প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মিরাজুল ইসলাম: হুমায়ূন আহমেদ এবং চলচ্চিত্র

মিরাজুল ইসলাম: মূলত দুটো ঘটনা হুমায়ূন আহমেদকে অমরত্বের সন্ধান দিয়েছিলো।১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ এবং ১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমনি’ সিনেমার পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ছিলো তাঁর জীবনের বিশেষ ঘটনা। ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটির হাত ধরে আসে শঙ্খনীল কারাগার। আবার ১৯৯২ সালে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমার চিত্রনাট্য লেখার সুবাদে তিনি উপলব্ধি করেন সিনেমা নির্মাণে তাঁর সহজাত প্রতিভা রয়েছে। যেহেতু তিনি জানতেন নাটক ও সিনেমার ভাষা ভিন্ন। একজন সফল নির্মাতার পক্ষে এই জানাটা বিশেষ জরুরি। ১৯৮৩ সালে ‘প্রথম প্রহর’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে হাতেখড়ি। এরপর ২০১২ সালে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত হুমায়ূন ক্রমশ ছোট পর্দার দর্শকদের মাঝে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন পরবর্তী তিন দশক। কিন্তু চলচ্চিত্রে মনোযোগী হওয়াটা ছিলো চ্যালেঞ্জিং বিষয়। হুমায়ূন আহমেদ সেই মাধ্যমেও সফল হলেন তাঁর উপন্যাস এবং নাটকে জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায়। সাহিত্য এবং নাটকে তুমুল ব্যস্ততার মাঝে হুমায়ূন আহমেদ আটটি চলচ্চিত্র সরাসরি পরিচালনা করেছেন। সেই আটটি সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা ছাড়াও আরও সাতটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। তার মধ্যে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন ‘আগুনের পরশমনি’ এবং ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সূত্রে। সঙ্গে ‘আগুনের পরশমনি’ জিতেছিলো জাতীয় সেরা ছবির পুরস্কার।

হুমায়ূন আহমেদ নিজেও জানতেন চলচ্চিত্র একটি সম্পূর্ণ মাধ্যম। সাহিত্য, শিল্পকলা, সংগীত, অভিনয় ইত্যাদি সকল শিল্প মাধ্যম চলচ্চিত্রের মাঝেই একীভূত হতে পারে। কেবল সাহিত্য কিংবা কেবল নাটক হুমায়ূন আহমেদকে তৃপ্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিলো না। শরীরে ক্যান্সার বাসা না বাঁধলে চলচ্চিত্রে আরও মনোযোগী হতে পারতেন এই বহুমুখী প্রতিভাবান। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রগুলো দেখে মনে হয়েছে গতানুগতিক কমেডি ঘরানার নাটকে তিনি তৃপ্ত ছিলেন না। পাশাপাশি বাংলাদেশে প্যাকেজ নাটকের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের বাণিজ্যিক পরিচিতি তাঁর শিল্প অস্তিত্ব গতানুগতিক হয়ে পড়ছিলো। কিন্তু বিভিন্ন সাক্ষাৎকার-আলোচনায় বড় পর্দা, বড় ক্যানভাসের প্রতি তাঁর আকর্ষণ গোপন করেননি। অবশেষে চলচ্চিত্র মাধ্যমে হুমায়ূন যখন এলেন তখন চলছিলো ঢাকাই সিনেমার ক্ষয়িষ্ণুকাল। হুমায়ূন আহমেদ যখন চলচ্চিত্রে এলেন ততোদিনে তাঁর এক বিশাল মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির দর্শক তৈরি হয়ে গেছে। হুমায়ূন সিনেমা হলে নব্বই দশকে কিছুটা প্রাণ সঞ্চার করলেন। নাটকে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলো সিনে-পর্দায় বিস্তার লাভ করলেও চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষায় ক্লোজ শটে পাত্র-পাত্রীর অভিব্যক্তি তুলে ধরা কিংবা আলো-ছায়ার প্রক্ষেপণে সিনেমাটোগ্রাফির কারিশমার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিলো লক্ষণীয়। চলচ্চিত্র মাধ্যমের নিজস্ব ভাষা তিনি বুঝতেন। নাটকের চরিত্রের সঙ্গে সিনেমার চরিত্রকে গুলিয়ে ফেলেননি। তাই দর্শকরা ‘অয়োময়’ কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের আসাদুজ্জামান নূর এবং ‘আগুনের পরশমনি’র ক্র্যাক প্লাটুন মুক্তিযাদ্ধা বদি’কে আলাদা সত্তা হিসেবে শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।

একইভাবে ‘শ্যামল ছায়া’ কিংবা ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সিনেমাগুলোর মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ সিনে-মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব লিগ্যাসি সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তাঁর গল্প বলার নিজস্ব রীতি ছিলো জহির রায়হান কিংবা খান আতা ঘরানা চেয়ে ভিন্ন। জীবন ঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাণে বিশাল ঘাটতিতে দর্শকদের বাধ্য হচ্ছিলেন কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রে আসক্ত হতে। হুমায়ূনসূত্রে বিপুল সংখ্যক দর্শক সেই সময় হলমুখী হয়েছিলেন। লেখালেখির মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ যেমন আমাদের পশ্চিম বাংলার লেখক বলয় থেকে একটি প্রজন্মকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, ঠিক সেভাবে চলচ্চিত্রে তিনি প্রমাণ করেছিলেন নিজস্ব দর্শক শ্রেণি সৃষ্টি করার মাধ্যমে। কিন্তু একক সামর্থ্যে হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র মাধ্যমে বেশি কাজ করে যেতে পারেননি। কারণ জীবনের শেষ বছরগুলোতে স্বাস্থ্যগত কারণের বাইরেও ব্যক্তিগত গণ্ডির মাঝে হুমায়ূন আহমেদ আটকেছিলেন।

যদিও একজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার হিসেবে বাংলা সিনেমা অবশ্যই তাঁকে মনে রাখবে। কিন্তু তাঁর সামর্থ্য ছিলো আরও ভালো সিনেমা উপহার দেওয়ার। আর তা সম্ভব হলে তাঁর ঠাঁই হতো জনপ্রিয়তার আপেক্ষিক মানদণ্ড ছাড়িয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের মহান চলচ্চিত্রকারদের সারিতে। এখনো সুযোগ আছে তাঁর গল্পগুলোকে সিনে-পর্দায় বাঁচিয়ে রাখতে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের রচনাসমূহ যতোটা সাহিত্য মূল্যমানে প্রায়োগিক, তার চেয়ে বেশি সংরক্ষিত হচ্ছে বিপণন এবং বাণিজ্যমুখী বাজার অর্থনীতির মানদণ্ডে। এই সংস্কৃতির জোয়ারে আগামীতে হুমায়ূন আহমেদ ছোট পর্দা পেরিয়ে বড় পর্দায় কতোটা দৃশ্যমান হবেন তা সময়ই বলে দেবে। লেখক ও চিকিৎসক

সর্বাধিক পঠিত