তোলেন একজন সাংবাদিক। জবাবের নাজমুল হক বলেন, "আমরা তো বলছি কেউ যদি অনিয়ম করে তার সাজা হোক। কিন্তু এখন এমনও দেখা যাচ্ছে বাইকাররা পেট্রোল পাম্প থেকে তেল কিনে বাইরে তেল বিক্রি করে দিচ্ছেন।"
এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে নাজমুল হকের কিছুটা বাগবিতন্ডা হয়।
পরে নাজমুল হক দাবি করেন, "এখন এমন কোনো বাড়ি নাই যার খাটের তলে ২-৪ লিটার পেট্রোল পাওয়া যাবে না। আপনারাই তো এসব প্রচার করছেন, আপনারাই দেখাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “এখনতো ট্যাগ অফিসার সকালবেলা গিয়ে রিডিং নেবে যে গতকাল কতখানি বিক্রি হয়েছে। তেল ঢালবে, এরপর বিক্রি শুরু হবে। এখানে তো আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই। আমাদের দায়িত্ব সরকার আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেছে।
“তবে আমাদের ভেতরেও যে কিছু দুষ্টু এলিমেন্ট আছে, সেটা তো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তবে পার্সেন্টেজটা কত? আপনারা যেভাবে ঢালাওভাবে বলছেন পেট্রলপাম্প থেকে দেদারসে তেল বাইরে চলে যাচ্ছে, তাহলে সেটা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়।”
নাজমুল হক বলেন, “আপনারা কি আগে এভাবে হুমড়ি খেয়ে তেল নিয়েছেন? আমাদেরও তো ডেলিভারি করার একটা ক্যাপাসিটি আছে। আমরা না হয় অসৎ, কিন্তু এই যে ট্রাস্ট (আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট) পাম্পে সারাদিন ধরে তেল দিচ্ছে, দিনে ৬৫-৬৬ হাজার লিটার তেল পাচ্ছে ওরা। এই তেলগুলো কোথায় যাচ্ছে বলেন তো? গাড়িওয়ালা, মোটরসাইকেলওয়ালাদের কাছেই তো বেচতেছে।
"সরকার তো এমন কথাও বলেছে যদি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে যার পাম্পের ট্যাঙ্কে যতগুলো তেল আছে সেগুলো বিক্রি করার পর নতুন মূল্য কার্যকর হবে।"
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এই ১৮ কোটি মানুষের দেশে ২১৯৮টি পেট্রোল পাম্প চালু আছে। টোটাল পাম্প ২৩২৯টা। আমাদের তো তেল বিক্রির একটা হিস্ট্রি আছে। সে অনুযায়ী সরকার আমাদের তেল দিচ্ছে। এমন পাম্প আছে যার দৈনিক বিক্রি এক থেকে দেড় হাজার লিটার। এখন সেখানে যদি হাজার হাজার মোটরসাইকেল যায় পাম্প তো ড্রাই হবেই।
“এখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তেল বিক্রি শেষ হয়ে গেলে আমাদের তো পাম্পে বাঁশ টানানো ছাড়া উপায় নাই। যে সিক পাম্পগুলো রয়েছে যাদের তেল বিক্রি কম, তাদেরকে তো কম পরিমাণেই তেল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও তো লম্বা লাইন।"
এখন প্রতিদিন তেলের চাহিদা কত জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী বলেন, "এখন ডিমান্ড কত সেটার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। এই ডিমান্ড আনলিমিটেড। সেটা কোনোভাবে ক্যালকুলেট করা যাবে না। আমাদের এখনকার ফর্মুলা হচ্ছে, আমরা ডিপো থেকে তেল নিয়ে ট্যাংকে ঢালার পর যতক্ষণ কাস্টমার পাব, তেল দিয়ে দেব। আর কোনো পাম্প যদি ট্যাংকে তেল থাকা অবস্থায় তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়, তাহলে এটা একটা অপরাধ। তার জন্য যে সাজা হচ্ছে হোক।"
চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না দাবি করে নাজমুল হক বলেন, "আমরা এখনকার চাহিদার কথা বলছি। সে অনুযায়ী সরকার জীবনেও তেল দিতে পারবে না, আমাদের কর্মচারীদেরও সেটা বেচার ক্যাপাসিটি নেই। আগে যে পাম্প ৫ হাজার লিটার বেচত, এখন সেখানে ২৫ হাজার লিটার চাহিদা দাঁড়িয়েছে।
“আগে আমি সাড়ে চার হাজার হাজার লিটার পেট্রোল নেওয়ার তিন দিন পর আরো সাড়ে চার হাজার লিটার পেট্রোল নিতাম। এখন একদিনেই ১০ হাজার লিটার বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এটা কি চাহিদা হল! এটাতো অস্বাভাবিক চাহিদা। কাজেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সে চাহিদার তুলনায় আমরা তেল সরবরাহ পাচ্ছি না, এটা খুবই ক্লিয়ার। এটা সম্পূর্ণ একটা প্যানিক বায়িং।”
তিনি বলেন, “আমাদেরকে যত ব্লেমই করেন, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে একটু বিবেচনা করেন। আমরা বলতে চাই আপনারা সুনির্দিষ্ট ভাবে বলুন কোন পাম্প তেল থাকা অবস্থায় তেল বিক্রি করছে না।" সূত্র: বিডিনিউজ২৪