প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উৎপাদনের মাধ্যমে আবারো সুদিনে ফিরতে চায় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড

মঈন উদ্দীন: বর্তমান সরকার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সুদিন ফেরাতে একনেকে পাশ করেছে ১৫৩ কোটি টাকার ৪টি প্রকল্প। এতে বাংলাদেশের রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বৃহত্তর রংপুরসহ অন্যান্য জেলায় রেশম চাষ ও তার উৎপাদনের মাধ্যমে আবারো সুদিনে ফিরতে চায় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তির পর রেশম কাপড়ের চাহিদাও বেড়েছে। বিশেষ করে রেশম কাপড়ের। বর্তমানে রেশম চাষীদের উৎপাদিত রেশম গুটি থেকে কারখানার সামনের রেশম ডিসপ্লেতে মিলছে খাঁটি রেশম পণ্য যেমন- প্রিন্টেড শাড়ী, টু-পিস, থান কাপড়, ওড়না, স্কার্ফ, টাই ইত্যাদি। নানা জটিলতার কারণে ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার বন্ধ করে দেয় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম কারখানা। টানা ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৮ সালে পুণরায় চালু হয় কারখানা। রাজশাহীতে রেশমের ঐতিহ্যের কারণে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতিও মিলে।

বাংলাদেশ রেশম বোর্ডের ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা গেছে, একসময় ভারতীয় উপমহাদেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রেশম বস্ত্রের বেশ কদর ছিল। সে প্রেক্ষাপটে বৃটিশরা ১৮৯৮ সালে রাজশাহীতে একটি রেশম কারিগরি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তির পর সাবেক পূর্ব পাকিস্তান দুটি রেশম নার্সারি লাভ করে, যার একটি বগুড়ায়, অন্যটি রাজশাহীর মীরগঞ্জে করা হয়। রেশম উৎপাদন প্রকল্প ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই ১৯৭৭ সালে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেশম বোর্ডের সৃষ্টি হয়।

রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ড. এম. এ মান্নান বলেন, ‘রেশম শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে ইতিমধ্যে আমরা বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বর্তমানে গবেষণা কার্যক্রমসহ রেশম সম্প্রসারণে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহীসহ সারাদেশে ৪টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রেশম চাষ সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে পার্বত্য জেলাসমূহে উপজাতি ও উপজাতি নয় এমন হতদরিদ্র ১০ হাজার ব্যক্তির কর্মসংস্থান করা, বিশেষ করে মহিলাদের।

এছাড়া, পার্বত্য জেলাসমূহে রেশম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১২ মেট্রিক টন কাঁচা রেশমের নতুন উৎস সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান। বৃহত্তর রংপুর এলাকায় ১৫ হাজার হতদরিদ্র ও ভূমিহীন বিশেষ করে মহিলাদের রেশম চাষে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর আরেকটি প্রকল্প চলমান। এতে রেশমের বিভিন্ন বিষয়ে দুই হাজার ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে রেশম চাষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা চলছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৮ মেট্রিক টন কাঁচা রেশমের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব, যা দেশীয় চাহিদা পূরণ করবে।

এই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশ রেশম শিল্পের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এ সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় আনা হবে হতদরিদ্র ও ভূমিহীনদের, বিশেষ করে মহিলাদের। এতে করে রেশম চাষ বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। শুধু তাই নয়, এসকল হতদরিদ্র মানুষদের রেশম চাষের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তাদের দ্বারা রেশম গুটি ও কাঁচা রেশমের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুমন ঠাকুর জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড রেশম শিল্পের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের মাধ্যমে রেশম চাষীদের রেশম ডিমসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামাদি বিনা মূল্যে সরবরাহ করছে। এমনকি পলু পালনের জন্য পলু ঘরও রেশম চাষীদের তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এপর্যন্ত বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে ৩৫টি আইডিয়াল রেশম পল্লী ও ৪৯৬টি তুঁতব্লক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ফার্মিং পদ্ধতিতে রেশমের চাষ হচ্ছে। এতে উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড ৫টি আঞ্চলিক কার্যালয়, ৭টি জোনাল কার্যালয়, ৪১টি রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের মাধ্যমে রেশম সম্প্রসারণের কাজ করছে বলে জানান জনসংযোগ কর্মকর্তা।

এদিকে রেশম বোর্ডের প্রধান উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বিভাগের কর্মকর্তা জেরিন মৌসুমী কান্তা বলেন, ২০১৮ সালে কারখানা চালু হওয়ার পর থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ মিটার কাপড় উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে আভন্তরিন সুতার চাহিদা রয়েছে ৩০০ মেট্রিক টন। চলমান ৪টি প্রকল্প থেকে আরও ৪১ মেট্রিক টন রেশম গুটি উৎপাদন সম্ভব হবে। এপর্যন্ত গুটি উৎপাদন হয়েছে ১৬.৭৯ লক্ষ কেজি এবং তা থেকে রেশম সুতা তৈরি হয়েছে ১২ হাজার ২১১ কেজি। এছাড়া রাজশাহী রেশম কারখানায় এপর্যন্ত কাপড় উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৩ মিটার।

তিনি বলেন, রাজশাহী রেশম কারখানায় প্রায় ৪১ জন দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক কাজ করছে। রাজশাহী রেশম কারখানায় চায়না ও কোরিয়া থেকে ষাটের দশকে কেনা ৪৩টি তাত মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মেশিন পুণরায় ঠিক করে তাতে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৫৫ গজ কাপড় উৎপাদন হচ্ছে। মাসে হিসেবে ১২০০-১৩০০ গজ কাপড় উৎপাদন হয়।

২০১৮ সালে কারখানা চালুর পর থেকে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকার কাপড় বিক্রি হয়েছে। রেশমজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক বিক্রয়ের ব্যবস্থা হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী ও গাজীপুরে রেশম পণ্যের দুটি শো-রুম রয়েছে।

পরিচালক ড. এম এ মান্নান বলেন, ‘রেশমের পুরনো ঐতিহ্য, গুণগতমান ও জনপ্রিয়তার কারণে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে রেশম কাপড়ের চাহিদা রয়েছে। অভিজাতদের প্রথম পচ্ছন্দ রেশমজাত পণ্য। তবে প্রচার প্রচারণা অভাবেই আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি পিছিয়ে আছে। জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সময়োপযোগী নতুন পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। লক্ষ্য রয়েছে পুণরায় রেশম শিল্পের সুদিনে ফেরার।’

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত