প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. শোয়েব সাঈদ: ওমিক্রন পিকের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

ড. শোয়েব সাঈদ: ওমিক্রন ঢেউ বেশ জোরালোভাবে অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশে। অনেকের প্রশ্ন আর উৎকণ্ঠা এই ঢেউ কখন শীর্ষে যাবে, কখন নেমে আসবে, কবে মুক্তি পাব এই উপদ্রবের হাত থেকে।

কোভিড মহামারি বিশেষজ্ঞদের মতে ঢেউয়ের উঠা নামার সময় সম্পর্কে পূর্বাভাস কঠিন বিষয়। সাধারণত পিক থেকে নামা শুরু হলে বলা যায় পিক থেকে নামছে। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমিওলজিস্ট কলিন ফারনেসের মতে পিকটাকে সম্মুখ দৃষ্টিতে দেখা যায় না, দেখতে হয় গাড়ীর রিয়ার গ্লাস ভিউয়ের মত অতিক্রান্ত অবস্থায়।

তবে ওমিক্রনের কিছু ট্রিপিক্যাল বৈশিষ্ট্যের কারণে ওমিক্রন ঢেউয়ের বিশ্ব পরিস্থিতির তথ্য উপাত্ত বিবেচনায় নিয়ে কিছু ধারণা করা যেতে পারে।

ওমিক্রনের প্রথম দিককার শিকার হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। সর্বোচ্চ দৈনিক ৩৮ হাজার সংক্রমণ নিয়ে ঢেউয়ের পিক সময় ছিল ২০২১ সালের ১০ই ডিসেম্বর থেকে দিন দশেক। ডিসেম্বর মাসে সপ্তাহ চারেক ওমিক্রন বেশ ব্যস্ত রেখেছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

কানাডা মূলত ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ থেকে বেশ ভুগছে ওমিক্রন নিয়ে। সর্বোচ্চ দৈনিক ৫০ হাজার সংক্রমণ নিয়ে ঢেউয়ের পিক সময় সপ্তাহ দুয়েক স্থায়ী হবার পর এখন নিম্নমুখী প্রবণতা দৃশ্যমান। আগামী সপ্তাহ থেকে শিথিল হচ্ছে বিধি নিষেধ। কানাডার সপ্তাহখানেক আগে শুরু হওয়া ওমিক্রন ঢেউয়ে একই চিত্র যুক্তরাজ্যে, গ্রাফ নিম্নমুখী।

ওমিক্রন ঢেউয়ের স্থায়িত্ব আর দ্রুত উঠা নামায় দক্ষিণ আফ্রিকা আর পশ্চিমা দেশগুলোর আপাতত মিল থাকলেও, সংক্রমণের মাত্রায় পার্থক্য আছে। ডেল্টার তুলনায় ওমিক্রনে পশ্চিমারা যেখানে ৪-৫ গুন বেশী সংক্রমিত, দক্ষিণ আফিকায় সেখানে মাত্র দেড়গুন।

বাংলাদেশে ডেল্টায় কাগজে কলমে সর্বোচ্চ দৈনিক ১৬ হাজার সংক্রমণ ছিল। এখন ওমিক্রন সংক্রমণে পশ্চিমাদের ধারা বাংলাদেশের ভাগ্যে জুটলে দৈনিক সংক্রমণ হতে পারে ৬০-৭০ হাজার, কিন্তু সেই ক্ষেত্রে দৈনিক লক্ষ লক্ষ মানুষের টেস্ট করতে হবে। আর দক্ষিণ আফ্রিকার ধারা জুটলে হতে পারে ২০-২৫ হাজার।

পহেলা জানুয়ারি থেকে আজতক গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশে সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ১০ গুন। এক্ষণে ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। জানুয়ারির শেষের দিকে পিকের কাছাকাছি চলে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। বাংলাদেশে ডেল্টার পিক কিন্তু বেশ লম্বা হয়েছিল, প্রায় দু মাস। ওমিক্রনের ধরণটা একেবারের ভিন্ন হবার কারণে পিক সময় দীর্ঘ হবার সম্ভাবনা কম, নামতে শুরু করলে অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও দ্রুত নেমে যাবে।

ভারতের চিত্রও একই, জানুয়ারির শেষ নাগাদ পিক বুঝা যাবে। ভারতে ডেল্টায় সংক্রমণ দৈনিক ৪ লাখে দাঁড়িয়েছিল। এখন ওমিক্রনে তিন লাখ ছুঁই ছুঁই করছে। দৈনিক সংক্রমণ মিলিয়ন ছাড়ায় কিনা অপেক্ষার পালা। দক্ষিণ আফ্রিকার মত হলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে।

ওমিক্রন সংগ্রামে পশ্চিমাদের ডাবল টিকাদান আর বুস্টার ডোজ বেশ কাজে দিয়েছে। বাংলাদেশের সেই সুবিধে কম থাকলেও কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের ইমিউনিটির অদৃশ্য সক্ষমতা আবারো কাজে লাগবে বলে আশা করছি।

ওমিক্রনের দ্রুত সংক্রমণ সক্ষমতার বিপরীতে মৃদু উপসর্গ নিয়ে আমরা সবাই কমবেশি জানি, বিস্তারিত আগের লেখায় বলেছি আর তাই এই পথে যাচ্ছি না। ভিন্ন একটি বিষয়ে বলছি।

ওমিক্রনে আক্রান্ত কিনা প্রচলিত টেস্টে আমরা কিন্তু তা জানছি না এবং সেটি জানার প্রয়োজনও নেই। বহুল ব্যবহৃত এন্টিজেন টেস্টে কোভিড পজিটিভ হলে তার সাথে ওমিক্রনের বিশেষ লক্ষণগুলো নির্দেশ করছে এটি ওমিক্রন।

পিসিআর টেস্টে মূলত তিনটি টার্গেট থাকে, স্পাইক জিন সনাক্ত করা যার অন্যতম। ওমিক্রনের ক্ষেত্রে স্পাইক অঞ্চলে মিউটেশনের ফলে স্পাইক জিনটি সনাক্ত করা যায় না। তখন জিন বিশ্লেষণ করে কনফার্ম করা হয় এটি ওমিক্রন। একই প্রবণতা আলফা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে কিন্তু আলফা এখন হারিয়ে গেছে, ফলে স্পাইক বা এস জিনটি শনাক্ত করা বা না করার উপর বুঝা যায় ওমিক্রন কিনা। ওমিক্রনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পিসিআর টেস্ট এখন শুধু গবেষণা আর বিশেষ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, রোগ নির্ণয়ে এন্টিজেন টেস্টই যথেষ্ট।

বাংলাদেশের জনগণ মিডিয়ায় বহুল চর্চিত এন্টিবডি টেস্টের কথা নিশ্চয় ভুলে যায়নি। প্রবল জনমতের বিপরীতে বিজ্ঞানের মান সন্মানের প্রশ্নে সাহস করে শুরু থেকেই এটির অসারতার কথা বলে আসছিলাম। কোভিডের এই দু বছরে বিশ্বের কোথাও এর চর্চা নেই।

শেষে বলতে চাই, মাস্কই বাংলাদেশের বুস্টার ডোজ। মাস্ক, স্যানিটাইজার, ভিড় এড়িয়ে চলা সহ সরকারি নির্দেশনা মেনে চললে মাস খানেকের মধ্যে আমরা আরেকটি সংকট পেরিয়ে যেতে পারবো হয়তো।

কোভিড প্যানডেমিকের এনডেমিক হয়ে যাওয়া অর্থাৎ সাইক্লোন থেকে নিম্নচাপে রূপ নিলে আমরাও যে হাফ ছেড়ে বাঁচি!

 

লেখকঃ কলামিস্ট এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োটেকনোলজিস্ট। কানাডার একটি বহুজাতিক কর্পোরেটে ডিরেক্টর পদে কর্মরত।

সর্বাধিক পঠিত