প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুব্রত বিশ্বাস: কোন স্বার্থে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা হচ্ছে?

সুব্রত বিশ্বাস
সম্প্রীতির উষ্ণমানবিক বন্ধনই একটি দেশকে প্রকৃত মানবিক জাতিরাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। সমাজে সম্প্রীতি সৃষ্টির দায়টা যেমন রাষ্ট্রযন্ত্রের ও রাজনৈতিক দলের, তেমনি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সক্রিয় লাগাতার তৎপরতার। বৃহৎ অর্থে পৃথিবীর যাপন এবং আয়োজন সবটাই প্রয়োজনের ওপর। সেই ধারাবাহিকতায় এখানকার সময়ে রাজনীতির মাঠে ফিরতে কারও কারও সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং অস্থিরতার প্রয়োজন! বলা বাহুল্য, হিন্দু ও মুসলমান উভয় ক্ষেত্রের বৃহৎ অংশে এই মানসিক সাম্প্রদায়িকতা কমবেশি স্থায়ী অবস্থান নিয়ে রয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতি পূর্বাপরই বহুত্ববাদকে আলিঙ্গন করে। কাজেই এই সম্প্রীতিকে যারা চ্যালেঞ্জ করতে চাচ্ছে তাদের সমূলে উৎপাটন জরুরি। সর্বশেষ রাজনৈতিক পেরেক পোঁতা হয় ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে হিন্দু-মুসলমানের দ্বিজাতিতত্ত¡ভিত্তিক ভ‚খÐ বিভাজনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। সামাজিক-রাজনৈতিক সংঘাত এ পর্বে (১৯৪০-১৯৪৭) সর্বাধিক, পরিণামে রক্তস্রোতে ১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশ বিভাগ, মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি মেনে নিয়ে। হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক বিভেদ উভয় পক্ষের অসহিষ্ণুতায় যে সংঘাত তৈরি করেছে তাতে জ্বালানি যোগ করেছে চতুর শাসক শ্রেণি নানা কায়দা-কৌশলে, শাসক শ্রেণি উভয় সম্প্রদায়ের সংখ্যাগুরু সমাজে বিভেদ চেতনাকে উসকে দিয়েছে। অন্ধ বিভেদ চেতনায় সহিংসতার প্রকাশ ঘটেছে। অসহায় নিরীহ মানুষের রক্তে ভ‚খÐের মাটি ভিজেছে।

‘সম্প্রীতি’ শব্দটি সম্পর্কের দিক থেকে বহুমাত্রিক। ব্যক্তিক, পারিবারিক এবং সমষ্টিগত বিচারে তা ধর্মীয় সম্প্রদায়গত, শ্রেণিগত, জাতিগত, এমনকি রাষ্ট্রিক ও বৈশ্বিক। মানব সম্পর্কে ‘সম্প্রীতি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দসূচক। রাজনীতি এর বাইরে নয়। তবে ভারতীয় উপমহাদেশের (অবিভক্ত ও বিভক্ত) ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টি সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এমনকি ত্রিধাবিভক্ত উপমহাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতিনীতি, আচার, এককথায় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে যথেষ্ট প্রভেদ। আর এ প্রভেদ নিয়ে মাঝে মধ্যে বিরোধ ঘটলেও মোটামুটি হিসেবে পরিস্থিতি ছিলো সম্প্রীতির।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, সামাজিক বিভেদ প্রসারিত হয়েছে রাজনীতিতে ঐতিহাসিক কারণে সৃষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের পথ ধরে, বিশেষভাবে বাংলাদেশে। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জাতীয়তাবাদী চেতনার যুদ্ধ একাত্তর। ফলে নতুন মানচিত্র বা পতাকাই নয়, আমরা ১৯৭২ সালে পেয়েছি একটি সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সংবিধান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানমাফিক রাষ্ট্র সর্ব সম্প্রদায়বান্ধব, রাষ্ট্রযন্ত্রকেও হতে হবে একই ধারার। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা রক্ষার চতুর খেলায় দুই জেনারেলের কল্যাণে সংবিধানের সেক্যুলার চরিত্র বিনষ্ট হয়েছে, তার মাথায় চেপেছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম। সমাজবদল না ঘটায়, মানবিক সাম্প্রদায়িকতার অবসান না ঘটায় রাজনৈতিক-সামাজিক কায়েমি স্বার্থের টানে থেকে থেকে ঘটেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা।

১৯৬৪ সালে ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবীসহ সামাজিক শক্তি সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিরোধে ঘোষণা দিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলো। এখন দূষিত সমাজে নিরাপত্তা রক্ষক থেকে জনপ্রতিনিধি হাঙ্গামার পরোক্ষ সহায়, কখনো প্রত্যক্ষভাবে। এ সমাজ, এ রাজনীতির পরিবর্তন না ঘটলে বাংলাদেশ প্রকৃত সেক্যুলার মর্যাদার যে অবস্থান তা কখনো পাকাপাকি হবে না, পঞ্চাশ বছরে এসে গণতান্ত্রিক যাত্রায় বাংলাদেশের অবস্থান মূল্যায়নে একেবারেই স্বস্তিকর কোনো পর্যায়ে যাওয়া যায়নি, বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম স্বস্তিদায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আশাব্যঞ্জক নয়। আমরা এখনো ‘গণতান্ত্রিক হাইব্রিড রিজিমে’ অবস্থান করছি, যাকে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যাবে না। দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেনি বরং আমাদের শক্তিশালী বেশ কিছু আইনি কাঠামো থাকলেও সেগুলো পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং ‘আপাত ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তন’ হয় বলে প্রচার থাকলেও বাস্তবে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কাঠামোগত ও আদর্শিক দুর্বলতায় সূচকে আমাদের অবস্থান। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও গণতান্ত্রিক উৎকর্ষ সাধনের বিকল্প নেই’, ‘আমরা চলতি দশকেই এসডিজি অর্জনে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ, অথচ এসডিজির অন্যতম অভীষ্ট শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নিশ্চিতে কিছু আইনি সংস্কার ব্যতীত জনগণের অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

এখনো দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচারই নিশ্চিত করা যায়নি। সবার জন্য সমান আইনি সুযোগ অর্জিত হয়নি। অংশগ্রহণমূলক সামাজিক ও আইনি কাঠামো গঠনে এখনো বহু পথ বাকি। গণতান্ত্রিক উৎকর্ষ সাধনে প্রতিবন্ধক নানা আইন ও নীতি-কাঠামোর মাধ্যমে এখনো ভয়হীন, মুক্ত ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যম ও জনগণের সমালোচনা এবং রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে অবাধে কথা বলার অধিকার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, যা সব ক্ষেত্রে শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে নেতিবাচক ভ‚মিকা রাখতে হবে অবিলম্বে। এখন রাজনীতিবিদদের সম্প্রীতি নষ্ট করার রাজনীতি করার দরকার নেই, গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্মকে ঠিক করে দেশ গড়ুন। লেখক : ব্যবসায়ী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত