প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে ভাষা সন্ত্রাসীরা: সহিংসতার উস্কানি

সমকাল: কেউ বলছেন, ‘নৌকায় ভোট না দিলে কবরস্থানে জায়গা হবে না’; প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কেউ আরও এক পা এগিয়ে বলছেন, ‘শুধু একে-৪৭ নয়, প্রয়োজনে যা করা দরকার, সবই করব।’ চাইলে থানার সামনে দুই-তিন ঘণ্টা ধরে লড়াই করে থানাকে ‘হটায়ে’ দিতে পারেন, কাউকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে আনতে পারেন- এমন হুমকিও দিচ্ছেন কেউ।

ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনী প্রচারাভিযানে চলছে এ ধরনের উস্কানিমূলক কথাবার্তার প্রতিযোগিতা। চেষ্টা করা হচ্ছে এভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার, ভোটারদের আতঙ্কিত করে তোলার। এই ‘ভাষা সন্ত্রাসে’র মধ্য দিয়ে যে অসহিষ্ণুতা ও উস্কানির ইঙ্গিত ছড়ানো হচ্ছে, তা নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা এবং প্রাণহানিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, একটা গণতান্ত্রিক সমাজে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে এমন মধ্যযুগীয় হুমকির ঘটনা কল্পনাও করা যায় না।

এদিকে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) বরাবরের মতোই এ বিষয়ে নির্লিপ্ত রয়েছে। যদিও এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ জরুরি।

গত ৫ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের হুমাইপুরে এক প্রচারসভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহারের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘প্রশাসন আমাদের, পুলিশ আমাদের, সরকার আমাদের। আর কিছু বলার আছে? এমপি সাহেবের চোখ লাল হয়ে আছে। …উনার ইঙ্গিতেই আমি এগুলো বলছি।’

এর আগে গত ৩ নভেম্বর বুধবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার একটি ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর উদ্দেশে স্থানীয় এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘তুমি আওয়ামী লীগ করবা আর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মানবা না, তুমি এত বড় বাঘের বাচ্চা হতেই পারো না, তোমাকে আমরা বিড়াল বানিয়ে দেব।’

স্থানীয় ‘দরগাডাঙ্গা স্কুল ও কলেজ’ মাঠে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘কলমা ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে গিয়ে বলে দিবেন যে, কেউ নৌকার বিরুদ্ধে কথা বললে এবং নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করলে কলমার মাটিতে তার স্থান হবে না।’

ওই অনুষ্ঠানে ফারুক চৌধুরী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন, উন্নয়নকাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীকে খারাপ পরিণতির হুমকি দিয়েছেন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। ইসি-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, এমপির এ আচরণ নির্বাচনী আচরণবিধির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

৩ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও আসন্ন ইউপি ভোটে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. শাহ আলম ভোটারদের উদ্দেশে হুমকি দেন যে, ‘নৌকায় ভোট না দিলে কবরস্থানে জায়গা হবে না।’ ওই দিন ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মনির মার্কেট এলাকায় নৌকা প্রতীকের নির্বাচনী প্রচার কার্যালয় উদ্বোধনকালে তিনি এ হুমকি দেন। এর আগের ইউপি নির্বাচনেও পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসেন এই চেয়ারম্যান প্রার্থী। তিনি সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের ছোট ভাই।

ভোটারদের উদ্দেশে শাহ আলম স্থানীয় ভাষায় বলেন, ‘যারা যারা নৌকায় ভোট দেবেন না, তাদের চিহ্নিত করা হবে। তাদের কবরস্থানে কবর দিতে দেওয়া হবে না। এটা আমার কবরস্থান। সোজা কথা, আমার কবরস্থানে তাদের কবর দিতে দেওয়া হবে না। তাদের চৌধুরীপাড়ায় (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর এলাকা) নিয়ে কবর দিতে হবে। এমনকি তাদের মসজিদেও নামাজ পড়তে দেওয়া হবে না।’

এর আগে গত ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার তালবাড়িয়া ইউনিয়নের একটি এলাকায় নৌকার পক্ষে প্রচারাভিযান চালাতে গিয়ে জেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি রবিউল, আমি কুষ্টিয়া জেলার মাস্তান। আমাকে মাস্তানির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা দেখাতে চাইনি। কিন্তু কিছু লোক আমাকে ভালো থাকতে দিল না। ক্ষমতা কত প্রকার, এবার দেখিয়ে দিব। আমার যেসব ছেলেপেলে আছে, তাদের নিয়ে চাইলে আমি থানার সামনে দুই-তিন ঘণ্টা লড়াই করতে পারি, লড়াই করে থানাকে হটায়ে দিতে পারি।’

এ বিষয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ও ব্রতীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুরশিদ বলেন, বর্তমান কমিশন বারবার তার ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছে। এ ধরনের দু-একটি ঘটনায় শক্ত অবস্থান নিলে অন্যদের জন্য তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারত। কমিশনের নির্লিপ্ত আচরণের কারণে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রার্থীরা ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের চেয়ে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে চান। দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই এই কমিশনকে কোনো ঘটনায় শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নির্বাচনী প্রচারাভিযানে এমন অসহিষ্ণু ভাষা ব্যবহারের পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পৌরসভা ভোটে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম কৃক এক নির্বাচনী সভায় বলেছিলেন, ‘যাদের মনে ধানের শীষের সঙ্গে প্রেম আছে, তারা কী করবেন? ১৩ তারিখে ঠাকুরগাঁও ছেড়ে চলে যাবেন। ১৩ তারিখ সন্ধ্যার পরে তাদের দেখতে চাই না। তাদের ভোটকেন্দ্রে আসার কোনো প্রয়োজন নাই। তাহলে ভোটকেন্দ্রে যাবে শুধু কে? নৌকা, নৌকা আর নৌকা।’

এর এক দিন আগে ওই এলাকারই আরেকটি নির্বাচনী সভায় তিনি বলেন, ‘সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, যারা নৌকায় ভোট দিতে না চান, ১৩ তারিখ সন্ধ্যার পরে আপনাদের চেহারা এলাকায় দেখতে চাই না। কোথায় যাবেন, আমি জানি না। তবে ঠাকুরগাঁওয়ে থাকতে পারবেন না।’

ওই সময় সংবাদমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, মাহমুদা বেগমের বক্তব্য তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পরে এ সম্পর্কে আর কোনো পদক্ষেপের কথা জানা যায়নি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশনের আগে দায়িত্বে ছিল কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। এ সময় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যশোরের দুই এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। রকিবউদ্দীন কমিশন ওই দুই এমপিকে শোকজ করলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।

ইসি-সংশ্নিষ্টরা জানান, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যশোর-১ আসনে আফিল উদ্দিন ও যশোর-২ আসনে মনিরুল ইসলাম বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। তার আগে ১ জানুয়ারি জনৈক শাহিন উল কবীর এ দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ আনেন। তাতে বলা হয়, দুই প্রার্থী দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন- ‘প্রতিটি কেন্দ্রে ১০০ জন কর্মী কেন্দ্র দখল করবে। দুপুর ১২টার মধ্যে নৌকা প্রতীকের জয় নিশ্চিত করবে।’

রকিব কমিশনের গঠিত নির্বাচনী তদন্ত কমিটি এ অভিযোগের সত্যতা পায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে আফিল উদ্দিন ও মনিরুল ইসলামের নাম গেজেটে প্রকাশ না করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তারা আদালতের আশ্রয় নিলে কমিশন আর তাদের শুনানি গ্রহণ করেনি। পরে তাদের নাম এমপি হিসেবে গেজেট হয় এবং তারা দশম সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই কমিশন সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে। আগের কমিশন তবুও সমালোচনার মুখে দুই এমপিকে শোকজ করেছিল। বর্তমান কমিশনের আচরণে তাদের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। আইনে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেওয়ার পরও কমিশন কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে- এমন নজির নেই।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, এসব বিষয় দেখার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে রয়েছেন। তারা কাজ করছেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা রোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। একইভাবে নির্বাচন কমিশন নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, লোভের বশে মানুষ যে কোনো উপায়ে ক্ষমতা পেতে চাইছে। মানুষের এই অপরাধপ্রবণতাই এমন ঘটনার জন্য দায়ী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত